Sun 30th Aug 2026, 11:18 am

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের তীব্র অভিঘাত: বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে দারিদ্র্য বিমোচনে স্থবিরতা ও ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের তীব্র অভিঘাত: বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে দারিদ্র্য বিমোচনে স্থবিরতা ও ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের তীব্রতায় বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরও অবনতির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী অনিশ্চয়তাসহ বিদ্যমান প্রতিকূলতার কারণে এমনিতেই দেশে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে আনুমানিক ১৭ লাখ মানুষের দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করার কথা ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলস্বরূপ, চলতি বছরে মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্তি লাভ করতে পারবে। এর অর্থ, প্রত্যাশিত ১২ লাখ মানুষ পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতার কারণে দারিদ্র্যমুক্ত হতে ব্যর্থ হবে। সংস্থাটি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, চলতি বছরে প্রায় ছয় লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে উদ্ভূত জ্বালানি তেল, সার ক্রয় ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশ সরকার বাজেট সহায়তা চাইলে, বিশ্বব্যাংক গত ১৫ জুন একটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। উপরোক্ত তথ্যগুলি সেই প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়েছে।

দায়িত্বশীল সূত্র অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে বাজেট সহায়তা চেয়েছিল এবং সংস্থাটি তাতে সম্মত হয়। তবে বিশ্বব্যাংক এই শর্ত আরোপ করে যে, বিভিন্ন প্রকল্পে দীর্ঘকাল ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা বাংলাদেশের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ একত্র করে বাজেট সহায়তা প্রদান করা হবে। গত ২৬ জুন বিশ্বব্যাংক ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বাজেট সহায়তা অনুমোদন করে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ প্রসঙ্গে Desi Media Point-কে বলেন, "দারিদ্র্যমুক্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা কমে আসা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সেই সময় প্রত্যাশা ছিল যে, নতুন রাজনৈতিক সরকারের অধীনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।"

নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও উল্লেখ করেন, "আমদানিনির্ভর জ্বালানি, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উপর বাংলাদেশের অত্যধিক নির্ভরশীলতা একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করেছে, যা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বারবার প্রকট হয়েছে।" তিনি যোগ করেন, বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদন বর্তমান সরকারের জন্য বিব্রতকর, কারণ এটি ইঙ্গিত দেয় যে অর্থনীতির স্থবির অবস্থা এখনো কাটেনি। তিনি পরামর্শ দেন যে, সরকার ঘোষিত জনপ্রিয় উদ্যোগগুলির পাশাপাশি অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতাগুলির প্রতিও মনোযোগ দেওয়া উচিত। যেহেতু দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে, তাই সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো যেন প্রকৃত দরিদ্রদের প্রয়োজন মেটাতে পারে এবং রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষভাবে সুবিধাভোগী চিহ্নিত করা হয়।

**বাজেট সহায়তার অর্থের ব্যবহার**
বিশ্বব্যাংকের এই বাজেট সহায়তা মূলত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ক্রয়কৃত জ্বালানি পণ্যের মূল্য পরিশোধে ব্যবহৃত হবে। এছাড়াও, সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলির জন্য নগদ ও জীবিকা সহায়তা প্রদান করা হবে। এই পদক্ষেপগুলি সংকটের সময়ে আয় স্থিতিশীল রাখতে এবং কর্মসংস্থান বজায় রাখতে সহায়ক হবে। সূত্রমতে, বাজেট সহায়তার অর্থ ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অনুকূলে বরাদ্দ করা হয়েছে এবং জ্বালানি তেল, এলএনজি, সার ও অন্যান্য পণ্য আমদানিতে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে।

**বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নের সারসংক্ষেপ**
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সীমিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি মন্থর হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রায় ১৪ লাখ দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। যদিও পূর্বে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পূর্বাভাস ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাংক মনে করছে যে, চলতি বছরে মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারবে। বিশ্বব্যাংক আরও মনে করে, এই বছর যে অগ্রগতি প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তার একটি বড় অংশ অর্জিত হবে না; উল্টো প্রায় ছয় লাখ কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৬ সালে দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রায় ১০ শতাংশের জন্য জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকেই দায়ী করা হচ্ছে।

**বহুমাত্রিক ও জটিল পরিস্থিতি**
বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ এক বহুমুখী সংকট ও ঝুঁকির সম্মুখীন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা এবং তীব্র ভূরাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের অন্তর্নিহিত কাঠামোগত অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলি বড় ধরনের অভিঘাত মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে সীমিত করে দিয়েছে। গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কর–জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। টানা তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে স্থিতিশীল রয়েছে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। জ্বালানি ভর্তুকি এবং ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে রাজস্ব ঘাটতি আরও বেড়ে জিডিপি’র প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মাসে গড়ে ২৬ বার বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের শিকার হয়, যার ফলে তাদের বার্ষিক বিক্রির ৯ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন বিধিবিধানের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলির বিনিয়োগের সম্ভাবনা ১৯ শতাংশ হ্রাস পায়।

**জ্বালানি খাতের চিত্র**
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে যে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উপর বাংলাদেশের অত্যধিক নির্ভরশীলতা একটি গুরুতর কাঠামোগত দুর্বলতা সৃষ্টি করেছে, যা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বারবার প্রকাশ পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক জানায়, দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের ৫০ শতাংশেরও বেশি গ্যাস থেকে আসে। বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের ৬০–৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫–৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ইতিমধ্যে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে; পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকেই ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এলএনজির স্পট মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউয়ে ২৪–২৮ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা স্বাভাবিক মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি। বিশ্বব্যাংক আরও পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৬ সালে জ্বালানি খাতে মোট ভর্তুকির বোঝা ২.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪.৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ১.৫ বিলিয়ন থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলার ছিল। এই ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি ব্যয় সামাজিক ও জরুরি খাতে সরকারি ব্যয়ের সুযোগকে সীমিত করে দিচ্ছে।

**সার খাতের চ্যালেঞ্জ**
ইউরিয়া, ডায়ামোনিয়াম ফসফেট, ট্রিপল সুপার ফসফেট এবং মিউরিয়েট অব পটাশের মতো সারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে আমদানির উপর নির্ভরশীল। একই সাথে, দেশের ইউরিয়া উৎপাদনও স্থিতিশীল গ্যাস সরবরাহের উপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ইতিমধ্যে এই সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যার ফলে ইউরিয়ার দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক মনে করে, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এই মূল্য দ্বিগুণ হতে পারে।

**বেসরকারি খাত ও কর্মসংস্থান**
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের বেসরকারি খাত ও শ্রমবাজার উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত দুর্বলতার সম্মুখীন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি প্রতি মাসে গড়ে ২৬ বার বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের শিকার হয়, যার ফলে তাদের বার্ষিক বিক্রয়ের ৯ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। এছাড়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন বিধিবিধানের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলির বিনিয়োগের সম্ভাবনা ১৯ শতাংশ হ্রাস পায়। বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে যে, শ্রমবাজারের অবস্থাও কাঠামোগতভাবে অবনতি হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সৃষ্ট প্রতি দশটি নতুন কর্মসংস্থানের মধ্যে সাতটিই কম উৎপাদনশীল কৃষি খাতে তৈরি হয়েছে।