Sat 26th Sep 2026, 8:34 pm

বাবার প্রবাসে বাসচাপায় মর্মান্তিক মৃত্যু, দুই দশক পর দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন ছেলেও: একই নিয়তির শিকার পরিবার

বাবার প্রবাসে বাসচাপায় মর্মান্তিক মৃত্যু, দুই দশক পর দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন ছেলেও: একই নিয়তির শিকার পরিবার
নিয়তির নির্মম পরিহাসে, দুই দশক পূর্বে সৌদি আরবে এক মর্মান্তিক বাসচাপায় বাবা ফিরোজ আহমদকে হারানোর সময় কায়সার হামিদ (২৫) ছিলেন মাত্র তিন বছরের এক শিশু। সেই সময় বাবার মৃতদেহ দেশে ফিরিয়ে আনাও সম্ভব হয়নি। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে, একই রকম এক সড়ক দুর্ঘটনায় এবার নিজ দেশেই প্রাণ হারালেন কায়সার হামিদ, যা পরিবারটির উপর শোকের এক নতুন ছায়া ফেলেছে।

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাট বাজারের সিকদারপাড়ার বাসিন্দা কায়সার হামিদ। গত বৃহস্পতিবার সকালে মোটরসাইকেলযোগে চট্টগ্রাম নগরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার পথে হাটহাজারী এলাকায় বাসচাপায় গুরুতর আহত হন তিনি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে চট্টগ্রাম নগরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শুক্রবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।

কায়সার ছিলেন হাজেরা তজু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নগরের একটি থাই অ্যালুমিনিয়াম কারখানার হিসাব বিভাগে কর্মরত থেকে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। আজ শনিবার দুপুরে গ্রামের বাড়িতে কায়সার হামিদের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

জানাজা পরবর্তী সময়ে কায়সার হামিদের বাড়িতে গিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। পাকা ঘরের এক কক্ষে কায়সারের মা রোজী আকতার তার ছেলের স্মৃতিচারণ করে অনবরত বিলাপ করছিলেন। স্বজনরা ঘিরে ধরে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, তার আহাজারি থামানো যাচ্ছিল না। শোকের তীব্রতা এতই ছিল যে, বারবার তিনি জ্ঞান হারাচ্ছিলেন।

স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, কায়সার হামিদের বাবা ফিরোজ আহমদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রবাসী ছিলেন। ২০০৪ সালে হজ পালনের উদ্দেশ্যে নিজের মা-বাবাকে নিয়ে সৌদি আরবে গেলে মক্কার বুকে এক বাসচাপায় মর্মান্তিকভাবে তিনি প্রাণ হারান। সেখানেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

ফিরোজ আহমদের অকাল মৃত্যুর সময় কায়সার হামিদের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর, আর তার ছোট ভাই মুহাম্মদ কাইয়ুম ছিলেন কোলের শিশু। দুই দশকের ব্যবধানে রোজী আকতারকে স্বামীর মতোই একই মর্মান্তিক উপায়ে তার আদরের সন্তানকে হারাতে হলো, যা তার জীবনকে আবারও এক অসহনীয় দুঃখে ডুবিয়ে দিয়েছে।

স্বজনরা আরও জানান, গত বৃহস্পতিবার সকালে কায়সার হামিদ তার কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেলে করে রওনা হয়েছিলেন। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের হাটহাজারীর নজুমিয়াহাট বাজারে পৌঁছালে ‘এবি ট্রাভেলস’ নামের একটি বাসের বেপরোয়া চাপায় তিনি গুরুতর আহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি।

জানাজা শেষে গ্রামে কথা হয় কায়সারের চাচা মোজাম্মেল হকের সাথে, যিনি কায়সারের দুর্ঘটনার খবর শুনে বৃহস্পতিবার রাতেই সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ছুটে এসেছেন। শোকাহত মোজাম্মেল হক বলেন, “আমার বড় ভাইয়ের মতোই ছেলেটাকেও এভাবে মর্মান্তিকভাবে হারাবো, তা আমরা স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি। নিজ হাতে কাঁধে করে নিয়ে এসে ছেলেকে দাফন করে আসলাম।”

কায়সারের মামাতো ভাই কামরুল হাসান জানান, পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কায়সারের মা অনেক কষ্ট করে তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় কায়সারের অকাল মৃত্যু মায়ের সকল স্বপ্নকে তছনছ করে দিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাটহাজারীর মদুনাঘাট পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সাইফুল ইসলাম জানান, কাপ্তাইমুখী একটি বাসের চাপায় কায়সার হামিদের মোটরসাইকেলটি দুর্ঘটনাকবলিত হয়। ঘটনার পর ঘাতক বাসটিকে জব্দ করা হয়েছে।