ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষার মূল্য কেন শিক্ষার্থীরাই দেবে?

ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষার মূল্য কেন শিক্ষার্থীরাই দেবে?
এবারের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার ফল কেবল একটি বিপর্যয় নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর অসুস্থতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার অর্থ হলো, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক আসন শূন্য পড়ে থাকবে, যা জাতীয় মেধা বিকাশের পথে বড় অন্তরায়।

আমরা মনে করি, গত কয়েক দশকে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে এবং কিছু গোষ্ঠীর মুনাফার স্বার্থে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের নামে যে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তারই প্রত্যক্ষ ফল এই বিপর্যয়। শিক্ষার্থীদের বিপরীতে পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কখনোই সম্ভব নয়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এবারে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ছিল ৫১.৬২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও গত বছরের তুলনায় এবার বড় ধরনের ধাক্কা এসেছে; এবার ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন, যা গতবারের চেয়ে ২৭ হাজার কম।

শতভাগ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও এবার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এবারের ফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা।

ঢাকা বোর্ড বাদে অন্য আটটি শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে গড় পাসের হার ছিল মাত্র ৫৪ শতাংশ। বিগত কয়েক বছর ধরেই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে খারাপ ফলের পেছনে ইংরেজি, গণিত এবং আইসিটিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুর্বলতার বিষয়টি বারবার আলোচিত হয়ে আসছে।

এ দুটি স্তরের শিক্ষা সম্পূর্ণ বিষয়ভিত্তিক হওয়া সত্ত্বেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব প্রকট। ফলস্বরূপ, প্রায়শই এমন চিত্র দেখা যায় যে, ধর্মের শিক্ষককে গণিত বা ইংরেজিতে পাঠদান করতে হচ্ছে।

এমন বাস্তবতায় শিক্ষার্থীরা যে শিখনঘাটতি নিয়েই বেড়ে উঠবে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং দুর্ভাগ্যজনক। বিগত সরকারের আমলে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে শিথিলতা থাকায় এসএসসি ও এইচএসসিতে পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যা অনেক বেড়ে যেত।

এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতিতে কঠোরতা আরোপ করা হয়, যার ফলস্বরূপ পাসের হার ও জিপিএ-৫ উভয়ই কমতে শুরু করে। গত বছরের তুলনায় এ বছর এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষাতেই পাসের হার ও জিপিএ-৫ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন নিজেও এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলকে 'সন্তোষজনক নয়' বলে মন্তব্য করেছেন। তবে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে এবার এইচএসসি পরীক্ষা থেকে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্যদের সম্পূরক পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

এর মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থীর একটি শিক্ষাবর্ষ যেমন নষ্ট হবে না, তেমনি সামগ্রিক ফলাফলেও কিছুটা উন্নতি আসবে। পরপর দুই বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলে যে বড় অবনতি, সেটিকে কেবল পরীক্ষা মূল্যায়নের পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে শিক্ষার মূল সংকট আড়ালেই থেকে যাবে।

রূঢ় বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারের জন্য যোগ্য, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরিতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই শিক্ষা খাতের সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল বাজেটে জিডিপি বরাদ্দ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক গলদগুলো খুঁজে বের করারও বিষয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর শিক্ষা খাত সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমরা মনে করি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ এবং অন্য অংশীজনদের নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও অনুসন্ধানী কমিটি গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

পাঠদানের দুর্বলতা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকটসহ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখনঘাটতি তৈরির নেপথ্যের সকল কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খুঁজে বের করা অত্যাবশ্যক। একটি ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের আর কত দিন হতে হবে?