ক্ষুধা অনুভূত হোক বা না হোক, 'ফুড নেভার কামস' (FoodNeverComes) ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলেই এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা আপনার জন্য অপেক্ষা করে। ২২ প্রকারের খাবারের সুবিন্যস্ত তালিকা থেকে পছন্দের আইটেম বেছে নিতে পারবেন, যেমন লোভনীয় বাটার চিকেন অথবা আকর্ষণীয় বিবিমবাপ। নির্বাচিত খাদ্যদ্রব্য কার্টে যোগ করে মোট বিল পর্যালোচনা করার পর আপনি অনায়াসে ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করতে পারেন। তাৎক্ষণিকভাবে একটি ট্র্যাকার আপনাকে অবহিত করবে যে, একজন ডেলিভারি কর্মী আপনার গন্তব্যের দিকে রওনা হয়েছেন।
এর পরপরই ওয়েবসাইটটি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা সৃষ্ট একটি ভুয়া ফোনকল আসে। ফোনে অপর প্রান্তের ব্যক্তি জানান যে তিনি আপনার ভবনের সামনে পৌঁছেছেন, তবে প্রবেশপথ বা দরজা খুঁজে পেতে সমস্যা হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো খাবারই আসলে প্রক্রিয়াজাত হয়নি; সম্পূর্ণ ক্রয়াদেশটি কেবল ডিজিটাল পর্দাতেই সীমাবদ্ধ।
ওয়েবসাইটটির নিজস্ব ঘোষণা হলো, 'খাবারের অর্ডার করুন, বিল পরিশোধের চিন্তা বাদ দিন।' তাদের স্লোগান আরও প্রত্যক্ষ: 'খাবার কখনোই পৌঁছায় না, তবে ডোপামিন নিশ্চিতভাবেই আসে।'
ভারতের রাজস্থানের উদয়পুরের ২৬ বছর বয়সী দুই সফটওয়্যার ডেভেলপার, পূর্বাংশ পারমার এবং অংশুল শর্মা, 'ফুড নেভার কামস' তৈরি করেছেন। তাঁদের দাবি অনুসারে, গত জুনে চালু হওয়ার পর থেকে ওয়েবসাইটটিতে ২৭ লক্ষাধিক ব্যবহারকারী ভিজিট করেছেন। বর্তমানে এতে ২২টি কাল্পনিক রান্নাঘর, ৩২৭ প্রকারের খাবার এবং ৩১৯টি বাস্তব রেসিপি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রতিটি খাবারের জন্য ভুয়া মূল্য, একটি পূর্ণাঙ্গ চেকআউট প্রক্রিয়া এবং কাল্পনিক ডেলিভারির অভিজ্ঞতাও সংযুক্ত করা হয়েছে।
'ফুড নেভার কামস' হলো ইন্টারনেটে উদ্ভূত এক নতুন ধারার অংশ, যা 'ডোপামিন সাইট' নামে পরিচিত। এই ধরনের ওয়েবসাইটগুলিতে ব্যবহারকারীরা কোনো প্রকৃত পণ্য ক্রয় না করেই কেনাকাটা বা সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। এর মধ্যে ভুয়া কেনাকাটা, কাল্পনিক ডেলিভারি, এমনকি ভুয়া ছুটির পরিকল্পনার ওয়েবসাইটও অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণ কোরিয়ায় এই প্রবণতা শুরু হলেও, বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে 'ডোপামিন শপ' এবং 'ফেকহল'-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
ডোপামিনকে প্রায়শই 'আনন্দের রাসায়নিক' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন যে এর ভূমিকা কেবল আনন্দ সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়; কোনো কিছু প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা এবং প্রত্যাশার সঙ্গেও ডোপামিনের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান।
এই ধারণার উৎস হলো উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা। পূর্বাংশ পারমার এবং অংশুল শর্মার পরিচয় ঘটে কম্পিউটার সায়েন্সের ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নের সময়। পরবর্তীতে তাঁরা 'নিউরোএক্স এআই' (NeuroX AI) নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
এই দুই তরুণ উদ্যোক্তা পর্যবেক্ষণ করেন যে, অনলাইন কেনাকাটার সময় অনেকেই তাদের পছন্দের জিনিসগুলি কার্টে যোগ করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলির একটি বড় অংশই ক্রয় করা হয় না।
অংশুল শর্মা ইলেকট্রনিক পণ্যের ওয়েবসাইটগুলিতে পণ্য ব্রাউজ করে সেগুলি কার্টে যোগ করতেন, কিন্তু পরবর্তীতে আর অর্ডার নিশ্চিত করতেন না। পারমারের মায়েরও একই ধরনের অভ্যাস ছিল। পারমার জানান, "তিনি কার্টে জিনিস যোগ করে বলতেন, 'পরে অর্ডার করব'।"
