মারওয়া খায়েরের সাবলীল বাংলা শুনলে মনে হতে পারে, তিনি সারাজীবন বাংলাভাষী পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন। অথচ তাঁর জন্ম সৌদি আরবে, আর শৈশব থেকে তারুণ্যের বেশিরভাগ সময় কেটেছে যুক্তরাজ্যে। ব্যতিক্রমী এই ভাষাদক্ষতার পাশাপাশি তিনি দক্ষতার সাথে গিটার বাজিয়ে পছন্দের বাংলা গানে সুর তোলেন। যদিও তাঁর সংগীতচর্চা বা বাংলাপ্রেম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ সীমিত ছিল, কারণ কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্টদের (পিএসএ) প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হবে, আমরা তাঁর পিএসএ থেকে সফল প্রশিক্ষক হয়ে ওঠার অসাধারণ যাত্রাটি শুনতে আগ্রহী ছিলাম।
২০১০ সালের দিকে মারওয়া খায়ের ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। এর পূর্বে তিনি একটি ওষুধের দোকান এবং একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেও কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ব্যাংকিং খাতে যোগদানের পর তিনি সেখানেই স্থিতিশীল ক্যারিয়ার গড়ার প্রত্যাশা করেছিলেন। তবে, ২০০৮-২০০৯ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ব্যাংকিং সেক্টরের চাকরির নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তোলে, ফলস্বরূপ তিনি নতুন পেশার সন্ধানে ব্রতী হন।
এই সময়ে ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়েতে (ডিএলআর) কর্মরত একজন বন্ধু তাঁকে রেলওয়েতে আবেদন করার পরামর্শ দেন। তুলনামূলক উচ্চ বেতন এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মারওয়াকে এই পেশার প্রতি আকৃষ্ট করে।
লন্ডনের মেট্রো রেলব্যবস্থা মূলত আন্ডারগ্রাউন্ড, ওভারগ্রাউন্ড এবং ডিএলআর — এই তিনটি নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে, ডিএলআর ৪৫টি স্টেশনজুড়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে সংযুক্ত করেছে। প্রায় চার দশক আগে চালু হওয়া এই স্বয়ংক্রিয় রেল ব্যবস্থা প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীকে সেবা প্রদান করে। স্বয়ংক্রিয় প্রতিটি ট্রেনে চালকের পরিবর্তে একজন প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্ট (পিএসএ) দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি স্টেশনে ট্রেন থামার পর এবং পরবর্তী যাত্রা শুরুর আগে নিরাপদে দরজা বন্ধ করা ও ট্রেনকে প্রস্তুত করা পিএসএ-এর একটি প্রধান দায়িত্ব। এর পাশাপাশি, যাত্রীদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন এবং গ্রাহক সেবা প্রদানও তাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়মিত ঘোষণা দেওয়া, যাত্রীদের গন্তব্য খুঁজে পেতে সহায়তা করা, এবং ম্যাপ সম্পর্কে বোঝানোও পিএসএ-এর অন্তর্ভুক্ত। লন্ডনে বিভিন্ন দেশের অধিবাসী এবং পর্যটকদের ভিড় থাকায়, বিশেষত ইস্ট লন্ডনে এমন অনেক যাত্রী থাকেন যারা ইংরেজিতে খুব সাবলীল নন অথবা লন্ডনের মানচিত্র বুঝতে অসুবিধাবোধ করেন। তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ নির্দেশ করাও প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্টের দায়িত্ব। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের পরই মারওয়া ডিএলআর পদে আবেদন করেন। তিনি জানান, "এই কাজের জন্য কারিগরি দক্ষতা বাধ্যতামূলক নয়। প্রয়োজনীয় সমস্ত বিষয় চাকরিতে যোগদানের পর নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়।"
প্রায় চার মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের পর আরও দুই সপ্তাহের নিবিড় প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন পর্ব চলে। এই ধাপে লিখিত এবং ব্যবহারিক উভয় প্রকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। সফলভাবে সকল পর্যায় সম্পন্ন করার পর ট্রেন পরিচালনার লাইসেন্স প্রাপ্ত হন। ফলস্বরূপ, ২০১১ সালে মারওয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএলআর-এ ট্রেন অপারেটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
