Tue 21st Jul 2026, 9:48 am

মেসির মহাকাব্যিক যাত্রার সমাপ্তি? ইব্রা ও অঁরির গভীর বিশ্লেষণ

মেসির মহাকাব্যিক যাত্রার সমাপ্তি? ইব্রা ও অঁরির গভীর বিশ্লেষণ
ফুটবল যদি নিছকই এক রূপকথা হতো, তবে দৃশ্যপট এমন করুণ হতো না। রূপকথার অন্তিম পৃষ্ঠায় তো চিরকালই আনন্দের রঙে আঁকা থাকে। কিন্তু নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই বিকেলটা লিওনেল মেসির জন্য কোনো রূপকথা নিয়ে আসেনি, এনেছিল এক গভীর হাহাকার। ট্রফি মঞ্চের ঝলমলে আলোয় যখন তিনি রানার্সআপ পদকটি গলায় পরছিলেন, ক্যামেরা তখন তার মুখের উপর জুম করে। সেই পরিচিত চোখ, যা দিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে বল বাড়াতেন, মুহূর্তের মধ্যেই তা নোনা জলের ধারায় সিক্ত হয়ে উঠলো।

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল। স্পেনের অপ্রতিরোধ্য 'লাল ঝড়'-এর সামনে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা স্বপ্নগুলো তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়লো। স্পেন ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে বিধ্বস্ত করে ম্যাচটি জিতে নেয়। কিন্তু মেসির চোখে যে জল, তা কি নিছকই একটি হারানো শিরোপার বেদনায়? নাকি এক মহাকাব্যের বেদনাদায়ক পরিসমাপ্তির ইঙ্গিত?

মাঠের এক প্রান্তে যখন স্প্যানিশ তরুণদের বাঁধভাঙা উল্লাস, ফক্স স্পোর্টসের স্টুডিওতে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ ও থিয়েরি অঁরি তখন মেসির সম্ভাব্য শেষ অধ্যায় নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন। ইব্রাহিমোভিচ মন্তব্য করেন, ‘এই বিশ্বকাপে আমরা তাকে মন ভরে উপভোগ করেছি। আমি জানি বিশ্বকাপ জিততে না পারার দুঃখটা তার জন্য কতটা গভীর। তবে সে একটি অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ উপহার দিয়েছে। একক প্রচেষ্টায় সে এই দলটিকে টেনে নিয়ে গেছে। তার পারফরম্যান্স ছিল স্রেফ জাদুকরি।’

এটি ছিল মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দিক থেকে সম্ভবত এটিই তার ক্যারিয়ারের সেরা বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট! তবে পরিসংখ্যান স্রেফ সংখ্যা, মাঠে তার অবদান ছিল মুগ্ধ করার মতো। প্রথম পাঁচ ম্যাচেই তিনি জালের দেখা পান। কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে গোল না পেলেও তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গোল তৈরি করে দেন। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে তার দুটি বাড়ানো পাস ফুটবল ইতিহাসের অমূল্য সংগ্রহে স্থান পাওয়ার যোগ্য।

ইব্রাহিমোভিচ মেসির এই দ্বৈত সত্ত্বাটিকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘এই টুর্নামেন্টে তাকে কখনো এই গ্রহের কেউ মনে হয়েছে, আবার কখনো সে আমাদের মতোই রক্তমাংসের এক মানুষে পরিণত হয়েছে!’

এই ৮ গোল মিলিয়ে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোল সংখ্যা এখন ২১। গ্রুপ পর্ব শেষেই তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নিয়েছিলেন। টুর্নামেন্টের সিংহভাগ সময় রেকর্ডটি তার নামের পাশেই ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাদ সাধেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। গত শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে এই ফরাসি তারকা মেসির কাছ থেকে রেকর্ডটি ছিনিয়ে নেন।

ফাইনালে মেসি রেকর্ডটি পুনরুদ্ধার করতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে, স্পেনীয় দলের কাছে আর্জেন্টিনা পাত্তাই পায়নি। পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা মাত্র দুটি শট নিতে সক্ষম হয়, যার একটিও লক্ষ্যে ছিল না। মেসি নিজেও একটি শট নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তার বাড়ানো পাঁচটি ক্রসের মধ্যে মাত্র একটি সঠিক স্থানে পৌঁছাতে পেরেছিল। স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলগত বেড়াজালে বন্দী হয়ে মেসিকে মাঠে ভীষণ একাকী মনে হচ্ছিল।

