Wed 30th Sep 2026, 10:15 pm

সংঘাতকালে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি সর্বোচ্চ স্তরে, বিশ্ববাজারে মূল্যহ্রাস অপ্রাপ্য

সংঘাতকালে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি সর্বোচ্চ স্তরে, বিশ্ববাজারে মূল্যহ্রাস অপ্রাপ্য
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষত হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প কৌশল অবলম্বনের কারণে। ফলস্বরূপ, ইরান-যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।

তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং ইরাক সম্মিলিতভাবে দৈনিক গড়ে ১ কোটি ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ রপ্তানির রেকর্ড। যুদ্ধ-পূর্ববর্তী ১২ মাসের গড় দৈনিক রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি এই মাসে অর্জিত হয়েছে।

তেল রপ্তানির এই বৃদ্ধি কেবল অর্থনৈতিক নয়, এর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যও অনস্বীকার্য। সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইরানের দর কষাকষির ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। এক অর্থে, তারা তাদের পূর্বের সুবিধাজনক অবস্থান কিছুটা হলেও হারিয়েছে, কারণ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বর্ধিত তেল সরবরাহ দ্রুত চুক্তি সম্পাদনে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ কমিয়ে দিচ্ছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ড্রুরির বিশ্লেষক আনশিকা প্রজাপতি মন্তব্য করেছেন, ‘কয়েক মাসের ব্যাঘাতের পর উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে, যা রপ্তানি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, হরমুজ প্রণালিতে শাটল সার্ভিসের বর্ধিত ব্যবহার তেল রপ্তানি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

তবে, রপ্তানি বৃদ্ধি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে কোনো লক্ষণীয় হ্রাস দেখা যায়নি। অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য আগস্ট মাসের শেষে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলার থাকলেও, বর্তমানে তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যদিও এপ্রিল মাসে সংঘাতের তীব্রতার সময় এর দাম ১২৬ ডলার অতিক্রম করেছিল।

হরমুজ প্রণালির বিদ্যমান ঝুঁকি এড়াতে উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারীরা এখন নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করছে। তারা উপসাগরীয় বন্দর থেকে তেলবাহী জাহাজগুলোর মাধ্যমে তেল সংগ্রহ করে প্রণালির বাইরে অপেক্ষমাণ বৃহত্তর জাহাজে স্থানান্তর করছে। এর ফলে উপসাগরের ভেতরের বন্দর থেকে আসা জাহাজগুলোকে আর হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হচ্ছে না।

জাহাজমালিকদের সংগঠন বিমকোর প্রধান শিপিং বিশ্লেষক নিলস রাসমুসেনের মতে, এই কৌশল হরমুজ প্রণালির ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা এড়াতে ইচ্ছুক জাহাজগুলোর ওপর নির্ভর না করেই তেল রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব করে তুলেছে।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবও হরমুজ প্রণালি বর্জনের চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্যে দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে। যদিও গত ১০ সেপ্টেম্বর এই পাইপলাইনে হামলার পর সৌদি আরবকে সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ করতে হয়েছিল, সে সময় তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধি করে।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উপসাগরীয় উপকূলের রাস তানুরা বন্দর দিয়ে যে পরিমাণ তেল পাঠানো হচ্ছে, তা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ। পরবর্তীতে সৌদি আরব পাইপলাইনের কার্যক্রম আংশিকভাবে পুনরায় চালু করে এবং একই সাথে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকেও এই মাসে তেল রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। কেপলারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের দৈনিক তেল রপ্তানি দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৬৯ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন থেকেও তেল রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, হরমুজ প্রণালিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচলকারী জাহাজের আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক জাহাজ এমন পরিস্থিতিতে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখে, যার ফলে তাদের চলাচলের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও শাটল সার্ভিস এবং এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী চারটি জাহাজে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত সোমবার রাতে একটি তেলবাহী জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত জাহাজটি ছিল কুয়েতের সুপারট্যাংকার ‘আল ফুনতাস’, যা গত তিন মাসে একাধিকবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। এটি কুয়েতের বুরগান তেলক্ষেত্র থেকে তেল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলের কাছে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারে সরবরাহ করেছে।

ইউকেএমটিও আরও জানিয়েছে, গত সাত দিনে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথের নিরাপত্তা সহায়তায় প্রতিদিন গড়ে ৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে, যার বেশিরভাগই ছিল তেলবাহী ট্যাংকার।

এদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে যে, গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করা অন্তত ১৯টি জাহাজকে তারা লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, যার মধ্যে সোমবার রাতে ছিল সাতটি। ওই দিনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তি প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেন। তবে, আইআরজিসির এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সুপারট্যাংকারের ভাড়া গত সপ্তাহে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা দৈনিক ১২ লাখ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশে সক্ষম যেকোনো জাহাজের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী, যার ফলে পুরোনো তেলবাহী ট্যাংকারের দামও রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে, ড্রুরির বিশ্লেষক আনশিকা প্রজাপতি মনে করেন যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা ‘স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার প্রাথমিক পদক্ষেপ’ হতে পারে, যদিও যুদ্ধ শুরুর পূর্বের সময়ের তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ এখনও কম।