রেলওয়েতে কাজের সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না; প্রাথমিক বাধা আসে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে। তাদের ধারণা ছিল যে এটি পুরুষদের কাজ এবং নারীরা সাধারণত এ ধরনের পেশায় নিযুক্ত হন না। তবে, সময়ের সাথে সাথে পরিবারের মনোভাব পরিবর্তিত হয় এবং বর্তমানে তারাই মারওয়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও সমর্থক।
চাকরিতে যোগদানের পরের বছরেই মারওয়ার কর্মজীবনে একটি স্মরণীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের সময়, ক্যানারি ওয়ার্ফ থেকে প্যারালিম্পিক মশাল বহন করে স্ট্র্যাটফোর্ডে নিয়ে যাওয়া ডিএলআর ট্রেনটির অপারেটর হিসেবে তাঁকে নির্বাচন করা হয়।
অসংখ্য পিএসএ-এর মধ্যে থেকে মারওয়াকে নির্বাচিত করার মূল কারণ ছিল যাত্রীদের উদ্দেশে তাঁর ব্যতিক্রমী এবং সুপরিচিত ঘোষণা প্রদানের শৈলী। প্যারালিম্পিক মশাল বহনের সেই ঐতিহাসিক যাত্রায় Desi Media Point সহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উপস্থিত ছিল। যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলি ধারণের পাশাপাশি, ডিএলআর-এর প্রতিনিধিত্বকারী কণ্ঠ হিসেবে মারওয়ার ঘোষণা সেই আয়োজনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
মারওয়ার সেই কণ্ঠস্বর এখনো ডিএলআর-এর অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ট্রেন অপারেটরদের জন্য নির্মিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ভিডিওতে পরিচালন পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনার বর্ণনা তাঁর কণ্ঠেই রেকর্ড করা হয়েছে।
মারওয়া জানান, "পিএসএ হিসেবে কাজ করার সময় অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল ত্রুটিপূর্ণ সিগন্যালিং সিস্টেম।" ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের পূর্বে ডিএলআর-এর সিগন্যালিং ব্যবস্থা অত্যন্ত অনির্ভরযোগ্য ছিল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াতো যে, সিগন্যালিং-সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে দিনে পাঁচ-ছয়বার স্বয়ংক্রিয় মোড থেকে বেরিয়ে এসে ম্যানুয়ালি ট্রেন পরিচালনা করতে হতো। পরবর্তীতে অলিম্পিকের সময় সিগন্যালিং ব্যবস্থায় বৃহৎ বিনিয়োগ করা হয়, যার ফলে সিস্টেমটি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে।
ম্যানুয়ালি ট্রেন পরিচালনার অভিজ্ঞতা মারওয়ার জন্য একদিকে যেমন রোমাঞ্চকর ছিল, তেমনই ছিল চ্যালেঞ্জপূর্ণ। ইচ্ছামতো ম্যানুয়াল মোডে যাওয়া সম্ভব ছিল না; নির্দিষ্ট অনুমতি এবং নির্দেশনা অনুসরণ করে একটি নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে আরেকটি নির্দিষ্ট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন চালাতে হতো।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি ছিল যাত্রীদের ব্যবস্থাপনা। এই ট্রেনগুলিতে চালকের জন্য কোনো পৃথক কেবিন না থাকায় যাত্রীরা সরাসরি চালকের সাথে যোগাযোগ করতে পারতেন। তবে, ম্যানুয়াল ড্রাইভিংয়ের সময় চালককে পুরোপুরি সামনের দিকে মনোনিবেশ করতে হয়। মারওয়া বলেন, "আমরা আগে থেকেই ঘোষণা দিয়ে যাত্রীদের জানিয়ে দিতাম যে ট্রেনটি বর্তমানে ম্যানুয়াল মোডে পরিচালিত হচ্ছে। আমরা তাঁদের অনুরোধ করতাম যেন কথা বলে বা প্রশ্ন করে আমাদের মনোযোগে ব্যাঘাত না ঘটান। একই সাথে জানানো হতো যে, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার তুলনায় ট্রেনের গতি কিছুটা কম থাকবে এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগবে।"
