Sun 13th Sep 2026, 12:19 pm

যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত কি সত্যিই মাত্র ১৪ দিনের জন্য পর্যাপ্ত? অনলাইন দাবির সত্যতা যাচাই

যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত কি সত্যিই মাত্র ১৪ দিনের জন্য পর্যাপ্ত? অনলাইন দাবির সত্যতা যাচাই
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত বিভিন্ন পোস্টে একটি উদ্বেগজনক দাবি করা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মাত্র ১৪ দিনের তেল মজুত অবশিষ্ট রয়েছে। এই দাবির সমর্থনে একটি সরল গাণিতিক হিসাব উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাদের গণনা অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতে (এসপিআর) আনুমানিক ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেল তেল বিদ্যমান। অপরদিকে, দেশটিতে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ব্যবহৃত হয়। এই দুটি সংখ্যাকে ভাগ করলে ফলাফল আসে প্রায় ১৪ দিন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও (এনপিআর) গত ১৬ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত (এসপিআর) গত চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। গত মাসের প্রারম্ভে এই মজুতের পরিমাণ ৩০ কোটি ব্যারেলের নিচে নেমে আসে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতে এর পরিমাণ ছিল ৪১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল। অনলাইনে ব্যাপক প্রচারিত এই হিসাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রতিফলিত হয়েছে। তা হলো, ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতের পরিমাণ বর্তমানে নিম্নগামী।

তবে, এই হিসাবে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে। এর মূল কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের তেল সরবরাহের একমাত্র উৎস এই কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত নয়। অথচ, অনেক সময় ঝুঁকির হিসাব বা সমালোচনার ক্ষেত্রে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এই জরুরি মজুত ফুরিয়ে গেলে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে। প্রকৃত সমস্যাটি হলো, উল্লিখিত হিসাবে যে সংখ্যাগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলো ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিকে একত্রিত করে পরিমাপ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এসপিআরে অপরিশোধিত তেল মজুত থাকে। অন্যদিকে, দৈনিক ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল ব্যবহারের যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে, তা সামগ্রিক পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহের পরিমাণ নির্দেশ করে। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের একটি ব্যাপকতর হিসাব, যার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে পেট্রল, ডিজেল, জেট জ্বালানি এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য।

এ কারণে এই হিসাবটি অনেকটা এমন একটি উপমার সাথে তুলনীয়: যেখানে একটি পরিবারের জরুরি অবস্থার জন্য আলমারিতে সংরক্ষিত টিনজাত খাদ্যের পরিমাণের সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন মোট খাদ্যের চাহিদার তুলনা করে বলা হচ্ছে যে তাদের কাছে মাত্র ১৪ দিনের খাবার অবশিষ্ট আছে। অথচ এই হিসাবে মুদি দোকানে প্রাপ্ত পণ্য, ঘরের ফ্রিজে রাখা খাবার এবং প্রতিদিনের বাজার থেকে সংগৃহীত খাদ্যদ্রব্য বিবেচনা করা হয়নি। এটি উল্লেখ করা অপরিহার্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পেট্রোলিয়াম সরবরাহ ব্যবস্থা কেবল কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতের (এসপিআর) ওপর নির্ভরশীল নয়। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) সাম্প্রতিক তথ্যমতে, দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। একই সাথে, তাদের বাণিজ্যিক মজুতে প্রায় ৪২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। এছাড়াও, শোধনাগারগুলোতে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ব্যারেল তেল পরিশোধন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করে। এই প্রেক্ষাপটে, এসপিআর হলো কেবল দেশটির জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত তেলের মজুত, এটি যুক্তরাষ্ট্রের মূল বা প্রধান তেলের ভান্ডার নয়। আর এই মৌলিক বিষয়টিই এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতদসত্ত্বেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, দেশটির জরুরি তেলের মজুত হ্রাস পাচ্ছে। এটি সত্য যে যুক্তরাষ্ট্র আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তেলশূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে নেই, তবে কয়েক বছর আগের তুলনায় দেশটির সরকার-নিয়ন্ত্রিত মজুত ব্যবস্থায় জরুরি ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

এক্ষেত্রে এসপিআরকে একটি বিমা পলিসি হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় কেউ বিমার অর্থ দিয়ে জীবনযাপন করে না। কিন্তু যুদ্ধ, অবরোধ, ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় অথবা বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে আকস্মিক ব্যাঘাতের মতো কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে এই বিমার সুরক্ষা অত্যন্ত কার্যকর হবে। এমন পরিস্থিতিতে নিঃসন্দেহে আপনি চাইবেন যে এই পলিসি যেন আপনার করায়ত্ত থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত (এসপিআর) বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বৃহৎ জরুরি অপরিশোধিত তেলের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুসারে, দেশটির উপকূলবর্তী অঞ্চলে চারটি ভূগর্ভস্থ লবণগুহায় মোট ৭১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা বিদ্যমান। লবণগুহা হলো ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক লবণের স্তরে সৃষ্ট বিশাল গহ্বর। এই গুহাগুলিতে লবণ অপসারণের মাধ্যমে কৃত্রিম স্থান তৈরি করে তেল বা গ্যাস সংরক্ষণ করা হয়। ২০২০ সালের শেষ দিকে এসপিআরে প্রায় ৬৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল মজুত ছিল। ২০২৬ সালের ২৮ আগস্ট তা কমে প্রায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮২ সালের নভেম্বরের পর এটিই এসপিআরের সর্বনিম্ন মজুত। বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর উত্তরসূরি জো বাইডেন—উভয় প্রেসিডেন্টের কার্যকালেই এই মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং, ভাইরাল হওয়া দাবিটির যে অংশটি বাস্তবিক অর্থেই গুরুত্ব সহকারে দেখার মতো, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি তেলের মজুত প্রকৃতপক্ষে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।