চলতি আগস্ট মাসের প্রথম সাত দিনে খুলনায় মোট ২২৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। পরবর্তী সপ্তাহে এই সংখ্যায় এক বিশাল উল্লম্ফন দেখা যায়; ৮ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র সাত দিনে নতুন করে ৫৪৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আগস্টের এই ১৪ দিনে ডেঙ্গুতে চারজনের প্রাণহানি ঘটেছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে জুলাই পর্যন্ত বিগত সাত মাসে খুলনায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৯৬ জন। ওই সময়ে ৯৭ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং ডেঙ্গুতে মোট সাতজনের মৃত্যু হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে ৬৯২ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন।
আগস্টে এসে আক্রান্তের সংখ্যা আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে মারাত্মক শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দোতলায় গেলেই করিডরজুড়ে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেককে মেঝেতে শুয়েও চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে। মেডিসিন ইউনিটের বারান্দাতেও একই রকম চিত্র। ডেঙ্গু রোগীদের পৃথকভাবে শনাক্ত করা বা সাধারণ রোগীদের থেকে আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি ডেঙ্গু কর্নারটিও রোগীতে পূর্ণ।
হাসপাতালের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. হামিদুল ইসলাম খান জানান, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ১৫টি শয্যার ওয়ার্ডটি সম্পূর্ণ ভর্তি। এমনকি ওয়ার্ডের বাইরেও রোগী রাখতে হচ্ছে, যা কিছুটা ঝুঁকির কারণ। তবে রোগীরা এই পরিস্থিতি বুঝতে চাইছেন না এবং রোগীর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) মশকনিধন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকির জন্য তিনটি দল গঠন করেছে। নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল এবং অপরিচ্ছন্ন বাড়ি ও স্থাপনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত ডেঙ্গু রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান খান জানিয়েছেন যে, ২২ নম্বর (কাস্টম ঘাট ও কয়লাঘাট), ২৮ নম্বর (পশ্চিম টুটপাড়া, মিয়াপাড়া ও কারাপাড়া), ২৯ নম্বর (হাজী মহসিন রোড, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, টিবি ক্রস রোড ও গগন বাবু রোড) এবং ৩০ নম্বর (টুটপাড়া ও মতিয়াখালী) ওয়ার্ডগুলোকে ‘রেড জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডগুলোকে ‘অরেঞ্জ জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে লিফলেট বিতরণ, মাইকিং, প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে মশকনিধন স্প্রে ও ফগিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে ওয়ার্ডভিত্তিক মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নগরবাসীকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান উল্লেখ করেন যে, আগামী তিন মাসের জন্য পর্যাপ্ত মশকনিধনের ওষুধ মজুত রয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো সংকট এড়াতে অতিরিক্ত ওষুধ ক্রয়ের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া এগিয়ে রাখা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫ দিনব্যাপী অভিযান শুরু হয়েছে এবং তাদের ক্রাশ প্রোগ্রামও অব্যাহত আছে।
গত শনিবার সরেজমিনে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে দেখা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশারি ব্যবহার করতে দেখা যায়নি, যা উদ্বেগজনক।
‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত নগরীর টুটপাড়া বড়খালপাড় এলাকার বাসিন্দা অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহরিয়ার মাশফি গত চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। শাহরিয়ার জানিয়েছে, তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও প্লাটিলেটের মাত্রা কিছুটা কমেছে।
‘রেড জোন’ভুক্ত মুন্সীপাড়া এলাকার বাসিন্দা খুরশীদা বেগম পাঁচ দিন ধরে অসুস্থ। ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হলেও সেখানে শয্যা খালি না থাকায় তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি আরও জানান, তার মেয়েরও ডেঙ্গু হয়েছিল এবং সে বর্তমানে বাসায় চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হচ্ছে।
রেড জোনের চানমারী বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. নাইমুল ইসলাম জানিয়েছেন, একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর পর তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। একই সময়ে তার মেয়েরও ডেঙ্গু হয়েছিল, তবে মেয়েকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
১৫ই আগস্ট খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে ৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। সেদিন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে মোট ১৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আরিফ মোহাম্মাদ Desi Media Point-কে জানান, মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ডেও ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করা হচ্ছে। এমনকি হাসপাতালের বারান্দা ও মেঝেতেও রোগীদের স্থান দিতে হচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরে রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। হাসপাতালে ওষুধ ও কিট পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত থাকলেও শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। রোগীর চাপ আরও বৃদ্ধি পেলে পৃথক ডেঙ্গু ইউনিট খোলার প্রস্তুতিও তাদের রয়েছে।
