Sat 19th Sep 2026, 1:59 pm

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মার্কিন রণতরিতে ম্যারাডোনা: ৩৭ বছর পর প্রকাশিত এক অসাধারণ ছবি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মার্কিন রণতরিতে ম্যারাডোনা: ৩৭ বছর পর প্রকাশিত এক অসাধারণ ছবি
ফুটবল কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা যেখানেই পদার্পণ করতেন, ফুটবল যেন তার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হয়ে থাকত। মাঠে বল পায়ে তার অসামান্য নৈপুণ্য যেমন কোটি হৃদয় জয় করেছে, তেমনই ব্যক্তিগত জীবনেও বলের সঙ্গে তার নিবিড় সখ্য অসংখ্যবার ক্যামেরাবন্দী হয়েছে। সম্প্রতি তেমনই এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত জনসমক্ষে এনেছেন তার দীর্ঘকালীন ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক ফার্নান্দো সিনিওরিনি।

সিনিওরিনি তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বরের বেশ কিছু ছবি উন্মোচন করেছেন। এই ছবিগুলিতে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার মার্কিন রণতরি ইউএসএস আইওয়ার উন্মুক্ত ডেকে বিশালকায় কামানের দুটি নলের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে ম্যারাডোনা ফুটবল নিয়ে অসাধারণ ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন করছেন। আর্জেন্টিনার শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ক্লারিন নিশ্চিত করেছে যে, এই চিত্রগুলি এতদিন অপ্রকাশিত ছিল।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সিনিওরিনি ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। এই সুদীর্ঘ সময়কালে তিনি ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত ও পেশাদার জীবনের অসংখ্য ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রত্যক্ষদর্শী। তার ইনস্টাগ্রাম পোস্টের ক্যাপশনে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘ম্যারাডোনার সঙ্গে ফুটবল সবসময়ই থাকত। ১৫ নভেম্বর, ১৯৮৯।’

১৯৮৯ সালে ম্যারাডোনা ইতালির নেপলসে নাপোলির হয়ে এক সোনালি অধ্যায় অতিক্রম করছিলেন। সেই সময়েই ন্যাটোর নেপলস সদর দপ্তর থেকে তাকে ইউএসএস আইওয়া পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই সফরে ম্যারাডোনার সঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন সিনিওরিনি।

সিনিওরিনির বর্ণনামতে, রণতরিতে ম্যারাডোনাকে রাষ্ট্রপ্রধানের ন্যায় উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। তার নিজস্ব অভিব্যক্তি, ‘সেখানে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই সম্মানিত হয়েছিলেন। আমাদের অভিজ্ঞতা ছিল এক কথায় অসাধারণ।’

এই সফরের একপর্যায়ে আকস্মিকভাবেই ফুটবলের আগমন ঘটে। কোথা থেকে যেন একটি ফুটবল ম্যারাডোনার হাতে তুলে দেওয়া হয়। বলটি হাতে পাওয়া মাত্রই তিনি তার সহজাত দক্ষতায় জাগলিং শুরু করেন।

সিনিওরিনি আরও বলেন, ‘হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটি বল ভেসে এল। বলটি হাতে পেতেই ম্যারাডোনা তার শৈশবের মতো জাগলিং শুরু করে দেন – যা তিনি আর্জেন্টিনা জুনিয়র্সের খেলা চলাকালীন মধ্যবিরতিতে নিয়মিত করতেন। কোনো রকম চিন্তাভাবনার অবকাশই ছিল না!’

ম্যারাডোনার খেলোয়াড়ি জীবনের প্রারম্ভেও এমন দৃশ্য ছিল খুবই সাধারণ। আর্জেন্টিনা জুনিয়র্সের হয়ে খেলার সময় ম্যাচের বিরতিতে বল নিয়ে বিভিন্ন কৌশল প্রদর্শন করে তিনি দর্শকদের বিনোদন দিতেন। রণতরির ডেকেও যেন তার সেই চিরাচরিত অভ্যাস পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল।

ইউএসএস আইওয়া তখন তার সেবামুক্তির প্রাক্কালে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রণতরি হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৩৯ সালে যার নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, সেই আইওয়া শ্রেণির প্রথম বা ‘লিড শিপ’ ছিল এটি। ১৯৮৯ সালে নেপলসে তার অবস্থানকালে ম্যারাডোনার এই ঐতিহাসিক সফর রণতরিটির জীবনে এক নতুন স্মরণীয় অধ্যায় যোগ করে।

সেই সফরের সময় ম্যারাডোনা নিঃসন্দেহে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তারকা হিসেবে বিবেচিত হতেন। ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার পাশাপাশি তিনি নাপোলিকে ইতালীয় লিগ এবং উয়েফা কাপের শিরোপা এনে দিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, নেপলসে তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী।

রণতরির ডেকে ম্যারাডোনার ফুটবল প্রদর্শনের সেই মুহূর্তে তার পাশে ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাংবাদিক অ্যাঞ্জেলো রসি। তিনি তখন নেপলস ও দক্ষিণ ইতালির অন্যতম প্রধান দৈনিক ইল মাতিনোর হয়ে কাজ করতেন। পরবর্তীতে তিনি ম্যারাডোনার ইউএসএস আইওয়া সফর নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছিলেন।

সিনিওরিনির সঙ্গে ম্যারাডোনার সম্পর্ক কেবল একজন প্রশিক্ষক ও একজন খেলোয়াড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘদিনের সান্নিধ্যের কারণে তিনি কিংবদন্তির ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন জটিল দিক সম্পর্কে অবগত ছিলেন। একবার ম্যারাডোনাকে নিয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি ডিয়েগোর জন্য পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত, কিন্তু ম্যারাডোনার জন্য আমি এক রাস্তার মোড়ও অতিক্রম করব না।’

সিনিওরিনির এই উক্তি ম্যারাডোনার দ্বৈত সত্তাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে – একদিকে সরল, বন্ধুসুলভ ও শিশুসুলভ ডিয়েগো; অন্যদিকে খ্যাতি, গণমাধ্যম এবং ভক্তদের প্রবল উন্মাদনার প্রভাবে সৃষ্ট ‘ম্যারাডোনা’ রূপটি। এই দুটি সত্তার মাঝে একটি বিষয় অবশ্য চিরন্তন ছিল – ফুটবলের প্রতি তার অদম্য আকর্ষণ।

ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণতরি পরিদর্শন পর্যন্ত, ম্যারাডোনার জীবনের প্রতিটি স্মরণীয় মুহূর্তে ফুটবল যেন এক অনিবার্য অংশীদার হয়ে উঠত। ৩৭ বছর পর জনসমক্ষে আসা ইউএসএস আইওয়ার এই ছবিগুলি সেই অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কেরই এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি।