Tue 29th Sep 2026, 7:06 pm

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমে কি পূরণ হয় সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি? একটি বিশ্লেষণ

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমে কি পূরণ হয় সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি? একটি বিশ্লেষণ
তৌহিদের মতো অনেকেরই হয়তো এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে। কর্মব্যস্ত সপ্তাহে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্তির সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমিয়ে সপ্তাহের সেই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, কেউ দুপুর পর্যন্ত ঘুমানো পছন্দ করেন, আবার কেউবা আগের রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েন।

Desi Media Point-এর একটি প্রতিবেদন বিভিন্ন গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে জানায় যে, ঘুমের অভাব পূরণে কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত ঘুম সহায়ক হতে পারে। এমনকি এক রাত ন্যূনতম ঘুমের পর পরবর্তী রাতে মাত্র দুই ঘণ্টা বাড়তি ঘুমও শরীরকে আংশিকভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, পুরো সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি একদিনেই পূরণ করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে যে, প্রায় অর্ধেক মানুষ নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন। কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ একইভাবে এই অভ্যাস অনুসরণ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম অত্যাবশ্যক। তবে বাস্তবতার নিরিখে সবসময় পর্যাপ্ত ঘুম সম্ভব হয় না। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—সপ্তাহান্তে অতিরিক্ত কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে কি সত্যিই পুরো সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব? এবং শরীরের জন্য কতটা অতিরিক্ত ঘুম উপকারী হতে পারে?

অতিরিক্ত ঘুমের প্রভাব বুঝতে হলে ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী দুটি মূল প্রক্রিয়া অনুধাবন করা জরুরি। প্রথমত, 'স্লিপ হোমিওস্ট্যাট' বা 'ঘুমের ট্যাঙ্ক'। আমরা যত বেশি সময় জাগ্রত থাকি, তত বেশি ঘুমের চাপ বা 'স্লিপ ডেবট' জমা হয়, যা বিশ্রাম বা ঘুমের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি করে। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেহঘড়ি, যা আলো, অন্ধকার, তাপমাত্রা এবং শারীরিক কার্যকলাপের মতো বাহ্যিক উদ্দীপনার মাধ্যমে দৈনিক ছন্দে ভারসাম্য বজায় রাখে।

এই দুটি প্রক্রিয়া যখন সুসংগঠিতভাবে কাজ করে, তখন পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে শরীর সুস্থ থাকে। তবে, অতিরিক্ত ঘুমিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করলে এই দুটি প্রক্রিয়াই ব্যাহত হতে পারে। দ্রুত ঘুমাতে যাওয়া বা সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা—উভয় ক্ষেত্রেই এটি ঘটতে পারে। কারণ, সকালে দীর্ঘক্ষণ ঘুমালে দিনের পরবর্তী সময়ে ঘুমের চাপ হ্রাস পায়, ফলে রাতে ঘুম আসতে বিলম্ব হয়, যা জৈব ঘড়িতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, শুক্রবার সকালে অতিরিক্ত ঘুমিয়ে পরের রাতে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে, যা শনিবার সকালে অ্যালার্ম বাজলে অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণ হতে পারে এবং এভাবেই ঘুমের ঘাটতির চক্র পুনরায় শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের স্লিপ ল্যাবের পরিচালক ও ঘুমবিষয়ক মনোবিজ্ঞানী মেলিন্ডা ক্যাসমেন্ট মন্তব্য করেন, 'এটি প্রতি সপ্তাহে একবার টাইম জোন পরিবর্তনের মতো।' তবে তিনি আরও বলেন যে, ঘুমের ঘাটতি পূরণের জন্য অতিরিক্ত ঘুম সবসময়ই ক্ষতিকর নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে এটি উপকারী হতে পারে।

স্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতার ওপর স্বল্প ঘুমের প্রভাব নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা এক রাতে মাত্র দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলেন, তাদের শরীরে দুই ধরনের শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীকালে অতিরিক্ত ঘুম এই মাত্রা কিছুটা কমাতে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। গবেষণার এক অংশে অংশগ্রহণকারীদের পরের রাতে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হলেও তাদের শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা সম্পূর্ণরূপে স্বাভাবিক হয়নি। তবে, যারা পরবর্তী রাতে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এই মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছিল।

অন্য এক গবেষণায় ১১ জন পুরুষকে, যারা নিয়মিত ৮ ঘণ্টা ঘুমাতেন, তাদের ঘুমের সময় ৪ ঘণ্টায় কমিয়ে আনা হয়। মাত্র ছয় রাতের এই স্বল্প ঘুম তাদের শরীরের গ্লুকোজ নিঃসরণ ও ইনসুলিনের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করার জন্য যথেষ্ট ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে, এই ১১ জন অংশগ্রহণকারীকে যখন টানা ছয় রাত ১২ ঘণ্টা করে ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হয়, তখন তাদের শারীরিক সূচকগুলি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় যে, দিনের বেলায় স্বল্প সময়ের ঘুম বা 'ন্যাপ' কম ঘুমানো ব্যক্তিদের জন্য উপকারী হতে পারে।

Desi Media Point-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে নিয়মিত অপর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ ধরে রাখা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা এবং স্থানিক দিকনির্ণয় দক্ষতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমিয়েও এই ঘাটতির প্রভাব সম্পূর্ণরূপে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

সুইডেনে পরিচালিত একটি ১৩ বছরব্যাপী গবেষণায় ৪০ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, ৬৫ বছরের কম বয়সী যেসব ব্যক্তি নিয়মিত রাতে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ঘুমাতেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি সর্বনিম্ন ছিল। বিপরীতে, যারা ৫ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমাতেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি ৬৫ শতাংশ বেশি ছিল। তবে, গবেষণায় আরও উঠে আসে যে, যারা ৫ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমাতেন, তারা যদি সপ্তাহান্তে ঘুমের ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণ করেন, তবে মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস পায়।

অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, ডিমেনশিয়া, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ২ হাজার ৮০০ প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত কম ঘুমানো ব্যক্তিদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি প্রায় ৭৩ শতাংশ বেশি। তবে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রতি এক ঘণ্টার অতিরিক্ত ঘুম এই ঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম।

ঘুমের 'সুইট স্পট' হলো সেই আদর্শ অবস্থা, যেখানে ঘুমের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবগুলো সর্বনিম্ন রাখা সম্ভব। জার্মানির মিউনিখের ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সাইকোলজির ক্রোনোবায়োলজির অধ্যাপক টিল রেনোবার্গ জোর দিয়ে বলেন, 'প্রত্যেক মানুষকে অবশ্যই ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে হবে, কারণ ঘুম আমাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।' গবেষণাগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, বেশিরভাগ মানুষের জন্য 'এক থেকে দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম' একটি কার্যকর 'সুইট স্পট' হতে পারে, যা শরীর ও মনে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক। অতএব, সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে কিছুটা অতিরিক্ত ঘুম উপকারী হতে পারে, তবে এর অর্থ এই নয় যে দুপুর পর্যন্ত ঘুমানো যুক্তিযুক্ত।