পূর্বাংশ পারমারের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা খাবার ডেলিভারি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। মুম্বাইয়ে একটি প্রকল্পে কাজ করার সময় তিনি সপ্তাহে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার রুপি খাবারের পেছনে ব্যয় করতেন। প্রায়শই তিনি এমন খাবার অর্ডার করতেন যার প্রকৃত প্রয়োজন ছিল না। তাঁর উপলব্ধি ছিল, "হয়তো আসল আকাঙ্ক্ষাটা সবসময় খাবারের জন্য ছিল না; বরং খাবার অর্ডার করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির প্রতিই এক ধরনের আকর্ষণ ছিল।"
এই দুই তরুণ উদ্যোক্তার মতে, ক্ষুধা থেকে শুরু হওয়া একটি অভ্যাস পরবর্তীতে খাবার অর্ডার করার আনন্দের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। এর ফলস্বরূপ, ক্ষুধা না থাকলেও একঘেয়েমি, উদ্বেগ অথবা কেবল অভ্যাস বশত খাবার অর্ডার করার তাগিদ তৈরি হয়।
ইয়েল সেন্টার ফর কাস্টমার ইনসাইটসের পরিচালক রবি ধর এই অনুভূতিকে 'অ্যান্টিসিপেটরি ইউটিলিটি' (Anticipatory Utility) হিসেবে উল্লেখ করেন। এর অর্থ হলো, কোনো কিছু প্রাপ্তির পূর্বেই সেটির অপেক্ষার আনন্দ উপভোগ করা।
নতুন জুতা কেনা, ছুটি কাটানো অথবা রেস্তোরাঁয় ভোজন করার মতো ক্ষেত্রে এই প্রত্যাশা মানুষের কল্পনাকে উদ্দীপিত করে। অনেক সময় প্রকৃত প্রাপ্তির চেয়েও সেই প্রাপ্তির অপেক্ষার মুহূর্তটি বেশি রোমাঞ্চকর হতে পারে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী কেন্ট বেরিজ 'চাওয়া' (wanting) এবং 'ভালো লাগা' (liking) - এই দুটিকে স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ডোপামিন মূলত 'চাওয়া' বা কোনো কিছু পাওয়ার তাগিদ বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত। মানুষ অনেক সময় একটি জিনিস শেষ পর্যন্ত যতটা উপভোগ করবে, তার চেয়েও বেশি তীব্রভাবে সেটি চাইতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা লেম্বকে মন্তব্য করেন যে, ডোপামিনকে কেবল 'আনন্দের রাসায়নিক' হিসেবে আখ্যায়িত করা সঠিক নয়। কোনো পুরস্কার প্রাপ্তির প্রত্যাশা এবং এর সাথে জড়িত অভ্যাসও মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রশ্ন উঠেছে, বারবার কাল্পনিক খাবার অর্ডার করা কি বাস্তব কোনো আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সক্ষম?
স্নায়ুবিজ্ঞানী কেন্ট বেরিজের মতে, এ ধরনের অভিজ্ঞতা কিছুটা 'চাওয়া'র অনুভূতি জাগাতে পারে। তবে, নতুনত্বের আকর্ষণ দ্রুত হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে, রবি ধর বিশ্বাস করেন যে, কৃত্রিম কেনাকাটা এক ধরনের চাপমুক্তির উপায় হতে পারে। কিন্তু এটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা সত্যিই পূরণ করে কিনা, তা জানতে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা লেম্বকেও সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, ভুয়া কেনাকাটা এমন একটি অভ্যাসের জন্ম দিতে পারে, যা প্রকৃত অর্থে কমানো উচিত; অর্থাৎ এটি বারবার একই আচরণ পুনরাবৃত্তির কারণ হতে পারে। তবে, এই বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা এখনো বিদ্যমান নেই।
উদ্যোক্তা অংশুল শর্মা নিজেও অনুরূপ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ফোনের পর্দা ভেঙে যাওয়ার পর, তিনি এক সপ্তাহ ধরে অ্যামাজনে ছয়-সাতটি ফোন তুলনা করেন এবং একের পর এক কার্টে যোগ করেন। পরিশেষে তিনি তাঁর নিজের ফোনটিই মেরামত করান। তাঁর ভাষ্যমতে, "ফোন নিয়ে গবেষণা করা এবং সেগুলিকে কার্টে যোগ করার প্রক্রিয়াটি আমার কাছে আনন্দদায়ক ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি কোনো ফোনই ক্রয় করিনি।"