খুলনার অন্যতম বৃহৎ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রফিকুল ইসলাম গাজী Desi Media Point-কে বলেন, হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের দুটি ওয়ার্ডে শয্যাসংখ্যা মাত্র ২৫টি হলেও বর্তমানে সেখানে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত শনিবার ২৩ জন রোগী ছাড়পত্র পেলেও ভর্তির জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন তার চেয়েও বেশি রোগী। হাসপাতালের শয্যাসংকট অত্যন্ত প্রকট, তবে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
বেসরকারি খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো শয্যা খালি নেই। ৩০০ শয্যার এই হাসপাতালটির প্রতিটি শয্যাতেই রোগী ভর্তি রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী।
খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে একটি alarming চিত্র পাওয়া যায়: ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৭৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অথচ ১লা থেকে ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত মাত্র দুই সপ্তাহে নতুন করে ৭৬৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মানে হলো, পূর্ববর্তী সাত মাসে ভর্তি হওয়া রোগীর প্রায় সমানসংখ্যক রোগী মাত্র দুই সপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই একই সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৯৭ জন থেকে বেড়ে ২৩৭ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ৭ জন থেকে বেড়ে ১১ জনে উন্নীত হয়েছে।
১৪ই আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৬০ জনে। ৮ থেকে ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত নতুনভাবে ভর্তি হওয়া ৫৪৬ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ১৩১ জন বেসরকারি হাসপাতালে, ২০১ জন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ২১৪ জন খুলনার অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত ২৩৭ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং চিকিৎসা শেষে ১ হাজার ৩১২ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
খুলনার সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুন জানিয়েছেন যে, খুলনার নয়টি উপজেলার মধ্যে রূপসা উপজেলায় ডেঙ্গু রোগীর চাপ সর্বাধিক। অন্যান্য আটটি উপজেলায় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রয়েছে। রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ২১ জন রোগী ভর্তি আছেন। তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, সকল উপজেলাতেই ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটের কোনো সংকট নেই।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে জুলাই পর্যন্ত বিগত সাত মাসে খুলনায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৯৬ জন। ওই সময়ে ৯৭ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং ডেঙ্গুতে মোট সাতজনের মৃত্যু হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে ৬৯২ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন।
আগস্টে এসে আক্রান্তের সংখ্যা আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে মারাত্মক শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দোতলায় গেলেই করিডরজুড়ে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেককে মেঝেতে শুয়েও চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে। মেডিসিন ইউনিটের বারান্দাতেও একই রকম চিত্র। ডেঙ্গু রোগীদের পৃথকভাবে শনাক্ত করা বা সাধারণ রোগীদের থেকে আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি ডেঙ্গু কর্নারটিও রোগীতে পূর্ণ।
হাসপাতালের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. হামিদুল ইসলাম খান জানান, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ১৫টি শয্যার ওয়ার্ডটি সম্পূর্ণ ভর্তি। এমনকি ওয়ার্ডের বাইরেও রোগী রাখতে হচ্ছে, যা কিছুটা ঝুঁকির কারণ। তবে রোগীরা এই পরিস্থিতি বুঝতে চাইছেন না এবং রোগীর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) মশকনিধন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকির জন্য তিনটি দল গঠন করেছে। নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল এবং অপরিচ্ছন্ন বাড়ি ও স্থাপনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত ডেঙ্গু রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান খান জানিয়েছেন যে, ২২ নম্বর (কাস্টম ঘাট ও কয়লাঘাট), ২৮ নম্বর (পশ্চিম টুটপাড়া, মিয়াপাড়া ও কারাপাড়া), ২৯ নম্বর (হাজী মহসিন রোড, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, টিবি ক্রস রোড ও গগন বাবু রোড) এবং ৩০ নম্বর (টুটপাড়া ও মতিয়াখালী) ওয়ার্ডগুলোকে ‘রেড জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডগুলোকে ‘অরেঞ্জ জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে লিফলেট বিতরণ, মাইকিং, প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে মশকনিধন স্প্রে ও ফগিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে ওয়ার্ডভিত্তিক মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নগরবাসীকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান উল্লেখ করেন যে, আগামী তিন মাসের জন্য পর্যাপ্ত মশকনিধনের ওষুধ মজুত রয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো সংকট এড়াতে অতিরিক্ত ওষুধ ক্রয়ের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া এগিয়ে রাখা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫ দিনব্যাপী অভিযান শুরু হয়েছে এবং তাদের ক্রাশ প্রোগ্রামও অব্যাহত আছে।
