Tue 29th Sep 2026, 1:08 pm

হিমালয়ের বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের পর্যটন খাত বিপর্যস্ত: মৌসুমের প্রারম্ভেই ব্যবসায়িক মন্দা

হিমালয়ের বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের পর্যটন খাত বিপর্যস্ত: মৌসুমের প্রারম্ভেই ব্যবসায়িক মন্দা
হিমালয় অঞ্চলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের বিপর্যয়ে নেপালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শিল্প এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। পর্যটনের ব্যস্ততম মৌসুম শুরু হওয়া সত্ত্বেও, বন্যার প্রতিকূল প্রভাবে বহু বিদেশি পর্যটক তাদের ভ্রমণসূচি বাতিল বা স্থগিত করতে বাধ্য হওয়ায় পর্যটননির্ভর ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এর প্রত্যক্ষ শিকার হচ্ছে।

আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে নেপালের উত্তরাঞ্চলে সংঘটিত ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৪৫০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ও সেতুসমূহ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এমনকি যেসব এলাকায় বন্যার সরাসরি প্রভাব পড়েনি, সেখানেও পর্যটকদের সমাগম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

প্রতি বছর আগস্ট মাসে বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর সেপ্টেম্বর থেকে নেপালে পর্যটনের চূড়ান্ত ব্যস্ত মৌসুমের সূচনা হয়। এই সময়ে নির্মল আকাশ এবং মনোরম আবহাওয়ার কারণে দেশটিতে বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যটকের আগমন ঘটে। উল্লেখ্য, নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ৮ শতাংশ এবং এই খাত ১০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে।

বিগত বছরে নেপালে প্রায় ১১ লক্ষ ৫০ হাজারেরও অধিক পর্যটক আগমন করেছিলেন। এই পর্যটকদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত বিস্তৃত ব্যস্ততম সময়ে দেশটি ভ্রমণ করেন।

কাঠমান্ডুর একজন ট্যুর প্ল্যানার এবং ট্যাক্সিচালক পুষ্পরাজ রিমাল মন্তব্য করেছেন যে, বন্যার বিরূপ প্রভাবে চলতি বছর অধিকাংশ বিদেশি পর্যটক তাদের পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণ বাতিল করেছেন। তিনি সাধারণত কাঠমান্ডু ও পোখারার বিভিন্ন হোটেল এবং ট্রেকিং প্রতিষ্ঠানের সাথে কমিশন-ভিত্তিক অংশীদারিত্বে কাজ করেন।

তিনি পরিস্থিতিকে ‘এখনও এক প্রকার লকডাউনের’ সাথে তুলনা করে বলেন যে, দুই মাসের জন্য দুটি গাড়ি ভাড়া করা সত্ত্বেও তিনি স্বাভাবিক মৌসুমের তুলনায় এ বছর মাত্র পঁচিশ শতাংশ ব্যবসা পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছেন।

কাঠমান্ডু, পোখারা এবং চিতওয়ানের সংযোগকারী মহাসড়কের পাশেই নিজস্ব প্রস্তুতকৃত ঘোল বিক্রি করেন ৬১ বছর বয়সী সীতা নেপালি এবং তার ৬৮ বছর বয়সী স্বামী রামাকান্ত নেপালি। বন্যার কারণে সড়কপথ বন্ধ থাকায় টানা এগারো দিন তাদের দোকানে কোনো প্রকার বিক্রি হয়নি। সড়ক পুনরায় খুলে দেওয়ার পরেও পর্যটকদের স্বল্পতার কারণে তাদের দৈনিক বিক্রি পূর্বের তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।

বহু বিদেশি পর্যটক বন্যার সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের জারি করা ভ্রমণ সতর্কতার পরিপ্রেক্ষিতে নেপাল সফর বাতিল করেছেন। গত ১১ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের দূতাবাস এক সতর্কবার্তায় উল্লেখ করেছে যে, বন্যার প্রভাবে নেপালের বহু অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরে নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও অনুরূপ সতর্কতা জারি করে নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত করেছে।

যদিও নেপালের দূতাবাসের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, বন্যায় সমগ্র দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। নয়াদিল্লিতে অবস্থিত নেপালের দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স সুরেন্দ্র থাপা মন্তব্য করেন, ‘নেপাল খোলা আছে এবং ভ্রমণকারীদের জন্য নিরাপদ। কেবলমাত্র কিছু নির্দিষ্ট এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

চিতওয়ানের একটি রিসোর্টের কর্মী প্রমিলা ছেত্রী জানিয়েছেন যে, বন্যার খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের রিসোর্টের ৮০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়ে যায়। চিতওয়ানের প্রধান মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার কারণে এখানকার পর্যটন ব্যবসা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অনেক পর্যটক বন্যার সতর্কবার্তাকে সমগ্র নেপাল ভ্রমণে বিরত থাকার নির্দেশ হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বাস্তবিক অর্থে, দেশের অনেক অঞ্চলই বন্যার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এর ফলস্বরূপ, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছোট-বড় অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

বন্যার কারণে নেপালের পর্যটন খাতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে পর্যটননির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই আয় হ্রাসের তীব্র চাপ অনুভব করছেন। ঘোল বিক্রেতা সীতা নেপালি দুঃখের সাথে জানিয়েছেন যে, আয় ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় তারা বর্তমানে দুপুরের খাবারে কেবল চিড়া ও ঘোল খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, বন্যার প্রতিকূল প্রভাব কাটিয়ে নেপালের পর্যটন মৌসুম কতটা দ্রুত পুনরুদ্ধার হতে পারে, তা এখন মূলত পর্যটকদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত স্বাভাবিকীকরণের উপর নির্ভরশীল।

সূত্র: আল জাজিরা