খাবারের ক্ষেত্রেও তিনি একই আচরণ লক্ষ্য করেন, বিশেষ করে যখন তিনি উদ্বিগ্ন থাকেন। তখন তিনি খাবারের তালিকা ঘেঁটে কার্টে যোগ করেন, কিন্তু আদেশ নিশ্চিত করেন না। অংশুল শর্মা বলেন, "আমি বুঝতে পেরেছি, এই সমস্যাটি আমারও রয়েছে।"
খাবার থেকে ভ্রমণ:
উদ্যোক্তারা পরবর্তীতে খাবারের বাইরেও এই ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। তাঁদের দ্বিতীয় ওয়েবসাইট, 'ট্রিপ নেভার লিভ্জ' (Trip Never Leaves)। সেখানে ব্যবহারকারীরা গন্তব্য, ফ্লাইট, আসন, হোটেল এবং বিভিন্ন কার্যক্রম নির্বাচন করে একটি ছুটির পরিকল্পনা করতে পারেন। এরপর তাঁদের একটি ভার্চুয়াল ফ্লাইটে পাঠানো হয়, যা কখনোই রানওয়ে ছেড়ে যায় না। উদ্যোক্তাদের দাবি অনুযায়ী, ওয়েবসাইটটিতে এক লক্ষেরও বেশি মানুষ ভিজিট করেছেন।
এই ধরনের ওয়েবসাইটগুলির ব্যবহারকারী কারা, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা কঠিন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা লেম্বকে মনে করেন যে, ডিজিটাল মাধ্যমে আনন্দ বা তৃপ্তি অর্জনের অভ্যাসে তরুণ প্রজন্ম তুলনামূলকভাবে অধিক ঝুঁকিতে থাকে।
তরুণ উদ্যোক্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই ওয়েবসাইটগুলি থেকে অর্থ উপার্জন তাঁদের লক্ষ্য নয়। তাঁরা এগুলিকে বিনামূল্যে পরিচালনা করতে চান। ভবিষ্যতে এই ওয়েবসাইটগুলির তথ্য স্নায়ুবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনাও তাঁদের রয়েছে।
অতিরিক্ত খাবার অর্ডার করার অভ্যাসকে কেন্দ্র করে যে বিষয়টি কৌতুকপ্রদভাবে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত আধুনিক ভোগবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: কোনো কিছু প্রাপ্তির পূর্বেই যদি তার এত আনন্দ লাভ করা যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সেই জিনিসটির প্রকৃত প্রয়োজন আমাদের কতটা?
এর পরপরই ওয়েবসাইটটি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা সৃষ্ট একটি ভুয়া ফোনকল আসে। ফোনে অপর প্রান্তের ব্যক্তি জানান যে তিনি আপনার ভবনের সামনে পৌঁছেছেন, তবে প্রবেশপথ বা দরজা খুঁজে পেতে সমস্যা হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো খাবারই আসলে প্রক্রিয়াজাত হয়নি; সম্পূর্ণ ক্রয়াদেশটি কেবল ডিজিটাল পর্দাতেই সীমাবদ্ধ।
ওয়েবসাইটটির নিজস্ব ঘোষণা হলো, 'খাবারের অর্ডার করুন, বিল পরিশোধের চিন্তা বাদ দিন।' তাদের স্লোগান আরও প্রত্যক্ষ: 'খাবার কখনোই পৌঁছায় না, তবে ডোপামিন নিশ্চিতভাবেই আসে।'
ভারতের রাজস্থানের উদয়পুরের ২৬ বছর বয়সী দুই সফটওয়্যার ডেভেলপার, পূর্বাংশ পারমার এবং অংশুল শর্মা, 'ফুড নেভার কামস' তৈরি করেছেন। তাঁদের দাবি অনুসারে, গত জুনে চালু হওয়ার পর থেকে ওয়েবসাইটটিতে ২৭ লক্ষাধিক ব্যবহারকারী ভিজিট করেছেন। বর্তমানে এতে ২২টি কাল্পনিক রান্নাঘর, ৩২৭ প্রকারের খাবার এবং ৩১৯টি বাস্তব রেসিপি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রতিটি খাবারের জন্য ভুয়া মূল্য, একটি পূর্ণাঙ্গ চেকআউট প্রক্রিয়া এবং কাল্পনিক ডেলিভারির অভিজ্ঞতাও সংযুক্ত করা হয়েছে।
'ফুড নেভার কামস' হলো ইন্টারনেটে উদ্ভূত এক নতুন ধারার অংশ, যা 'ডোপামিন সাইট' নামে পরিচিত। এই ধরনের ওয়েবসাইটগুলিতে ব্যবহারকারীরা কোনো প্রকৃত পণ্য ক্রয় না করেই কেনাকাটা বা সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। এর মধ্যে ভুয়া কেনাকাটা, কাল্পনিক ডেলিভারি, এমনকি ভুয়া ছুটির পরিকল্পনার ওয়েবসাইটও অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণ কোরিয়ায় এই প্রবণতা শুরু হলেও, বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে 'ডোপামিন শপ' এবং 'ফেকহল'-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
