Fri 17th Jul 2026, 5:06 am

মাঠে নামার আগে লিওনেল মেসির কঠোর প্রস্তুতি ও নিয়মানুবর্তিতা

মাঠে নামার আগে লিওনেল মেসির কঠোর প্রস্তুতি ও নিয়মানুবর্তিতা
লিওনেল মেসি মাঠে নামলেই যেন এক অলৌকিক জাদু দৃশ্যমান হয়। তার পায়ের জাদুতে দেখা যায় চোখধাঁধানো ড্রিবলিং, সুনির্দিষ্ট পাস এবং এক নিমিষেই ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেওয়া গোল। অনেকে এসবকে জন্মগত প্রতিভা বলে মনে করলেও, এর পেছনের বাস্তবতা বেশ ভিন্ন।

৩৯ বছর বয়সেও মেসির যে অসাধারণ গতি, অনবদ্য ভারসাম্য এবং অপ্রতিরোধ্য ক্ষিপ্রতা, তার মূলে রয়েছে সুদীর্ঘকালের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা।

শৈশবে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি এবং কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে একাধিক চোটের সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়েছে মেসিকে। তবে খাদ্যাভ্যাসে মৌলিক পরিবর্তন, সুপরিকল্পিত অনুশীলন এবং ব্যক্তিগত শারীরিক যত্নের ফলেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে তার অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

একসময় ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, পিৎজা এবং আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় ভাজা খাবার ‘মিলানেসা’ ছিল মেসির প্রিয় খাদ্যের তালিকায়। তবে কর্মজীবনের মাঝামাঝি সময়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে দীর্ঘস্থায়ী পারফরম্যান্স বজায় রাখতে শারীরিক যত্ন অপরিহার্য।

২০১৪ সালে ইতালীয় পুষ্টিবিদ জিউলিয়ানো পোজেরের তত্ত্বাবধানে আসার পর মেসির খাদ্যতালিকায় আমূল পরিবর্তন আসে।

পুষ্টিবিদ পোজেরের পরিকল্পনার মূল ভিত্তি ছিল পাঁচটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান: পর্যাপ্ত পানি, অলিভ অয়েল, গোটা শস্য, তাজা ফল এবং তাজা সবজি। এই খাদ্যতালিকা শরীরের প্রদাহ হ্রাস এবং পেশির দ্রুত পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পোজেরে বিশেষভাবে চিনি এবং পরিশোধিত ময়দা যতটা সম্ভব পরিহার করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কারণ তার মতে, অতিরিক্ত চিনি পেশির জন্য অন্যতম ক্ষতিকর উপাদান।

মেসি লাল মাংসের সেবনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছেন, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে ধীর গতিতে হজম হয় এবং শরীরে ভারিভাব সৃষ্টি করতে পারে।

ম্যাচের দিন যতই ঘনিয়ে আসে, প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে মেসি দিনে তিনটি পর্যন্ত প্রোটিন শেক গ্রহণ করেন। এর পাশাপাশি তিনি পর্যাপ্ত পানি পান করেন, যা শরীরে পানিশূন্যতা রোধে সহায়ক।

কোমল পানীয়র পরিবর্তে মেসি দক্ষিণ আমেরিকার জনপ্রিয় ক্যাফেইনসমৃদ্ধ ভেষজ চা ‘ইয়ারবা মাতে’ বেছে নিয়েছেন।

খাদ্যাভ্যাসে এই পরিবর্তনের পর মেসি অসাধারণ সুফল পেয়েছেন। এমনকি বড় ম্যাচের আগে যে বমি বমি ভাব তাকে দীর্ঘদিন ধরে কষ্ট দিত, সেটিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

বর্তমানে ইন্টার মায়ামিতে খেলার সময়ও তিনি ক্লাবের পুষ্টিবিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করেন। ম্যাচ শেষে দ্রুত শক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য খেলোয়াড়দের সাধারণত পাস্তা সালাদ বা প্রোটিনসমৃদ্ধ সুশি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া, মৌসুম চলাকালীন মদ্যপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা নেইমারের মতো ভারী ওজন তোলার অনুশীলনে মেসির তেমন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না।

তার প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য তিনটি: গতি, কার্যকর শক্তি এবং নমনীয়তা। স্পেনে খেলার সময় মেসি প্রতিদিন এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে স্ট্রেচিং করতেন, যা পেশিকে নমনীয় রাখে এবং আঘাতের ঝুঁকি কমায়।

মেসির অনুশীলন সাধারণত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে থাকে সরলরৈখিক গতির ব্যায়াম, যেমন পিলার ব্রিজ, নি হাগ লাঞ্জ, হার্ডল হপ এবং স্প্লিট স্কোয়াট জাম্প, যা দ্রুত গতি বৃদ্ধিতে সহায়ক। দ্বিতীয় ভাগে থাকে বহুমুখী গতির অনুশীলন, যেমন পার্শ্বমুখী লাফ, থ্রি হার্ডল ড্রিল এবং মিরর ড্রিল, যা মাঠে মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তন, ভারসাম্য বজায় রাখা এবং প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার দক্ষতা বাড়ায়।

মৌসুম চলাকালীন তিনি সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন এই ধরনের অনুশীলন করেন।

মেসির উচ্চতা মাত্র ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় ৬৭ কেজি। অনেকে একসময় এটিকে তার দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করলেও, বাস্তবে তার এই শারীরিক গঠনই তাকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। 'লো সেন্টার অব গ্র্যাভিটি' অর্থাৎ শরীরের ভরকেন্দ্র তুলনামূলকভাবে নিচে থাকায় মেসি প্রতিপক্ষের প্রবল চাপের মধ্যেও ভারসাম্য হারান না এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে দিক পরিবর্তন করতে পারেন, যা তাকে ড্রিবলিংয়ে অনন্য করে তুলেছে।

মেসির অসাধারণ ফুটবল প্রতিভা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে তার সুদীর্ঘ সাফল্যের পেছনে আরেকটি প্রধান কারণ হলো কঠোর নিয়মানুবর্তিতা। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত অনুশীলন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং শরীরের প্রতি সচেতন যত্ন—এই চারটি বিষয় তিনি বছরের পর বছর ধরে অনুসরণ করে চলেছেন। এই কারণেই ৩৯ বছর বয়সেও মেসি বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে মাঠ মাতাচ্ছেন।