Sat 26th Sep 2026, 2:19 pm

বিবাহিত ও পরিণত বয়সের পুরুষের প্রতি তরুণীদের আকর্ষণ: নেপথ্যের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ

বিবাহিত ও পরিণত বয়সের পুরুষের প্রতি তরুণীদের আকর্ষণ: নেপথ্যের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ
একজন পুরুষের স্ত্রী, সন্তান ও একটি পরিপূর্ণ পারিবারিক জীবন বিদ্যমান জেনেও কোনো তরুণীর তার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা অস্বাভাবিক নয়। এই আপাতদৃষ্টিতে সরল ঘটনাটির গভীরে কাজ করে একাধিক জটিল মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং সম্পর্কভিত্তিক কারণ।

প্রাথমিকভাবে এটি উল্লেখ করা আবশ্যক যে, সকল তরুণীই পরিণত বয়সের বা বিবাহিত পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হন না, এবং বয়সের ব্যবধানযুক্ত প্রতিটি সম্পর্ক একই সূত্রে বাঁধা নয়। গবেষণাতেও এমন কোনো একক বা সর্বজনীন কারণ চিহ্নিত হয়নি যা দিয়ে এই ধরনের সম্পর্ককে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়।

পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী পুরুষের প্রতি আকর্ষণ:

একজন বয়স্ক পুরুষের অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক মর্যাদা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিপক্কতা তরুণীর কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় প্রতিভাত হতে পারে। জীবনের অনিশ্চিত বা জটিল বাঁকে একজন স্থির, মনোযোগী ও অভিজ্ঞ মানুষকে তুলনামূলকভাবে অধিক নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য মনে হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। পাশাপাশি, বিভিন্ন গবেষণায় বয়সের ব্যবধানযুক্ত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে ‘সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিলেশনশিপ থেরাপি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, তরুণী ও বয়স্ক পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধা বা আর্থিক স্থিতিশীলতার ধারণাটি একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তবে, সীমিত নমুনা এবং অনলাইনভিত্তিক পদ্ধতির কারণে এই গবেষণাটিকে সকল সম্পর্কের জন্য সার্বজনীনভাবে প্রযোজ্য বলে দাবি করা যায় না।

মনোযোগ ও বিশেষ অনুভূতির অভাব পূরণের প্রচেষ্টা:

সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেবল বয়স নয়, ব্যক্তির আচরণগত দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন বয়স্ক পুরুষ যদি নিয়মিত যত্ন নেন, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনেন, প্রশংসা করেন এবং প্রয়োজনে সমর্থন জানান, তবে এই ধরনের মনোযোগ ধীরে ধীরে গভীর আবেগে রূপান্তরিত হতে পারে। বিবাহিত পুরুষের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।

পূর্ববর্তী পারিবারিক বন্ধনের কারণে এই ধরনের সম্পর্ক প্রায়শই শুরু থেকেই সীমাবদ্ধতা ও গোপনীয়তার আবরণে আবৃত থাকে। নিয়মিত গোপন যোগাযোগ, সাক্ষাৎ এবং ‘আমাদের সম্পর্কটি একান্তই ব্যক্তিগত’—এমন উপলব্ধি অনেক সময় আবেগকে আরও প্রগাঢ় করে তোলে। তবে, এটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কোনো ‘পরকীয়ার সূত্র’ হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত নয়।

বয়সের ব্যবধান ও আকর্ষণের বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট:

সমাজে বয়সের ব্যবধানযুক্ত সম্পর্ক একটি পরিচিত ঘটনা। ২০২৪ সালে ইউরোপের ২৯টি দেশের প্রায় ৩৬ হাজার দম্পতির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গিনীর বয়স কিছুটা কম হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এর বিপরীতে, ২০২৫ সালের একটি বৃহৎ গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রথম দর্শনে নারী ও পুরুষ উভয়ই নিজেদের চেয়ে কিছুটা কম বয়সী সঙ্গীর প্রতি আকৃষ্ট হন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যৌনসঙ্গী হিসেবে নারীরা সাধারণত নিজেদের চেয়ে সামান্য বেশি বয়সী পুরুষ পছন্দ করলেও, পুরুষরা বয়স নির্বিশেষে বিশোর্ধ্ব নারীদের প্রতি অধিক আগ্রহ দেখান। সুতরাং, ‘নারীরা সহজাতভাবেই কেবল বয়স্ক পুরুষ পছন্দ করেন’—এমন সরলীকরণ করা সঠিক নয়।

সম্পর্ক গঠনের অন্যান্য অনুঘটক:

বয়সের পাশাপাশি মানসিক নৈকট্য, ধারাবাহিক যোগাযোগ, প্রশংসা, সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ধারণাও এই ধরনের সম্পর্কে প্রভাব ফেলে। বহুক্ষেত্রে সম্পর্কটি প্রেমের উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু না হয়ে বরং বন্ধুত্ব, পেশাগত সুসম্পর্ক, পরামর্শ গ্রহণ কিংবা নিয়মিত কথোপকথন থেকে ধীরে ধীরে গভীর আবেগে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে, বিবাহিত পুরুষের দায়বদ্ধতা একতরফা নয়। যদি তিনি তার বৈবাহিক অবস্থা গোপন রাখেন, তরুণীর সরল অনুভূতির সুযোগ নেন অথবা সম্পর্কের সীমারেখা ইচ্ছাকৃতভাবে অতিক্রম করেন, তবে এই পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে তার ভূমিকাও সমানভাবে দায়ী।

সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী সমীকরণ ও সতর্কতা:

বয়সের ব্যবধান নিজে থেকে কোনো সম্পর্ককে সফল বা ব্যর্থ করে না। তবে, অস্ট্রেলিয়ার পারিবারিক তথ্যভিত্তিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বয়সে বড় দম্পতিদের বৈবাহিক সন্তুষ্টি সময়ের সাথে তুলনামূলক দ্রুত হ্রাস পেতে পারে এবং ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে প্রাথমিক সন্তুষ্টির তারতম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বয়স, অর্থ, সামাজিক অবস্থান ও অভিজ্ঞতার বড় ব্যবধান কখনো কখনো সম্পর্কে একজনকে অধিক প্রভাবশালী করে তুলতে পারে, যা ২০২২ সালের একটি গবেষণায় তরুণ সঙ্গীর জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সার্বিকভাবে, একজন পুরুষের স্ত্রী ও সংসার থাকা সত্ত্বেও তার প্রতি তরুণীর আকর্ষণকে কেবল ‘বয়সের প্রতি দুর্বলতা’ হিসেবে দেখা সঠিক নয়। ব্যক্তিত্ব, পারস্পরিক যোগাযোগ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, প্রত্যাশা এবং সম্পর্কের অভিজ্ঞতার এক জটিল মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের আবেগ তৈরি হয়। সম্পর্কটি যদি বিবাহিত কারো সঙ্গে হয়, তবে আকর্ষণের পাশাপাশি সীমারেখা, পারস্পরিক সম্মতি, গোপনীয়তা এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আত্মোপলব্ধি, বর্তমান মানসিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এবং নিজের বিবেকের উপর ভিত্তি করে এমন অসম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

সূত্র: গ্রাসিয়া ডেইলি ইউকে, দ্য গার্ডিয়ান