বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল: আতঙ্ক ও আত্মীয়দের বাড়াবাড়ি

বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল: আতঙ্ক ও আত্মীয়দের বাড়াবাড়ি
উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি—এই শব্দগুলো শুনলেই শিক্ষার্থীদের মনে এক চাপা ভয় কাজ করে। আর সেই ভয়ের চূড়ান্ত রূপটি হলো 'বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল'।

জীবনে যত বড়ই সাহসী মানুষ হোক না কেন, ফলাফলের দিন যত ঘনিয়ে আসে, বুকের ভেতরে যেন এক অজানা ব্যথা শুরু হয়। ফলাফল প্রকাশের অন্তত তিন দিন আগে থেকেই শুরু হয় আসল যন্ত্রণা।

মুখের স্বাদ চলে যায়, পেটের ক্ষুধা উধাও হয়ে যায়; রাতের ঘুম তো রীতিমতো ইস্তফা দিয়ে বিদায় নেয়। ঠিক এই সময়টায় মাথায় দুনিয়ার যাবতীয় আজগুবি আর ভয়াবহ চিন্তা ভর করে।

মাঝরাতে হঠাৎ মনে হয়, ‘আরে! ইংরেজি খাতায় রোল নম্বরটা ঠিকমতো ভরাট করেছিলাম তো?

রেজিস্ট্রেশন নম্বরের জায়গায় ভুল করে রোলের গোল্লা ভরাট করে আসিনি তো? খাতার মার্জিন ঠিক ছিল তো?’ এই চিন্তাতেই শরীরের অর্ধেক রক্ত পানি হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়।

এরপর আসে সেই ভয়ংকর দিন। ফলাফলের দিন সকাল ১০টা বাজার আগে থেকেই শুরু হয় আরেক মহাযুদ্ধ।

যেসব দূরের আত্মীয়কে বিয়েবাড়ি বা মেজবানের রোস্ট-কোরমা ছাড়া দুরবিন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না, ঠিক ফলাফলের দিন সকালে তাঁদের মুঠোফোন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল চলে আসে! মনে হয়, ফলাফল নিয়ে আমার চেয়ে তাঁদের চিন্তাই বেশি।

সকাল সকাল ফোন ধরেই সেই চিরচেনা সংলাপ, ‘হ্যালো বাবা, রেজাল্ট তো দিল শুনলাম, তোমার কী অবস্থা?’ এই ‘কী অবস্থা’র পেছনে যে আসলে নিজের ছেলে বা মেয়ের ফলাফল শোনানোর একটি সুপ্ত বাসনা লুকিয়ে আছে, সেটি বুঝতে আর কারো বাকি থাকে না। আত্মীয়দের এই ফোনকলের ধকল কোনোমতে সামাল দিলেও আসল 'খেলা' তো তখনো বাকি থাকে।

আর সেই খেলার নাম হলো ‘পাশের বাসার আন্টি’! এই আন্টিদের হিসাব খুব সোজা—আপনার চেয়ে তাঁর ছেলে বা মেয়ে যদি ভুল করেও এক-দুই পয়েন্ট বেশি পেয়ে যায়, তাহলে তো আর কথাই নেই!

তাঁর মুখের গতি তখন সুপারসনিক জেটকেও হার মানায়। মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে তিনি এমনভাবে আপনার বাসায় প্রবেশ করবেন, যেন তাঁর ছেলে নাসায় সরাসরি বিজ্ঞানী হিসেবে সুযোগ পেয়ে গেছে।

এরপর হাসিমুখে আপনার আম্মাকে এমন সব কথা শোনাবেন, যা শুনে আপনার মনে হবে, পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে এখনই ব্যাগ গুছিয়ে হিমালয়ে গিয়ে সন্ন্যাস নেওয়া উচিত। তবে ফলাফলের এই দিনটি শিক্ষার্থীদের জন্য যতই আতঙ্কের আর বিভীষিকাময় হোক না কেন, একদল মানুষের কাছে দিনটি একদম ঈদের দিনের মতো।

তাঁরা হলেন পাড়ার মিষ্টির দোকানদার! গোল্ডেন বা জিপিএ ফাইভ পাক, পাস করুক বা অল্পের জন্য বাদ যাক, তাঁদের দোকানে মিষ্টি বিক্রির ধুম লেগেই থাকে।

ছাত্রদের দীর্ঘশ্বাস আর আন্টিদের গর্বিত হাসিমুখের মাঝখানে বসে মিষ্টির দোকানদারেরা সেদিন ক্যাশবাক্স গুনতে গুনতে হয়তো মনে মনে বলেন, ‘বেঁচে থাকুক বোর্ড পরীক্ষা, বেঁচে থাকুক এই ফলাফলের দিন!’