এরপরও অনেক যাত্রী এসে প্রশ্ন করতেন যে ট্রেন এত ধীরে চলছে কেন এবং আরও দ্রুত চালানো সম্ভব নয় কেন। তাঁদের হয়তো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া ছিল। তবে, সেই মুহূর্তে চালকের কাছে যাত্রীদের নিরাপত্তা ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
রেলওয়ের কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে কোনো যাত্রীর ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা। এমন পরিস্থিতিতে ট্রেন সরিয়ে নেওয়া বা রিভার্স করার মতো কঠিন দায়িত্বও পিএসএ-কে পালন করতে হয়। মারওয়া জানান, "আমার কয়েকজন সহকর্মী এমন মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁরা তখন এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তাঁদের সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আমাকে ডেকে ট্রেনটি সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।"
চার বছর ট্রেন পরিচালনার পর মারওয়া একটি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন—অপারেটরদের প্রশিক্ষক হিসেবে। এই কাজটি পূর্বের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এতদিন তিনি নিজে যে দায়িত্ব পালন করেছেন, এখন তাঁকে অন্যদের সেই দায়িত্ব পালনের জন্য সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। মারওয়া মন্তব্য করেন, "এই নতুন পেশায় সফল হতে আমাকে আরও বেশি কর্তৃত্বপূর্ণ হতে হয়েছে, বিশেষ করে আমার বয়স এবং একজন নারী হওয়ায় এই দুটি কারণে।"
পুরুষ-প্রধান কর্মপরিবেশে তাঁকে মাঝে মাঝে সরাসরি প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, কেবল একজন নারীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে—এই কারণে দুজন প্রশিক্ষণার্থী কোর্স ছেড়ে দিয়েছিলেন। অন্য একজন তাঁকে সরাসরি বলেছিলেন, "আমি আমার স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়েছি, কারণ আমি চাই না কোনো নারী আমাকে কী করতে হবে, তা নির্দেশ করুক।" এই ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁকে কষ্ট দিলেও, শেষ পর্যন্ত তা তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। তিনি শিখেছেন কোথায় সীমা নির্ধারণ করতে হয় এবং কীভাবে নিজের অবস্থানে অটল থাকতে হয়।
বর্তমানে মারওয়া ডিএলআর-এর একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক। তিনি দাবি করেন যে তাঁর বিভাগে কর্মরত প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অপারেটর কোনো না কোনো সময়ে তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
মারওয়ার পৈতৃক নিবাস সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। সুযোগ পেলেই তিনি স্বদেশে ভ্রমণ করেন। সর্বশেষ গত অক্টোবরে তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। তবে, দেশের মেট্রোরেলে এখনো আরোহণ করার সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে।
তাঁর বাবা একজন প্রকৌশলী হিসেবে তাঁর পেশাগত জীবনের দীর্ঘ সময় সৌদি আরবে অতিবাহিত করেছেন। মারওয়া খুব অল্প বয়সে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে চলে আসেন। তিনি দক্ষিণ লন্ডনের বিভিন্ন স্কুল এবং সিক্সথ ফর্ম কলেজে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তীতে তিনি নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু করেন, যা তিনি চাকরির পাশাপাশি এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানই এই উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন করছে।
চার বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মারওয়া বিশ্বাস করেন যে তাঁর বর্তমান সাফল্যের পেছনে তাঁর বাবা-মায়ের বিশাল অবদান রয়েছে। মেয়েদের জন্য সুযোগ তৈরিতে তাঁরা কখনো লিঙ্গভেদে পার্থক্য করেননি। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁরা তাঁকে গান, বাদ্যযন্ত্র এবং অন্যান্য সৃজনশীল বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
