Tue 29th Sep 2026, 10:45 am

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও এবং মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার নেপথ্যের কুশীলবরা অধরা

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও এবং মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার নেপথ্যের কুশীলবরা অধরা
রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় পুলিশ দুই অস্ত্রধারীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পাশাপাশি, মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে, উভয় ঘটনাতেই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বা নেপথ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন।

নিউগিনি প্রপার্টিজের ওপর সংঘটিত হামলার কারণ হিসেবে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নাম উঠে এসেছে। তার বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে এবং সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মামলার ৪ নম্বর আসামি মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিনের নিউগিনি প্রপার্টিজের পাশে ৩৫ শতাংশ জমি রয়েছে। তার চারপাশের সব জমি নিউগিনি প্রপার্টিজের মালিকানাধীন। ফলস্বরূপ, ওই জমিতে প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য নিউগিনি প্রপার্টিজের সড়ক ব্যবহার করতে হয়, যার প্রবেশপথও তাদের নিয়ন্ত্রণে। প্রাথমিক তদন্তে এই দখল নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই হামলা সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জমি সংক্রান্ত অন্য কোনো জটিলতা আছে কিনা, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর হামলাকারীরা সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয়। এই সমিতির কার্যক্রমে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

গত শনিবার গভীর রাতে নিউগিনি প্রকল্পের কার্যালয় ও পার্শ্ববর্তী স্থাপনাগুলোতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় সুপরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। আশপাশের আরও কয়েকটি বাড়ি ও স্থাপনায়ও একই ধরনের ভাঙচুর চালানো হয়। নিউগিনি প্রকল্পের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লিয়াকত আলী গত সোমবার Desi Media Point-কে জানান, এই হামলায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর সর্বাধিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এই ঘটনায় নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি তদন্ত করছে ক্যান্টনমেন্ট থানা-পুলিশ। গতকাল পর্যন্ত থানা-পুলিশ এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম Desi Media Point-কে জানান, হামলার ঘটনায় ডিবি তিনজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে একজন হলেন মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ আলম অনিক।

গ্রেপ্তারকৃত অন্যান্য ব্যক্তিরা হলেন মামুন, আসলাম, মুন্না, মিজানুর রহমান এবং শাহরিয়ার মাহমুদ। মামুন ও মুন্না ভাষানটেক বস্তির বাসিন্দা, যাদের মধ্যে মামুনের বাড়ি গফরগাঁওয়ে। টাঙ্গাইলের বাসিন্দা আসলাম অটোরিকশা চালক। সর্বশেষ গ্রেপ্তার হওয়া মিজানুর রহমান মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন Desi Media Point-কে নিশ্চিত করেছেন যে, মামুন ও মুন্না অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলায় অংশ নিয়েছিল। জড়িত অন্যান্যদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে কারা এক্সক্যাভেটর নিয়ে এসেছিল এবং এই হামলার নেতৃত্বে কে বা কারা ছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে। তাদের গ্রেপ্তার এবং এক্সক্যাভেটর উদ্ধারের জন্য অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে।

মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর হামলাকারীরা সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয়। এই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে, যারা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ (মিষ্টি)-এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তবে ফেরদৌসী আহমেদ এই ঘটনায় তার জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার নেপথ্যের মূল হোতাদের কাউকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনের আওতায় আনতে পারেনি। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘটনাস্থলে কারা এক্সক্যাভেটর এনেছিল এবং হামলার নেতৃত্বে কে বা কারা ছিল, তা শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তাদের গ্রেপ্তার এবং এক্সক্যাভেটর উদ্ধারের অভিযান চলমান রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে হামলার পূর্বে জড়িত অনেক ব্যক্তি শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে সমবেত হন। পরবর্তীতে তারা সেখান থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালাতে যান।

বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে বি-ব্লক মাঠসংলগ্ন লেলিনের কার্যালয়ের সামনে লোকজনের সমাগমের দৃশ্য একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়েছে। এছাড়া, স্বাস্থ্যকেন্দ্র সংলগ্ন বিভিন্ন মার্কেটের ফুটেজে হামলার সময় একটি সাদা মাইক্রোবাসকে ঘটনাস্থলের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে।

স্থানীয় জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলা ও ভাঙচুরের সময় হানিফ মিয়া, আবুল কালাম এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ কয়েকজন একটি সাদা মাইক্রোবাসে ঘটনাস্থলের আশেপাশে অবস্থান করে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। এই ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় হানিফ মিয়ার নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ এ পর্যন্ত মোট ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। সর্বশেষ রোববার রাতে মো. মিন্টু (৩৫) ও মো. মিলন (৪০) নামের দুজনকে আটক করা হয়, যারা ভাঙচুরে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মালামাল লুটেও জড়িত ছিল। তাদের কাছ থেকে লুটকৃত মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।

এর আগে শুক্রবার রাতে শাহ আলী থানার পুলিশ মো. সোহেল (২২), মো. জুয়েল (২৩), জিহাদ হাসান (২১) এবং মো. রাব্বি (২০) নামের চার তরুণকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জুয়েল শাহ আলী বাগের করলাপাড়ায় বসবাস করতেন, আর বাকি তিনজন শাহ আলী মাজার এলাকার ভাসমান তরুণ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য মতে, তারা অর্থের বিনিময়ে এই ভাঙচুর কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল।

পরবর্তীতে, শনিবার সন্ধ্যায় আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরা হলেন মো. শাহাদাত হোসেন (৩৩), কাজী মকবুল হোসেন (৫৮), মো. শাহ আলম (৫৩), মো. আতিকুর রহমান (৩৩), মো. কামরুল ইসলাম (৫২) ও মো. শাকিল (২০)। এদের মধ্যে পাঁচজনকে ডিবি শাহবাগ থেকে এবং অপর একজনকে শাহ আলী এলাকা থেকে থানা-পুলিশ গ্রেপ্তার করে। রোববার আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তারকৃত মোট ১২ জনের মধ্যে শাহ আলম ‘সমমনা দোকানদার সমিতির’ সাধারণ সম্পাদক।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর ও দখলের ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গতকাল Desi Media Point-কে তিনি বলেন, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকে ভাঙচুর এবং সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় সরকারি দলের সদস্য বা প্রভাবশালী মহলের জড়িত থাকার গুঞ্জন রয়েছে, যার কারণে পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে মনে হয়। তিনি আরও মন্তব্য করেন, সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে সংঘটিত হামলায় মনে হচ্ছে, দেশ জনসন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে এবং সরকার সন্ত্রাসীদের মধ্যে কোনো প্রকার ভীতি সঞ্চার করতে পারেনি।