Wed 19th Aug 2026, 4:30 pm

বই, সাবান, কফি ও কবজার আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালানের অভিনব কায়দা উন্মোচন

বই, সাবান, কফি ও কবজার আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালানের অভিনব কায়দা উন্মোচন
পুঁথি ও পুস্তকের পাতার গোপন কুঠুরিতে স্বর্ণবার, সাবানের অভ্যন্তরে সোনার আংটি, কফির ক্ষুদ্র প্যাকেটে দানাদার স্বর্ণের সংমিশ্রণ, এমনকি ব্যাটারি, জলের কল, ছাতা অথবা দরজার কবজার নিভৃত কোণে লুকায়িত স্বর্ণ – এমন বিচিত্র ও অভিনব পন্থায় দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করানো স্বর্ণের বিপুল পরিমাণ উদ্ধার করা হয়েছে।
বিমানবন্দর ও অন্যান্য প্রবেশপথ ব্যবহার করে দেশে অবৈধ স্বর্ণ চোরাচালানের অসংখ্য ঘটনা সময়ে সময়ে উদঘাটিত হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি আয়োজিত এক রাজস্ব সম্মেলনে চোরাচালানে ব্যবহৃত এই ধরনের অভিনব কৌশলগুলোর কিছু দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেছে। মঙ্গলবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এনবিআর-এর এই রাজস্ব সম্মেলনে একটি অস্থায়ী জাদুঘর স্থাপন করা হয়, যেখানে উদ্ধারকৃত স্বর্ণের চোরাচালান পদ্ধতির এসব চমকপ্রদ নমুনা উপস্থাপন করা হয়। সম্মেলনের প্রধান অতিথি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, এই অস্থায়ী জাদুঘর পরিদর্শন করেন এবং প্রদর্শনীসমূহ নিবিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
স্বর্ণ চোরাচালানের পাশাপাশি, স্থলবন্দরসমূহ থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধারকৃত কিছু দুর্লভ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও এই জাদুঘরের সংগ্রহে স্থান পেয়েছে। ২০০৯ সালে হিলি কাস্টমস কর্তৃক আটককৃত কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি এবং পিতলের কালীমূর্তি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
শুধু আধুনিক কালের চোরাচালানের কৌশলই নয়, বরং সুদূর অতীতে সংঘটিত অবৈধ কারবারের বিচিত্র পদ্ধতিও এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ১৯৬৭ সালে অক্সফোর্ড ব্র্যান্ডের উঁচু হিলের জুতোর ভেতরে চোরাচালানি পণ্য পরিবহন করা হতো। একইভাবে, ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস একটি সুবিশাল রেডিও আটক করে, যা ইঙ্গিত দেয় যে সে সময়ে রেডিওর মতো প্রযুক্তিপণ্যও চোরাচালানের মাধ্যমে আনা হতো।
চোরাচালানের ইতিহাসের পাশাপাশি, এনবিআর-এর এই জাদুঘরে দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দলিলের অনুলিপিও প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ১৬০১ সালে রানী এলিজাবেথ কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতে বাণিজ্য পরিচালনার জন্য প্রদত্ত অনুমোদনপত্র, যা প্রায় ৪০০ বছর পূর্বে জারি হয়েছিল। এছাড়াও, ১৬১৫ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর কর্তৃক ইংরেজদের ভারতে ব্যবসা করার অনুমতিপত্রের প্রতিলিপি এবং ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রামে একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে দেওয়া সনদও এই সংগ্রহে বিদ্যমান।
রাজস্ব সম্মেলনের অংশ হিসেবে, আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) এবং শুল্ক—প্রতিটি বিভাগের জন্য পৃথক পৃথক স্টল স্থাপন করা হয়। এই স্টলগুলোতে সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ তাদের কার্যক্রম ও সাফল্য উপস্থাপন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি স্টল পরিদর্শন করে রাজস্ব সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কার্যাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন।
রাজস্ব কর্মকর্তাগণ মত প্রকাশ করেছেন যে, এই অস্থায়ী জাদুঘরটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে এক কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
সম্মেলনে এনবিআর-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব ঘোষণা করেন যে, বিগত পাঁচ দশকে দেশের রাজস্ব সংগ্রহ প্রায় আড়াই হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশেরও অধিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের মাত্র ২.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মন্থরতা কাটিয়ে রাজস্ব আহরণে একটি সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী পুনরুদ্ধার নির্দেশ করে।
সম্মেলন আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক এবং এনবিআর সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমান উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত যেমন তুলনামূলকভাবে কম, তেমনি কর আদায়ে বিনিয়োগের পরিমাণও আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের তুলনায় নগণ্য। তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে মাত্র ২১ পয়সা ব্যয় করে। তিনি রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যয়কে ‘একটি ফলপ্রসূ বিনিয়োগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সমাপ্তির পর, এই অস্থায়ী জাদুঘর এবং প্রদর্শনী স্টলগুলো সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বিকেল পর্যন্ত উন্মুক্ত রাখা হয়।