তিনি প্রত্যাশা করেন যে নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়েরা প্রচলিত গণ্ডির কয়েকটি পেশার বাইরেও নিজেদের ভবিষ্যৎ উন্মোচন করতে শিখুক। ডাক্তার, শিক্ষক কিংবা শুধুমাত্র পারিবারিক পরিধির বাইরেও রেলওয়ে, প্রকৌশল, প্রযুক্তি এবং অসংখ্য অন্যান্য পেশা যে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে—এই বিষয়ে তারা যেন সচেতন হয়।
২০১০ সালের দিকে মারওয়া খায়ের ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। এর পূর্বে তিনি একটি ওষুধের দোকান এবং একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেও কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ব্যাংকিং খাতে যোগদানের পর তিনি সেখানেই স্থিতিশীল ক্যারিয়ার গড়ার প্রত্যাশা করেছিলেন। তবে, ২০০৮-২০০৯ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ব্যাংকিং সেক্টরের চাকরির নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তোলে, ফলস্বরূপ তিনি নতুন পেশার সন্ধানে ব্রতী হন।
এই সময়ে ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়েতে (ডিএলআর) কর্মরত একজন বন্ধু তাঁকে রেলওয়েতে আবেদন করার পরামর্শ দেন। তুলনামূলক উচ্চ বেতন এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মারওয়াকে এই পেশার প্রতি আকৃষ্ট করে।
লন্ডনের মেট্রো রেলব্যবস্থা মূলত আন্ডারগ্রাউন্ড, ওভারগ্রাউন্ড এবং ডিএলআর — এই তিনটি নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে, ডিএলআর ৪৫টি স্টেশনজুড়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে সংযুক্ত করেছে। প্রায় চার দশক আগে চালু হওয়া এই স্বয়ংক্রিয় রেল ব্যবস্থা প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীকে সেবা প্রদান করে। স্বয়ংক্রিয় প্রতিটি ট্রেনে চালকের পরিবর্তে একজন প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্ট (পিএসএ) দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি স্টেশনে ট্রেন থামার পর এবং পরবর্তী যাত্রা শুরুর আগে নিরাপদে দরজা বন্ধ করা ও ট্রেনকে প্রস্তুত করা পিএসএ-এর একটি প্রধান দায়িত্ব। এর পাশাপাশি, যাত্রীদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন এবং গ্রাহক সেবা প্রদানও তাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়মিত ঘোষণা দেওয়া, যাত্রীদের গন্তব্য খুঁজে পেতে সহায়তা করা, এবং ম্যাপ সম্পর্কে বোঝানোও পিএসএ-এর অন্তর্ভুক্ত। লন্ডনে বিভিন্ন দেশের অধিবাসী এবং পর্যটকদের ভিড় থাকায়, বিশেষত ইস্ট লন্ডনে এমন অনেক যাত্রী থাকেন যারা ইংরেজিতে খুব সাবলীল নন অথবা লন্ডনের মানচিত্র বুঝতে অসুবিধাবোধ করেন। তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ নির্দেশ করাও প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্টের দায়িত্ব। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের পরই মারওয়া ডিএলআর পদে আবেদন করেন। তিনি জানান, "এই কাজের জন্য কারিগরি দক্ষতা বাধ্যতামূলক নয়। প্রয়োজনীয় সমস্ত বিষয় চাকরিতে যোগদানের পর নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়।"
প্রায় চার মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের পর আরও দুই সপ্তাহের নিবিড় প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন পর্ব চলে। এই ধাপে লিখিত এবং ব্যবহারিক উভয় প্রকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। সফলভাবে সকল পর্যায় সম্পন্ন করার পর ট্রেন পরিচালনার লাইসেন্স প্রাপ্ত হন। ফলস্বরূপ, ২০১১ সালে মারওয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএলআর-এ ট্রেন অপারেটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