ডোপামিনকে প্রায়শই 'আনন্দের রাসায়নিক' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন যে এর ভূমিকা কেবল আনন্দ সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়; কোনো কিছু প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা এবং প্রত্যাশার সঙ্গেও ডোপামিনের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান।
এই ধারণার উৎস হলো উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা। পূর্বাংশ পারমার এবং অংশুল শর্মার পরিচয় ঘটে কম্পিউটার সায়েন্সের ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নের সময়। পরবর্তীতে তাঁরা 'নিউরোএক্স এআই' (NeuroX AI) নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
এই দুই তরুণ উদ্যোক্তা পর্যবেক্ষণ করেন যে, অনলাইন কেনাকাটার সময় অনেকেই তাদের পছন্দের জিনিসগুলি কার্টে যোগ করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলির একটি বড় অংশই ক্রয় করা হয় না।
অংশুল শর্মা ইলেকট্রনিক পণ্যের ওয়েবসাইটগুলিতে পণ্য ব্রাউজ করে সেগুলি কার্টে যোগ করতেন, কিন্তু পরবর্তীতে আর অর্ডার নিশ্চিত করতেন না। পারমারের মায়েরও একই ধরনের অভ্যাস ছিল। পারমার জানান, "তিনি কার্টে জিনিস যোগ করে বলতেন, 'পরে অর্ডার করব'।"
পূর্বাংশ পারমারের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা খাবার ডেলিভারি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। মুম্বাইয়ে একটি প্রকল্পে কাজ করার সময় তিনি সপ্তাহে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার রুপি খাবারের পেছনে ব্যয় করতেন। প্রায়শই তিনি এমন খাবার অর্ডার করতেন যার প্রকৃত প্রয়োজন ছিল না। তাঁর উপলব্ধি ছিল, "হয়তো আসল আকাঙ্ক্ষাটা সবসময় খাবারের জন্য ছিল না; বরং খাবার অর্ডার করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির প্রতিই এক ধরনের আকর্ষণ ছিল।"
এই দুই তরুণ উদ্যোক্তার মতে, ক্ষুধা থেকে শুরু হওয়া একটি অভ্যাস পরবর্তীতে খাবার অর্ডার করার আনন্দের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। এর ফলস্বরূপ, ক্ষুধা না থাকলেও একঘেয়েমি, উদ্বেগ অথবা কেবল অভ্যাস বশত খাবার অর্ডার করার তাগিদ তৈরি হয়।
ইয়েল সেন্টার ফর কাস্টমার ইনসাইটসের পরিচালক রবি ধর এই অনুভূতিকে 'অ্যান্টিসিপেটরি ইউটিলিটি' (Anticipatory Utility) হিসেবে উল্লেখ করেন। এর অর্থ হলো, কোনো কিছু প্রাপ্তির পূর্বেই সেটির অপেক্ষার আনন্দ উপভোগ করা।
নতুন জুতা কেনা, ছুটি কাটানো অথবা রেস্তোরাঁয় ভোজন করার মতো ক্ষেত্রে এই প্রত্যাশা মানুষের কল্পনাকে উদ্দীপিত করে। অনেক সময় প্রকৃত প্রাপ্তির চেয়েও সেই প্রাপ্তির অপেক্ষার মুহূর্তটি বেশি রোমাঞ্চকর হতে পারে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী কেন্ট বেরিজ 'চাওয়া' (wanting) এবং 'ভালো লাগা' (liking) - এই দুটিকে স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ডোপামিন মূলত 'চাওয়া' বা কোনো কিছু পাওয়ার তাগিদ বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত। মানুষ অনেক সময় একটি জিনিস শেষ পর্যন্ত যতটা উপভোগ করবে, তার চেয়েও বেশি তীব্রভাবে সেটি চাইতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা লেম্বকে মন্তব্য করেন যে, ডোপামিনকে কেবল 'আনন্দের রাসায়নিক' হিসেবে আখ্যায়িত করা সঠিক নয়। কোনো পুরস্কার প্রাপ্তির প্রত্যাশা এবং এর সাথে জড়িত অভ্যাসও মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রশ্ন উঠেছে, বারবার কাল্পনিক খাবার অর্ডার করা কি বাস্তব কোনো আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সক্ষম?
