ম্যাক্সওয়েলের সেই অতিমানবীয় ইনিংস: হার না মানা মানুষের নতুন রূপকথা

ম্যাক্সওয়েলের সেই অতিমানবীয় ইনিংস: হার না মানা মানুষের নতুন রূপকথা
অস্ট্রেলিয়ার জয়ের পর অধিনায়ক প্যাট কামিন্স গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ইনিংসটিকে ‘ওয়ানডে ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। ভারতীয় কিংবদন্তি বীরেন্দর শেবাগের রায়ও ছিল একইরকম।

২০২৩ বিশ্বকাপে ওয়াংখেড়েতে সেদিন আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাক্সওয়েলের অপরাজিত ২০১ রান ক্রিকেট ইতিহাসের স্বর্ণোজ্জ্বল ইনিংসগুলোর পাতায় চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। আজ সেই অতিমানবীয় ইনিংসের তিন বছর পূর্তি।

আধুনিক উপন্যাসের যাত্রা সম্ভবত মিগেল দ্য সের্ভান্তেসের ‘দন কিহোতো’ থেকে শুরু। দন কিহোতো নামের এক বোকা যুবক অবিশ্বাস্য, অবাস্তব সব অভিযানে বের হতেন, যেখানে সাফল্যের কোনো সম্ভাবনা ছিল না।

৯১ রানে ৭ উইকেট হারানোর পর অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ জেতাকে সেদিন দন কিহোতোর সেই অবাস্তব অভিযানের মতোই মনে হচ্ছিল; পরিসংখ্যান অনুযায়ী তখন অস্ট্রেলিয়ার জয়ের সম্ভাবনা ছিল ০.৪৬, অর্থাৎ আধা শতাংশেরও কম। মিচেল স্টার্ক যখন আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন, পরিস্থিতি ছিল এমনই নাজুক।

এরপর যা ঘটলো, তা রূপকথার গল্পলেখকও হয়তো নিজের গল্পে ঘটানোর সাহস দেখাবেন না। গল্পে হয়তো বড়জোর একটি ট্র্যাজেডিই থাকত, যেখানে নাটকীয়তার পর নায়কের হারই লেখা হতো।

কিন্তু ম্যাক্সওয়েল মাঠে এসেছিলেন নিজের গল্পটা ভিন্নভাবে লেখার ব্রত নিয়ে, যা রূপকথার গল্পলেখকদেরও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তুললো। যেন তাঁর ইনিংস দিয়েই জন্ম নিল রূপকথার এক নতুন অধ্যায়।

দন কিহোতোর গল্পের সঙ্গে ম্যাক্সওয়েলের এই ইনিংসের আরেকটি মিল রয়েছে। কিহোতো যেমন সব অভিযানে সঙ্গী হিসেবে সানচো পানশাকে পেয়েছিলেন, তেমনি এই অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলার পথে ম্যাক্সওয়েলকে শেষ পর্যন্ত সঙ্গ দিয়েছিলেন প্যাট কামিন্স।

৬৮ বলে মাত্র ১২ রান করে অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক ধীরস্থির ঋষির মতো উইকেটে আগলে দাঁড়িয়েছিলেন। সামনে থেকে তিনি উপভোগ করেছেন ম্যাক্সওয়েলের খেলা, যাকে অনেকে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা ইনিংস বলে থাকেন।

ম্যাক্সওয়েল নামটি শুনলে অনেকেরই হয়তো স্কুলের বিজ্ঞান বইয়ে পড়া জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল নামের এক পদার্থবিজ্ঞানীর কথা মনে পড়ে, যিনি তড়িৎচৌম্বকীয় তত্ত্ব দিয়ে বিজ্ঞানের জগতে অমর হয়ে আছেন। ঠিক একইভাবে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে গতকাল রাতে অমরত্ব পেয়েছেন ক্রিকেটের এই ম্যাক্সওয়েলও।

মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাক্সওয়েলের ইনিংসটিকে মানব অভিধানের কোনো বিশেষণ দিয়ে বোঝানো রীতিমতো দুঃসাধ্য। ১২৮ বলে ২০১ রানের এই ইনিংসটি তিনি খেলেছেন আক্ষরিক অর্থে এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে।

শতকের পর থেকে বেশির ভাগ সময়ই তিনি ক্র্যাম্পের যন্ত্রণায় কাতরেছেন। এমনকি এ কারণে সুযোগ থাকার পরও সিঙ্গেল রান নিতে পারেননি; যখনই নিতে চেয়েছেন, ব্যথায় কুঁকড়ে গেছেন।

তাঁর হাঁটার ভঙ্গি দেখে কেউ কেউ বলেছিলেন, ‘ম্যাক্সওয়েল অন্য প্রান্তে পৌঁছেছেন চার্লি চ্যাপলিনের মতো হেঁটে।’ চ্যাপলিন যেমন হাস্যকর ভঙ্গিতে জীবনের গভীর কোনো বেদনার গল্প বলে যেতেন, ম্যাক্সওয়েলের সেই ‘হাস্যকর’ হাঁটাতেও লুকিয়ে ছিল তীব্র যন্ত্রণা। যেকোনো সময় ম্যাক্সওয়েল মাঠ ছাড়তে পারেন—এই আশঙ্কায় একাধিকবার বাউন্ডারি লাইনের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছিলেন সতীর্থ অ্যাডাম জাম্পা।