রেলওয়েতে কাজের সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না; প্রাথমিক বাধা আসে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে। তাদের ধারণা ছিল যে এটি পুরুষদের কাজ এবং নারীরা সাধারণত এ ধরনের পেশায় নিযুক্ত হন না। তবে, সময়ের সাথে সাথে পরিবারের মনোভাব পরিবর্তিত হয় এবং বর্তমানে তারাই মারওয়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও সমর্থক।
চাকরিতে যোগদানের পরের বছরেই মারওয়ার কর্মজীবনে একটি স্মরণীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের সময়, ক্যানারি ওয়ার্ফ থেকে প্যারালিম্পিক মশাল বহন করে স্ট্র্যাটফোর্ডে নিয়ে যাওয়া ডিএলআর ট্রেনটির অপারেটর হিসেবে তাঁকে নির্বাচন করা হয়।
অসংখ্য পিএসএ-এর মধ্যে থেকে মারওয়াকে নির্বাচিত করার মূল কারণ ছিল যাত্রীদের উদ্দেশে তাঁর ব্যতিক্রমী এবং সুপরিচিত ঘোষণা প্রদানের শৈলী। প্যারালিম্পিক মশাল বহনের সেই ঐতিহাসিক যাত্রায় Desi Media Point সহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উপস্থিত ছিল। যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলি ধারণের পাশাপাশি, ডিএলআর-এর প্রতিনিধিত্বকারী কণ্ঠ হিসেবে মারওয়ার ঘোষণা সেই আয়োজনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
মারওয়ার সেই কণ্ঠস্বর এখনো ডিএলআর-এর অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ট্রেন অপারেটরদের জন্য নির্মিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ভিডিওতে পরিচালন পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনার বর্ণনা তাঁর কণ্ঠেই রেকর্ড করা হয়েছে।
মারওয়া জানান, "পিএসএ হিসেবে কাজ করার সময় অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল ত্রুটিপূর্ণ সিগন্যালিং সিস্টেম।" ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের পূর্বে ডিএলআর-এর সিগন্যালিং ব্যবস্থা অত্যন্ত অনির্ভরযোগ্য ছিল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াতো যে, সিগন্যালিং-সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে দিনে পাঁচ-ছয়বার স্বয়ংক্রিয় মোড থেকে বেরিয়ে এসে ম্যানুয়ালি ট্রেন পরিচালনা করতে হতো। পরবর্তীতে অলিম্পিকের সময় সিগন্যালিং ব্যবস্থায় বৃহৎ বিনিয়োগ করা হয়, যার ফলে সিস্টেমটি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে।
ম্যানুয়ালি ট্রেন পরিচালনার অভিজ্ঞতা মারওয়ার জন্য একদিকে যেমন রোমাঞ্চকর ছিল, তেমনই ছিল চ্যালেঞ্জপূর্ণ। ইচ্ছামতো ম্যানুয়াল মোডে যাওয়া সম্ভব ছিল না; নির্দিষ্ট অনুমতি এবং নির্দেশনা অনুসরণ করে একটি নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে আরেকটি নির্দিষ্ট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন চালাতে হতো।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি ছিল যাত্রীদের ব্যবস্থাপনা। এই ট্রেনগুলিতে চালকের জন্য কোনো পৃথক কেবিন না থাকায় যাত্রীরা সরাসরি চালকের সাথে যোগাযোগ করতে পারতেন। তবে, ম্যানুয়াল ড্রাইভিংয়ের সময় চালককে পুরোপুরি সামনের দিকে মনোনিবেশ করতে হয়। মারওয়া বলেন, "আমরা আগে থেকেই ঘোষণা দিয়ে যাত্রীদের জানিয়ে দিতাম যে ট্রেনটি বর্তমানে ম্যানুয়াল মোডে পরিচালিত হচ্ছে। আমরা তাঁদের অনুরোধ করতাম যেন কথা বলে বা প্রশ্ন করে আমাদের মনোযোগে ব্যাঘাত না ঘটান। একই সাথে জানানো হতো যে, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার তুলনায় ট্রেনের গতি কিছুটা কম থাকবে এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগবে।"
এরপরও অনেক যাত্রী এসে প্রশ্ন করতেন যে ট্রেন এত ধীরে চলছে কেন এবং আরও দ্রুত চালানো সম্ভব নয় কেন। তাঁদের হয়তো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া ছিল। তবে, সেই মুহূর্তে চালকের কাছে যাত্রীদের নিরাপত্তা ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
রেলওয়ের কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে কোনো যাত্রীর ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা। এমন পরিস্থিতিতে ট্রেন সরিয়ে নেওয়া বা রিভার্স করার মতো কঠিন দায়িত্বও পিএসএ-কে পালন করতে হয়। মারওয়া জানান, "আমার কয়েকজন সহকর্মী এমন মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁরা তখন এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তাঁদের সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আমাকে ডেকে ট্রেনটি সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।"
চার বছর ট্রেন পরিচালনার পর মারওয়া একটি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন—অপারেটরদের প্রশিক্ষক হিসেবে। এই কাজটি পূর্বের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এতদিন তিনি নিজে যে দায়িত্ব পালন করেছেন, এখন তাঁকে অন্যদের সেই দায়িত্ব পালনের জন্য সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। মারওয়া মন্তব্য করেন, "এই নতুন পেশায় সফল হতে আমাকে আরও বেশি কর্তৃত্বপূর্ণ হতে হয়েছে, বিশেষ করে আমার বয়স এবং একজন নারী হওয়ায় এই দুটি কারণে।"
পুরুষ-প্রধান কর্মপরিবেশে তাঁকে মাঝে মাঝে সরাসরি প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, কেবল একজন নারীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে—এই কারণে দুজন প্রশিক্ষণার্থী কোর্স ছেড়ে দিয়েছিলেন। অন্য একজন তাঁকে সরাসরি বলেছিলেন, "আমি আমার স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়েছি, কারণ আমি চাই না কোনো নারী আমাকে কী করতে হবে, তা নির্দেশ করুক।" এই ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁকে কষ্ট দিলেও, শেষ পর্যন্ত তা তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। তিনি শিখেছেন কোথায় সীমা নির্ধারণ করতে হয় এবং কীভাবে নিজের অবস্থানে অটল থাকতে হয়।
বর্তমানে মারওয়া ডিএলআর-এর একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক। তিনি দাবি করেন যে তাঁর বিভাগে কর্মরত প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অপারেটর কোনো না কোনো সময়ে তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
মারওয়ার পৈতৃক নিবাস সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। সুযোগ পেলেই তিনি স্বদেশে ভ্রমণ করেন। সর্বশেষ গত অক্টোবরে তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। তবে, দেশের মেট্রোরেলে এখনো আরোহণ করার সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে।
তাঁর বাবা একজন প্রকৌশলী হিসেবে তাঁর পেশাগত জীবনের দীর্ঘ সময় সৌদি আরবে অতিবাহিত করেছেন। মারওয়া খুব অল্প বয়সে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে চলে আসেন। তিনি দক্ষিণ লন্ডনের বিভিন্ন স্কুল এবং সিক্সথ ফর্ম কলেজে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তীতে তিনি নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু করেন, যা তিনি চাকরির পাশাপাশি এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানই এই উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন করছে।
চার বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মারওয়া বিশ্বাস করেন যে তাঁর বর্তমান সাফল্যের পেছনে তাঁর বাবা-মায়ের বিশাল অবদান রয়েছে। মেয়েদের জন্য সুযোগ তৈরিতে তাঁরা কখনো লিঙ্গভেদে পার্থক্য করেননি। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁরা তাঁকে গান, বাদ্যযন্ত্র এবং অন্যান্য সৃজনশীল বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
তিনি প্রত্যাশা করেন যে নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়েরা প্রচলিত গণ্ডির কয়েকটি পেশার বাইরেও নিজেদের ভবিষ্যৎ উন্মোচন করতে শিখুক। ডাক্তার, শিক্ষক কিংবা শুধুমাত্র পারিবারিক পরিধির বাইরেও রেলওয়ে, প্রকৌশল, প্রযুক্তি এবং অসংখ্য অন্যান্য পেশা যে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে—এই বিষয়ে তারা যেন সচেতন হয়।