Thu 6th Aug 2026, 9:13 pm

জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ক্ষমা ও ফিফা সভাপতির পদে বহাল থাকা: বিতর্ক সত্ত্বেও সমর্থন বহাল

জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ক্ষমা ও ফিফা সভাপতির পদে বহাল থাকা: বিতর্ক সত্ত্বেও সমর্থন বহাল
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বকাপসহ অন্যান্য বড় টুর্নামেন্টের অংশীদারত্ব বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনার জন্য 'ভুল' স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। মরক্কোয় অনুষ্ঠিত এক সভায় ফিফার শীর্ষ নির্বাহীদের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ায় তিনি সংস্থাটির সভাপতি হিসেবে বহাল থাকছেন।

পরিকল্পনাটি বাতিল হওয়ার পরও ইনফান্তিনো তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, যার ফলস্বরূপ তিনি ফিফার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জরুরি সভা আহ্বান করেন। মরক্কোর রাবাতে ফিফার আফ্রিকান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সেই সভা শেষ হওয়ার চার ঘণ্টা পর ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। ফিফার মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম এবং উপস্থিত পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, “ফিফার ২১১টি সদস্যদেশের ভোটে নির্বাচিত একমাত্র কর্মকর্তা হিসেবে সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হচ্ছে।” বিতর্কিত প্রস্তাবটি যেভাবে পরিচালিত হয়েছিল, তা নিয়ে ফিফার অভ্যন্তর থেকেই ইনফান্তিনোর ওপর চাপ বাড়ছিল। গত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবটি তুলে নেওয়ার পর তাঁর পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো হয়।

রাবাতের সভায় উপস্থিত ছিলেন ফিফার মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম, যিনি এর আগে কর্মীদের কাছে পাঠানো একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকে পুরো বিষয়টিকে 'একটি দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনাক্রম' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তবে বৈঠকের পর দেওয়া বিবৃতিতে গ্রাফস্ট্রোম এবং পরিচালনা পর্ষদ ফিফা সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। Desi Media Point-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রোম যৌথভাবে ফিফার সহ-সভাপতি, কাউন্সিল এবং ২১১টি সদস্যদেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কাছে একটি স্বাক্ষর করা চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠিতে তাঁরা নিজেদের ভুলের জন্য 'আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা' করেন এবং 'ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটার' অঙ্গীকার করেন।

সভা শেষে রাবাতে মেয়েরা আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের একটি ম্যাচ একসঙ্গে দেখেন ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রোম। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফৌজি লেকজা, যিনি শুরু থেকেই ইনফান্তিনোর হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে একজন হিসেবে তাঁর পাশে ছিলেন। লেকজা পরিকল্পনাটি বাতিলের সিদ্ধান্তকে 'বিজ্ঞোচিত' বলে প্রশংসা করেন এবং গত ১০ বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে ইনফান্তিনোর অবদানের প্রতি তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইনফান্তিনোর ওপর তাঁর আস্থার অভাব প্রকাশ করেছেন। পর্তুগাল কিংবদন্তি লুইস ফিগো ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে বলেন, “ইনফান্তিনো যে পদটির মান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটিকেই তিনি অবনমিত করেছেন। তাঁর সম্মান বাঁচানোর সময় পার হয়ে গেছে, তবে ফুটবলকে বাঁচানোর সময় এখনো আছে।”

ইনফান্তিনো ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) নামে একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই প্রস্তাবে সায় দিলে প্রতিটি সদস্য-অ্যাসোসিয়েশনকে ৪ কোটি ডলার দেওয়ার লোভনীয় প্রস্তাবও ছিল। তবে এই পরিকল্পনা প্রকাশের পর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা ও কনকাকাফ কড়া বিবৃতি প্রকাশ করে এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) তাদের প্রতি সমর্থন জানায়। এমনকি, উয়েফার অধিভুক্ত ৫৫টি দেশ বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়।

ফিফা জানিয়েছে, বুধবারের বৈঠকে এফএফই সম্পর্কিত 'ভুলত্রুটি' স্বীকার করা হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্যমতে, ফিফা কাউন্সিল ও সদস্যদেশগুলোকে এই 'প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা'র ইচ্ছা তাঁদের ছিল না এবং 'বিষয়টি ভিন্নভাবে সামলানো উচিত ছিল'। সংস্থাটি আরও বলেছে, “সংবাদমাধ্যমে প্রস্তাবটি ফাঁস হওয়ার পর যে ভুলগুলো হয়েছিল, সেসব মেনে নেওয়া হয়েছে।” উল্লেখ্য, গত ২৮ জুলাই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস প্রথম ইনফান্তিনোর এই গোপন পরিকল্পনার খবর প্রকাশ করে। বিবৃতিতে ফিফা এও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, সংস্থাটির 'ভাবমূর্তি, সুশাসন ও নিয়মকানুন নিয়ে কোনো আক্রমণ আর বরদাশত করা হবে না এবং নিজেদের সুনাম রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' এর আগে, দ্য টাইমসে প্রকাশিত মরক্কোকে ২০৩০ বিশ্বকাপ ফাইনালের আয়োজক বানানোর প্রতিশ্রুতির খবরকে ফিফা 'ভিত্তিহীন', 'মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর' আখ্যা দেয়। সংস্থাটি জানায়, স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত এ টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, সে সিদ্ধান্ত 'যথাসময়ে' নেওয়া হবে।

ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো নিশ্চয়ই আশা করছেন, এই ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর ১০ বছরের মেয়াদের সবচেয়ে বড় বিতর্কের অবসান ঘটবে। তবে ফিফার বড় কর্মকর্তাদের সমর্থন সত্ত্বেও তিনি তীব্র সমালোচনা এড়াতে পারছেন না। এত কিছুর পরও ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো ২০২৭ সালের মার্চে ফিফা কংগ্রেসে অনুষ্ঠিতব্য সভাপতি নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রস্তুত বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে লড়তে ইচ্ছুক প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত নাম জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই নির্বাচনে জয়ী হতে ফিফার ২১১টি সদস্যদেশের মধ্যে ১০৬টি ভোটের প্রয়োজন হয়। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার চিন্তাভাবনা অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংস্থাটি এর আগে জানিয়েছে, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর তাদের আস্থা নেই এবং ফিফার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়েছে। ওয়েলসসহ একাধিক সদস্যদেশ ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের পুনর্নির্বাচনে দেওয়া সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ফিফা অবশ্য দাবি করেছে, “ভুলত্রুটি হলেও যা করা হয়েছে, তা ফিফার বিদ্যমান নিয়মনীতির আলোকেই করা হয়েছে।” সংস্থাটির আশা, এই বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো “ফিফার সুশাসনকে শক্তিশালী করবে এবং সংস্থার প্রতি আবার আস্থা ফিরিয়ে আনবে।” তবে এমন আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উয়েফার অসন্তোষ কতটা কমবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।