পৃথিবীর নতুন অতিথি: এক 'মিনি চাঁদ' ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত থাকবে মহাকর্ষের টানে

পৃথিবীর নতুন অতিথি: এক 'মিনি চাঁদ' ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত থাকবে মহাকর্ষের টানে
পৃথিবী ও চাঁদের সম্পর্ক সুপ্রাচীন, যেখানে পৃথিবীর প্রবল মাধ্যাকর্ষণ চাঁদকে কক্ষপথ থেকে দূরে সরে যেতে দেয় না। সম্প্রতি পৃথিবীর এই জাদুকরী আকর্ষণে ধরা পড়েছে একটি নতুন 'মিনি চাঁদ'।

'২০২৬ কিউকিউ৮' নামে পরিচিত এই মহাকাশ শিলাটি এই বছরের বড়দিন পর্যন্ত আমাদের গ্রহের সঙ্গেই অবস্থান করবে। গত আগস্ট মাসে এটি প্রথমবার শনাক্ত করা হয় এবং এপ্রিল মাসে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করে।

আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার এই তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কারের কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে। 'কিউকিউ৮' এর এই পৃথিবীতে অবস্থান একটি অস্থায়ী ঘটনা মাত্র।

ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এটি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানে থাকবে এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এটি আবার মহাশূন্যে ছিটকে যাবে। বিজ্ঞানীরা 'কিউকিউ৮' এর কক্ষপথ পুনর্গঠন করে দেখেছেন যে এটি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ৩৫০ দিনের বেশি সময় নেয়, যা পৃথিবীর এক বছরের প্রায় সমান।

প্রতি দশ বছর অন্তর 'কিউকিউ৮' পৃথিবীর খুব কাছাকাছি আসে, কিন্তু এবারের ঘটনায় এটি এতটাই কাছে চলে এসেছিল যে পৃথিবী তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণে শিলাটিকে সাময়িকভাবে আটকে নিতে সক্ষম হয়। মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার জানিয়েছে, এই অবস্থানকালে 'কিউকিউ৮' পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি আসে প্রায় ৩ লক্ষ ৫৩ হাজার মাইল দূরত্বে।

এই দূরত্ব আমাদের স্বাভাবিক চাঁদ ও পৃথিবীর গড় দূরত্বের চেয়ে প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার মাইল বেশি। শিলাটির ব্যাস মাত্র ৬ ফুট বা ২ মিটার।

যদি 'কিউকিউ৮' সরাসরি পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষের পথেও আসত, তবে এটি ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুরোপুরি জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেত। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে এটি একটি উজ্জ্বল অগ্নিগোলকের মতো দেখা যেত, যা এর ক্ষুদ্র আকারের কারণে কোনো ক্ষতি করতে পারত না।

পৃথিবীর জন্য নতুন 'মিনি চাঁদ' আটকে পড়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়; এ ধরনের অস্থায়ী উপগ্রহ অতীতেও বহুবার ধরা পড়েছে। গত বছরের গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, যেকোনো মুহূর্তে আমাদের গ্রহের চারপাশে প্রায় ছয়টি 'মিনি চাঁদ' প্রদক্ষিণ করতে পারে, যার মধ্যে অনেকগুলো আমাদের স্থায়ী প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদেরই টুকরা হতে পারে।

'কিউকিউ৮' আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও এটি গড় 'মিনি চাঁদের' চেয়ে বড়। চলতি বছরের শুরুতে করা মডেলিং অনুযায়ী, অস্থায়ী উপগ্রহের গড় আকার প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার বা ৩০ ইঞ্চি হয় এবং এ ধরনের বস্তুর গড় স্থায়িত্বকাল প্রায় নয় মাস।

যদি 'কিউকিউ৮' ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পৃথিবীর মহাকর্ষের টানে ধরা পড়ে থাকে, তবে এটি ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে দূরে সরে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবী যদি ১০ ফুট বা ৩ মিটার চওড়া কোনো মহাকাশ শিলাকে মহাকর্ষীয়ভাবে আটকে ফেলে, তবে সেটি ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত 'মিনি চাঁদ' হিসেবে থাকতে পারে।

ছোট আকারের শিলাগুলো পৃথিবীর কাছাকাছি এসে সহজেই এর মাধ্যাকর্ষণের জালে আটকা পড়ে, এবং মহাকাশের এই ক্ষুদ্র অতিথিরা পৃথিবীর চারদিকে নির্দিষ্ট সময় ঘুরে আবার মহাশূন্যে হারিয়ে যায়। 'কিউকিউ৮' এর মতো বস্তুগুলো পৃথিবীর খুব কাছাকাছি চলে আসায় গবেষকদের জন্য সৌরজগতের গঠন এবং গ্রহাণুর গতিপথ বিশ্লেষণ করা সহজ হয়।

এই ক্ষুদ্র শিলাগুলো সরাসরি কোনো ক্ষতি না করে কেবল মহাকর্ষীয় টানে কিছুদিনের জন্য পৃথিবীর অতিথি হয়ে থাকে। ক্রিসমাসের ছুটির এই সময়ে আমাদের এই নতুন প্রাকৃতিক অতিথি পৃথিবীর চারদিকে তার কক্ষপথের যাত্রা সম্পন্ন করবে এবং নতুন বছরে এটি আবার মহাশূন্যের গভীরতায় বিলীন হয়ে যাবে।

মহাকাশ শিলাটির গতিবিধি বিশ্লেষণের জন্য বিজ্ঞানীরা অত্যাধুনিক কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেছেন, যা মহাশূন্যের বস্তুগুলোর কক্ষপথ নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে সক্ষম। 'কিউকিউ৮' এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি; বিজ্ঞানীরা এর পূর্বের গতিপথ ট্র্যাক করে দেখেছেন কীভাবে এটি সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করার সময় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে দিক পরিবর্তন করেছে।

সৌরজগতের ভেতরে চলাচলকারী এই ধরনের বস্তুগুলোর ওপর নজর রাখা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের প্রধান কাজগুলোর একটি। কারণ, পৃথিবীর চারপাশের মহাকাশ পরিবেশ দিন দিন আরও ব্যস্ত হয়ে উঠছে; কৃত্রিম উপগ্রহ এবং মহাকাশ আবর্জনার পাশাপাশি প্রাকৃতিক এই ক্ষুদ্র শিলাগুলোও কক্ষপথের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

'মিনি চাঁদের' ধারণাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে সব সময় কৌতূহল জাগায়। রাতের আকাশে আমরা যে চাঁদ দেখি, তা আমাদের স্থায়ী সঙ্গী।

তবে এই অস্থায়ী 'মিনি চাঁদগুলো' খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলোর আকার অত্যন্ত ছোট হওয়ায় শুধু শক্তিশালী টেলিস্কোপের মাধ্যমেই এদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

'কিউকিউ৮' এর ক্ষেত্রেও অত্যন্ত শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও উন্নত সফটওয়্যারের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে পাওয়া ডেটা সংগ্রহ করে এই ধরনের আবিষ্কারগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।

'কিউকিউ৮' এর ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (IAU) নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে নামকরণ ও তথ্য প্রকাশ করেছে।