Tue 4th Aug 2026, 3:05 am

জিদান, এমবাপ্পেসহ দলবদলে যে ৫ তারকাকে হারিয়ে ক্লাবগুলো গভীর আক্ষেপে পুড়েছে

জিদান, এমবাপ্পেসহ দলবদলে যে ৫ তারকাকে হারিয়ে ক্লাবগুলো গভীর আক্ষেপে পুড়েছে
বিশ্ব ফুটবলের উন্মাদনা স্তিমিত হলেও, ক্লাব ফুটবলের নতুন মৌসুম এখনো প্রারম্ভিক লগ্নে। এই অন্তর্বর্তীকালে ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে দলবদলের বাজার। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো নিজেদের স্কোয়াড সুসংগঠিত করতে ব্যস্ত, যেখানে সাশ্রয়ী মূল্যে সেরা প্রতিভা অন্বেষণ একটি সাধারণ প্রবণতা। তবে এমন বহু দৃষ্টান্ত আছে যেখানে ক্লাবগুলো হাতে পাওয়া বিরল প্রতিভাদের অবহেলায় হাতছাড়া করেছে, যার ফলস্বরূপ পরবর্তীতে তাদের পোহাতে হয়েছে গভীর অনুশোচনা।

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাস। পেট্রোডলারে সমৃদ্ধ ম্যানচেস্টার সিটি এসি মিলানের তারকা মিডফিল্ডার কাকার জন্য ১০৮ মিলিয়ন পাউন্ডের এক বিস্ময়কর প্রস্তাব দিয়েছিল, যা তৎকালীন বিশ্ব রেকর্ড অঙ্কের দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। একজন সিটি সমর্থক তো কাকার আগমনে এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে নিজের বুকে তার নাম খোদাই করিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু ২০০৭ সালের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী কাকা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানান, সময়টা তার জন্য অনুকূল নয়। যদিও মাত্র ছয় মাস পর তিনি ৫৬ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশ্ব রেকর্ড ট্রান্সফার মূল্যেই রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। স্প্যানিশ কাপ ও লা লিগা জয়ের পর তিনি পুনরায় মিলানে ফেরেন। এরপর এমএলএসের অরল্যান্ডো সিটিতে তিন বছর কাটিয়ে নিজ জন্মভূমি সাও পাওলোতে তার ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।

২০০৪ সালে ইংলিশ ক্লাব বোল্টন ওয়ান্ডারার্স ইউরোপিয়ান ফুটবলে নিজেদের পদার্পণের স্বপ্ন দেখছিল। দলের ম্যানেজার স্যাম অ্যালারডাইস এক যুগান্তকারী চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিলেন ৩২ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান বিশ্বকাপজয়ী রিভালদো, যিনি তখন এসি মিলানে ব্রাত্য হয়ে পড়েছিলেন। রিভালদো নিজেও বোল্টনকে প্রথমবারের মতো ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি মত পরিবর্তন করে গ্রিসের অলিম্পিয়াকোসে যোগ দেন। অথচ সেই মৌসুমেই বোল্টন লিভারপুলের সমপরিমাণ পয়েন্ট নিয়ে লিগের ষষ্ঠ স্থান অর্জন করে উয়েফা কাপে স্থান নিশ্চিত করেছিল এবং টুর্নামেন্টের শেষ বত্রিশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

১৯৯৫ সালের প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স বোর্দোর তরুণ মিডফিল্ডার জিনেদিন জিদানকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ক্লাবের কোচিং স্টাফেরা মালিক জ্যাক ওয়াকারকে জিদান ও ক্রিস্তফ দুগারিকে চুক্তিবদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করেন। ওয়াকারের ঐতিহাসিক উক্তিটি ছিল, ‘টিম শেরউড যখন আছে, তখন জিদানের প্রয়োজন কী?’ জিদান ও দুগারি তখন ইংল্যান্ডে এসে ক্লাবের সাথে প্রাথমিক আলোচনাও সেরেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চুক্তি হয়নি। মাত্র তিন বছর পর জিদান ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জেতেন এবং তার দু’বছর পর ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। ব্ল্যাকবার্ন যে কী অমূল্য রত্ন হাতছাড়া করেছিল, তা অনুধাবন করতে নিশ্চয়ই তাদের বেগ পেতে হয়নি!

২০০৫ সালে, এসি মিলানের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় প্রত্যাবর্তনে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের কিছুকাল পরেই লিভারপুলের সমর্থকদের হতাশ করে স্টিভেন জেরার্ড ক্লাব ছাড়ার ঘোষণা দেন। হোসে মরিনিওর চেলসি ৩২ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে তাকে দলে ভেড়াতে আগ্রহী ছিল। তবে ‘পারিবারিক কারণ’ দেখিয়ে জেরার্ড শেষ পর্যন্ত লিভারপুলেই থেকে যান এবং ক্লাবের হয়ে ৭০০টিরও বেশি ম্যাচ খেলেন। তিনি লিভারপুলকে ২০০৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালেও নিয়ে যান, যদিও সেবার মিলান প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়েছিল। এক দশক পর মরিনিও নিজেই স্বীকার করেন, জেরার্ডকে দলে না পাওয়া তার কোচিং ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অনুশোচনা।

২০১৭ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পে তখনও মোনাকোতে খেলছিলেন এবং লিভারপুল তাকে দলে টানতে আগ্রহী ছিল। এমবাপ্পে নিজেই জানিয়েছেন যে তার মায়ের প্রিয় ক্লাব লিভারপুল হওয়ায় তিনি নিজেও সেখানে যোগ দিতে আগ্রহী ছিলেন। ইয়ুর্গেন ক্লপ পরবর্তীতে উল্লেখ করেছেন যে এমবাপ্পে এবং তার পরিবারের জন্য ব্যক্তিগত জেট ও খাবারের সুব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পে পিএসজিতে পাড়ি জমান। পরবর্তী ঘটনাবলী তো এখন ইতিহাস!

২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ফুলহাম প্রিমিয়ার লিগে নিজেদের টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছিল। তারা রিয়াল সোসিয়েদাদের কাছে আঁতোয়ান গ্রিজমানের জন্য ১২ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রস্তাব দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত গ্রিজমানকে ওই দামে না কিনে তারা অলিম্পিয়াকোসের কস্তাস মিত্রোগলুকে দলে ভেড়ায়। মিত্রোগলু মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলেন এবং কোনো গোল ছাড়াই দলের অবনমন দেখেন। আর গ্রিজমান? তিনি স্পেনে থেকেই একের পর এক শিরোপা জেতেন এবং তারকা খ্যাতি অর্জন করেন।

এই ঘটনাগুলো একটি চিরন্তন সত্যের প্রতিচ্ছবি – ফুটবল কখনো নিশ্চিতের খেলা নয়। একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্ত ইতিহাসের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। কারও জন্য সেই অসমাপ্ত অধ্যায় হয়ে ওঠে গভীর অনুশোচনার স্মারক, আবার কারও জন্য তা খুলে দেয় সাফল্যের এক নতুন দ্বার।