স্নায়ুবিজ্ঞানী কেন্ট বেরিজের মতে, এ ধরনের অভিজ্ঞতা কিছুটা 'চাওয়া'র অনুভূতি জাগাতে পারে। তবে, নতুনত্বের আকর্ষণ দ্রুত হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে, রবি ধর বিশ্বাস করেন যে, কৃত্রিম কেনাকাটা এক ধরনের চাপমুক্তির উপায় হতে পারে। কিন্তু এটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা সত্যিই পূরণ করে কিনা, তা জানতে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা লেম্বকেও সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, ভুয়া কেনাকাটা এমন একটি অভ্যাসের জন্ম দিতে পারে, যা প্রকৃত অর্থে কমানো উচিত; অর্থাৎ এটি বারবার একই আচরণ পুনরাবৃত্তির কারণ হতে পারে। তবে, এই বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা এখনো বিদ্যমান নেই।
উদ্যোক্তা অংশুল শর্মা নিজেও অনুরূপ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ফোনের পর্দা ভেঙে যাওয়ার পর, তিনি এক সপ্তাহ ধরে অ্যামাজনে ছয়-সাতটি ফোন তুলনা করেন এবং একের পর এক কার্টে যোগ করেন। পরিশেষে তিনি তাঁর নিজের ফোনটিই মেরামত করান। তাঁর ভাষ্যমতে, "ফোন নিয়ে গবেষণা করা এবং সেগুলিকে কার্টে যোগ করার প্রক্রিয়াটি আমার কাছে আনন্দদায়ক ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি কোনো ফোনই ক্রয় করিনি।"
খাবারের ক্ষেত্রেও তিনি একই আচরণ লক্ষ্য করেন, বিশেষ করে যখন তিনি উদ্বিগ্ন থাকেন। তখন তিনি খাবারের তালিকা ঘেঁটে কার্টে যোগ করেন, কিন্তু আদেশ নিশ্চিত করেন না। অংশুল শর্মা বলেন, "আমি বুঝতে পেরেছি, এই সমস্যাটি আমারও রয়েছে।"
খাবার থেকে ভ্রমণ:
উদ্যোক্তারা পরবর্তীতে খাবারের বাইরেও এই ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। তাঁদের দ্বিতীয় ওয়েবসাইট, 'ট্রিপ নেভার লিভ্জ' (Trip Never Leaves)। সেখানে ব্যবহারকারীরা গন্তব্য, ফ্লাইট, আসন, হোটেল এবং বিভিন্ন কার্যক্রম নির্বাচন করে একটি ছুটির পরিকল্পনা করতে পারেন। এরপর তাঁদের একটি ভার্চুয়াল ফ্লাইটে পাঠানো হয়, যা কখনোই রানওয়ে ছেড়ে যায় না। উদ্যোক্তাদের দাবি অনুযায়ী, ওয়েবসাইটটিতে এক লক্ষেরও বেশি মানুষ ভিজিট করেছেন।
এই ধরনের ওয়েবসাইটগুলির ব্যবহারকারী কারা, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা কঠিন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা লেম্বকে মনে করেন যে, ডিজিটাল মাধ্যমে আনন্দ বা তৃপ্তি অর্জনের অভ্যাসে তরুণ প্রজন্ম তুলনামূলকভাবে অধিক ঝুঁকিতে থাকে।
তরুণ উদ্যোক্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই ওয়েবসাইটগুলি থেকে অর্থ উপার্জন তাঁদের লক্ষ্য নয়। তাঁরা এগুলিকে বিনামূল্যে পরিচালনা করতে চান। ভবিষ্যতে এই ওয়েবসাইটগুলির তথ্য স্নায়ুবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনাও তাঁদের রয়েছে।
অতিরিক্ত খাবার অর্ডার করার অভ্যাসকে কেন্দ্র করে যে বিষয়টি কৌতুকপ্রদভাবে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত আধুনিক ভোগবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: কোনো কিছু প্রাপ্তির পূর্বেই যদি তার এত আনন্দ লাভ করা যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সেই জিনিসটির প্রকৃত প্রয়োজন আমাদের কতটা?