কিন্তু ম্যাক্সওয়েল যেন স্বর্গীয় এক ইনিংস খেলে অমরত্ব পেতে চেয়েছিলেন। তাই কোনো কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি।

নয়তো তিন শর কাছাকাছি রান তাড়ায় এক শর মধ্যে ৭ উইকেট হারানোর পর ৬ নম্বরে নামা ব্যাটসম্যানটি দ্বিশতক করেন কীভাবে! আফগান বোলারদের ওপর ম্যাক্সওয়েল বয়ে গেছেন ঘূর্ণিঝড়ের মতো।

সারাক্ষণই যেন ১১ নম্বর বিপদসংকেত হয়ে আঘাত হেনেছেন তাঁদের ওপর। এই ম্যাচে ক্র্যাম্পের ব্যথা নিয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে ম্যাক্সওয়েল যেসব শট খেলেছেন, সেগুলো কখনো কখনো তামিল সিনেমার সুপারস্টার রজনীকান্তকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

ক্রিকেটের ব্যাকরণকে অকেজো বানিয়ে এই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান যেসব শট খেলছিলেন, তা গতকালের আগপর্যন্ত কেবল রজনীকান্তের তামিল সিনেমাতেই শুধু সম্ভব ছিল। কিন্তু বাস্তবতা যে কখনো কখনো রূপকথার সীমাকেও ছাড়িয়ে যায়, সেটাই যেন সেদিন ম্যাক্সওয়েল তাঁর ব্যাট হাতে প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন।

তাঁর ব্যাটিংয়ের সামনে রীতিমতো পাড়ার বোলারের কাতারে নেমে এসেছিলেন মুজিব উর রেহমান ও আজমতউল্লাহ ওমরজাইরা। অথচ ম্যাক্সওয়েল-ঝড় শুরু হওয়ার একটু আগেও মনে হচ্ছিল এই বোলারদের খেলা অসম্ভব।

নাভিশ্বাস তুলে অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারকে ধসিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। আরেকটি আফগান-রূপকথা মনে হচ্ছিল সময়ের ব্যাপার, সঙ্গে সেমিফাইনালের হাতছানি তো ছিলই।

কিন্তু ম্যাক্সওয়েল মার শুরু করতেই সব যেন ভোজবাজির মতো বদলে গেল। মনেই হচ্ছিল না ৯১ রানে ৭ ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এই বোলাররা।

আফগানিস্তানের বোলারদের দেখে মনে হচ্ছিল ম্যাক্সওয়েলের জাদুতে তাঁরা রীতিমতো বিবশ হয়ে গেছেন। যেন মাঠে তাঁরা নয়, খেলছিল তাঁদের ছায়ারা।

যেমন কোনো জাদুকরী খেলোয়াড়ের খেলা দেখে তাঁর প্রতিপক্ষও অনেক সময় নিজেদের কাজের কথা ভুলে যায়, সেদিন আফগান বোলারদের অবস্থাও তেমনটাই মনে হচ্ছিল। ম্যাক্সওয়েলের অবিশ্বাস্য সব শট দেখতে গিয়ে হয়তো নিজেদের কাজটাই ভুলে গিয়েছিলেন তাঁরা, যে কারণে হাত ফসকে গেছে সহজ ক্যাচও।

অন্যদিকে ভাগ্য যে সাহসীদের পক্ষে থাকে, সেটি প্রমাণিত হয়েছে সুযোগ পেয়ে ম্যাক্সওয়েল আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠায়। দলকে বাঁচাতে আক্ষরিক অর্থেই যেন যোদ্ধার ভূমিকায় নেমেছিলেন ম্যাক্সওয়েল।

ক্রিকেট-পর্যবেক্ষকরা ম্যাক্সওয়েলকে তুলনা করেছেন মানব ইতিহাসের সেরা যোদ্ধাদের সঙ্গে, যেখানে তাঁরা আলেক্সান্ডার, চেঙ্গিস খান, জুলিয়াস সিজারের কাতারেই ম্যাক্সওয়েলকে রাখার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে এ ইনিংসটি দিয়ে মানুষের সামর্থ্যের সীমারও পরীক্ষা হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু মানুষ তো শেষ পর্যন্ত এমনই। তার ভেতর থেকেই প্রবাহিত হয় শক্তির সীমাহীন এক ধারা।

হয়তো সব সময় এই শক্তি মানুষ দেখাতে পারে না, কিন্তু যেদিন মানুষের এই দিকটি সামনে এসে হাজির হয়, তখন সে আর হার মানতে পারে না। মানুষের সেই রূপটি নিয়ে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’তে লিখেছিলেন, ‘মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু পরাজিত হতে পারে না।’ সেই গল্পের সান্তিয়াগো নামের বুড়ো যেমন সমুদ্র থেকে লড়াই করে ফিরে এসেছিলেন, তেমনই অবিশ্বাস্য এক জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন ম্যাক্সওয়েলও।

তবে শেষ পর্যন্ত ম্যাক্সওয়েলের ইনিংসটি কোনো ব্যক্তি মানুষের জয় নয়, এটি অসংখ্য হারতে থাকা মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর পাথেয়ও।