Tue 27th Oct 2026, 2:39 pm
|

নদীপথে অপরাধ দমন: নৌ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য

নদীপথে অপরাধ দমন: নৌ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য
নদীপথে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজির মতো অপরাধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অপরাধীরা হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের আলামত লুকাতে নদীপথকে বেছে নিচ্ছে।

সংঘবদ্ধ নৌ ডাকাত ও জলদস্যুরা এতটাই বেপরোয়া যে তারা পুলিশের ওপর হামলা চালাতেও দ্বিধা করছে না। এমন পরিস্থিতিতে নদীপথে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।

নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫ বছর ৯ মাসে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে মোট ২ হাজার ৪৯৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে।

এই সময়ে ১ হাজার ৭৩৯ জনের মরদেহ শনাক্ত হলেও ৭৫৫ জনের পরিচয় মেলেনি। অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বাস্তব অপরাধের সংখ্যা এই হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি, কারণ অপরাধীরা গ্রেপ্তার এড়াতে ও প্রমাণ মুছে ফেলতে লাশ নদীতে ফেলে দেয়।

অনেক ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ মুছে যাওয়ায় এবং চেহারা বিকৃত হওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যত দিন যাচ্ছে, নদীপথে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ততই বাড়ছে, যা নদীপথের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে থাকার ইঙ্গিত দেয়।

শুধু মরদেহ উদ্ধার নয়; হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ছিনতাই, মাদক পাচার ও অবৈধ বালু উত্তোলনের মতো অপরাধও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাছ ধরতে গিয়ে জলদস্যুদের গুলিতে জেলে নিহত হচ্ছেন, চাঁদা না দেওয়ায় নৌশ্রমিকদের ওপর হামলা হচ্ছে এবং পণ্যবাহী নৌযান থেকে মালামাল লুট করা হচ্ছে।

এমনকি অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে নৌ পুলিশের সদস্যরাও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তার প্রতিফলন দেখা যায় নৌ পুলিশের মামলার পরিসংখ্যানে।

নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নদীপথকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধে ২ হাজার ৮৫টি মামলা হয়েছিল, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৯৯টিতে। অর্থাৎ এক বছরেই মামলার সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার ৩১৪টি।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নথিভুক্ত মামলাই অপরাধের পুরো চিত্র নয়; বাস্তবে অপরাধের ঘটনা আরও বেশি। বর্ষা মৌসুমে দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার।

বিশাল এই নৌপথে নৌ পুলিশের মাত্র ১২৪টি ফাঁড়ি দিয়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। অপরাধীরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর দুর্গম চরাঞ্চল এবং জেলার সীমানাসংলগ্ন নদীপথগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

এই পরিস্থিতিতে নদীপথে অপরাধ কমাতে ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। শুধু সনাতন পদ্ধতিতে টহল দিয়ে নদীপথে অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রোধ করা যাবে না।

তাই অপরাধপ্রবণ নদীপথ, চরাঞ্চল এবং মরদেহ ফেলার সম্ভাব্য স্থানগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি নৌ পুলিশের জনবল, আধুনিক নৌযান, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে নৌ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, জেলা ও মহানগর পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি।

নিয়মিত যৌথ অভিযান চালিয়ে অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে, যাতে দেশের নদীপথগুলো কোনোভাবেই অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হতে না পারে।