কিন্তু থিয়েরি অঁরি মেসির এই ব্যর্থতাকে তার ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখতে নারাজ। আর্সেনাল ও বার্সেলোনার এই কিংবদন্তি সম্পূর্ণ কৃতিত্ব দেন স্পেনের কৌশলকে, ‘মেসির বিপক্ষে আপনি বাজি ধরতে পারেন না। আর্জেন্টিনাকে হারাতে হলে স্পেনের মতো একটি দল এবং এমন সুপরিকল্পিত কৌশলই প্রয়োজন ছিল।’

ফাইনালে মেসির পা থেকে চিরচেনা জাদু হয়তো ঠিকভাবে বেরিয়ে আসেনি, কিন্তু তাতে কি তার শ্রেষ্ঠত্ব বিন্দুমাত্র কমে যায়? ডেনমার্কের সাবেক গোলকিপার ক্যাসপার স্মাইকেল স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, বিশ্বকাপের ট্রফি দিয়ে মেসির মতো একজন ফুটবলারকে বিচার করা বোকামি। স্মাইকেলের ভাষায়, ‘হ্যাঁ, সে বিশ্বকাপে জেতার চেয়ে ফাইনালে হেরেছে বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। যেকোনো শিশু যখন তার দিকে তাকাবে, সে বুঝতে পারবে ফুটবল মানে শুধু জেতা নয়। ফুটবল মানে আপনি খেলাটিকে কী উপহার দিলেন। আর মেসি এই খেলাটিকে যা দিয়েছে, তার কোনো তুলনা হয় না।’

একই সুরে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক তারকা অ্যালেক্সি লালাস এবং ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার পিটার ক্রাউচও। লালাস বলেন, ‘সে একজন চ্যাম্পিয়ন। আর চ্যাম্পিয়নরা সব সময় সবকিছু জিততে চায়। সে তো তার ক্যারিয়ারে সবকিছুই জিতেছে, তাই আজকের হারে সে হতাশ হবেই। কিন্তু আমার মনে হয়, আজকের ম্যাচের স্কোরলাইন ভুলে গিয়ে আমাদের এখনই আলোচনা করা উচিত সে কতটা আইকনিক, কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কতটা অবিশ্বাস্য এক ফুটবলার।’ পিটার ক্রাউচ স্পেনের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দলটির উদাহরণ টেনে আরেকটি গভীর সত্য উন্মোচন করেন, ‘আজ স্পেনের যে তরুণরা চ্যাম্পিয়ন হলো, তাদের প্রায় সবাই ছোটবেলায় মেসিকে দেখে বড় হয়েছে, তার খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে। এই মানুষটি একজন জিনিয়াস। আর এটাই যদি তার শেষ বিদায় হয়, তবে আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারকে বিদায় জানালাম।’

ফাইন্যালের পর পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে মেসির কান্নার ছবি এখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। যখন রুপালি পদকটি তার গলায় ঝুলছিল, মেসির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। থিয়েরি অঁরি এই দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘দেখো, এই হারটা তার কাছে কতটা যন্ত্রণাদায়ক! তোমাদের মনে যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে যে এই বয়সেও তার মধ্যে জেতার ক্ষুধা আছে কি না, তবে তার মুখের দিকে তাকাও। দেখো এই কান্না কী অর্থ বহন করে। সে তো জীবনে সব জিতেছে। তবুও এই কান্না কেন? কারণ, দেশের প্রতি তার ভালোবাসা, তার আবেগ এবং মাঠে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা।’

এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: রানার্সআপ পদক গলায় নিয়ে এই অশ্রুই কি আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল জার্সিতে মেসির শেষ দৃশ্য? ইব্রাহিমোভিচ চান না মেসির এই মহাকাব্যিক পথচলা এখানেই শেষ হয়ে যাক। জ্লাতান একবুক আশা নিয়ে তার কথা শেষ করলেন, ‘আমি আশা করি সে যতদিন সম্ভব খেলা চালিয়ে যাবে, যাতে আমরা তাকে আরও বেশি উপভোগ করতে পারি। সে কি পরের বিশ্বকাপে থাকবে? আমি জানি না, ফুটবলে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। তবে সে খেলছে, এটাই আমাদের জন্য আনন্দের। যেদিন সে খেলা ছেড়ে দেবে, সেদিন আমাদের সবার মন খারাপ হবে।’