Thu 1st Oct 2026, 10:40 am

সিঙ্গাপুরের সরকারি কর্মীদের জন্মহার বৃদ্ধিতে ডেটিং অ্যাপ 'ফার্স্টডেট' চালু

সিঙ্গাপুরের সরকারি কর্মীদের জন্মহার বৃদ্ধিতে ডেটিং অ্যাপ 'ফার্স্টডেট' চালু
সিঙ্গাপুরে জন্মহারের ক্রমাগত নিম্নমুখী প্রবণতা সরকারের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়েছে। এই সঙ্কট মোকাবিলায়, দেশটির সরকার এবার সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি অভিনব ডেটিং অ্যাপ চালু করেছে। সম্প্রতি ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অবিবাহিত সরকারি কর্মীদের লক্ষ্য করে 'ফার্স্টডেট' নামক এই পরীক্ষামূলক সেবাটি চালু করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য হল তাদের জন্য জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করা।

এই প্ল্যাটফর্মটি ডেটিং জগতে একটি ভিন্নধর্মী পদ্ধতি উপস্থাপন করছে বলে দাবি করা হয়েছে। এটি একটি নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে, যা একই সময়ে শুধুমাত্র একজনের সঙ্গে ডেটিং করার সুযোগ দেয়। 'ফার্স্টডেট'-এর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা 'সোয়াইপ করার ক্লান্তি' থেকে মুক্তি পাবেন।

ব্যবহারকারীদের জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে লগইন করতে হয় এবং তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ, আগ্রহ ও জীবনদৃষ্টি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত সমীক্ষায় অংশ নিতে হয়।

এই ব্যবস্থাটি বিখ্যাত 'গেইল-শ্যাপলি স্টেবল ম্যারেজ' অ্যালগরিদম দ্বারা পরিচালিত। এই গাণিতিক পদ্ধতিটি দুই পক্ষের পছন্দ ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সুষম জোড়া মেলানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ২০১২ সালে প্রয়াত গণিতবিদ লয়েড শ্যাপলি এই অ্যালগরিদম আবিষ্কারের জন্য অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। চিকিৎসক পোস্টিং, স্কুল ভর্তি এবং বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের মধ্যে এই উদ্যোগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২৯ বছর বয়সী কর্মকর্তা এলিজাবেথ Desi Media Point-কে বলেন যে, "অন্যান্য ডেটিং অ্যাপের মতো এখানেও পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা খুব বেশি ভিন্ন হবে না।" তবে তিনি 'ফার্স্টডেট' ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বলেন, "অন্তত প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি কম জেনে স্বস্তি বোধ করছি। আমরা তো সবাই জীবনসঙ্গী খুঁজছি, আর আমরা সরকারি কর্মচারী।"

উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহর।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এটিকে শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখায় বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে, এবং বয়সসীমা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। রেডিটে একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, "সরকার কেবল জন্মহার বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এটি করছে। ব্যক্তিগতভাবে কেউ জীবনসঙ্গী পেল কি না, তা নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই।" তিনি আরও যোগ করেন, ৩৫ বা তার বেশি বয়সে সন্তান ধারণের শারীরিক ঝুঁকি বেশি হওয়ায়, সরকার সম্ভবত বয়স্ক অবিবাহিতদের এই প্রকল্পের আওতার বাইরে রেখেছে।

গত ষাট বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ৩০ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। একই সময়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় মৃত্যুর হারও ঊর্ধ্বমুখী, যা ২০২৫ সালে প্রায় ২৬,৫০০ জনে পৌঁছেছে। এই ঐতিহাসিক জন্মহারের পতন রুখতে প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং আগস্ট মাসে বিশাল অঙ্কের আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেন। একটি শিশুর ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত ধাপে ধাপে মোট প্রায় ৭০ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার সহায়তা প্রদানের এই ঘোষণা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুরে নাগরিকদের সঙ্গী খুঁজে পেতে সহায়তা করার জন্য এটিই সরকারের প্রথম প্রচেষ্টা নয়। ১৯৮৪ সালে, উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মেলামেশা উৎসাহিত করতে 'সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ইউনিট' (এসডিইউ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

তবে, শুধুমাত্র স্নাতকদের সুযোগ দেওয়ায় সেই উদ্যোগটি 'অভিজাত তোষণ' বলে সমালোচিত হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। জন্মহার বাড়াতে সিঙ্গাপুর ছাড়াও অন্যান্য দেশেও এমন সরকারি উদ্যোগ দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে টোকিও মেট্রোপলিটন সরকার একটি এআই-চালিত ডেটিং অ্যাপ চালু করেছিল, যার মাধ্যমে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত অন্তত ২৬৫টি দম্পতি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। তবে, সিঙ্গাপুরের 'ফার্স্টডেট' অ্যাপটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে কিনা, সে বিষয়ে সরকার এখনো কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করেনি।