গত শনিবার সরেজমিনে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে দেখা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশারি ব্যবহার করতে দেখা যায়নি, যা উদ্বেগজনক।
‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত নগরীর টুটপাড়া বড়খালপাড় এলাকার বাসিন্দা অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহরিয়ার মাশফি গত চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। শাহরিয়ার জানিয়েছে, তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও প্লাটিলেটের মাত্রা কিছুটা কমেছে।
‘রেড জোন’ভুক্ত মুন্সীপাড়া এলাকার বাসিন্দা খুরশীদা বেগম পাঁচ দিন ধরে অসুস্থ। ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হলেও সেখানে শয্যা খালি না থাকায় তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি আরও জানান, তার মেয়েরও ডেঙ্গু হয়েছিল এবং সে বর্তমানে বাসায় চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হচ্ছে।
রেড জোনের চানমারী বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. নাইমুল ইসলাম জানিয়েছেন, একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর পর তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। একই সময়ে তার মেয়েরও ডেঙ্গু হয়েছিল, তবে মেয়েকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
১৫ই আগস্ট খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে ৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। সেদিন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে মোট ১৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আরিফ মোহাম্মাদ Desi Media Point-কে জানান, মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ডেও ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করা হচ্ছে। এমনকি হাসপাতালের বারান্দা ও মেঝেতেও রোগীদের স্থান দিতে হচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরে রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। হাসপাতালে ওষুধ ও কিট পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত থাকলেও শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। রোগীর চাপ আরও বৃদ্ধি পেলে পৃথক ডেঙ্গু ইউনিট খোলার প্রস্তুতিও তাদের রয়েছে।
খুলনার অন্যতম বৃহৎ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রফিকুল ইসলাম গাজী Desi Media Point-কে বলেন, হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের দুটি ওয়ার্ডে শয্যাসংখ্যা মাত্র ২৫টি হলেও বর্তমানে সেখানে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত শনিবার ২৩ জন রোগী ছাড়পত্র পেলেও ভর্তির জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন তার চেয়েও বেশি রোগী। হাসপাতালের শয্যাসংকট অত্যন্ত প্রকট, তবে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
বেসরকারি খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো শয্যা খালি নেই। ৩০০ শয্যার এই হাসপাতালটির প্রতিটি শয্যাতেই রোগী ভর্তি রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী।
খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে একটি alarming চিত্র পাওয়া যায়: ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৭৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অথচ ১লা থেকে ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত মাত্র দুই সপ্তাহে নতুন করে ৭৬৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মানে হলো, পূর্ববর্তী সাত মাসে ভর্তি হওয়া রোগীর প্রায় সমানসংখ্যক রোগী মাত্র দুই সপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই একই সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৯৭ জন থেকে বেড়ে ২৩৭ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ৭ জন থেকে বেড়ে ১১ জনে উন্নীত হয়েছে।
১৪ই আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৬০ জনে। ৮ থেকে ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত নতুনভাবে ভর্তি হওয়া ৫৪৬ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ১৩১ জন বেসরকারি হাসপাতালে, ২০১ জন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ২১৪ জন খুলনার অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত ২৩৭ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং চিকিৎসা শেষে ১ হাজার ৩১২ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
খুলনার সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুন জানিয়েছেন যে, খুলনার নয়টি উপজেলার মধ্যে রূপসা উপজেলায় ডেঙ্গু রোগীর চাপ সর্বাধিক। অন্যান্য আটটি উপজেলায় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রয়েছে। রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ২১ জন রোগী ভর্তি আছেন। তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, সকল উপজেলাতেই ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটের কোনো সংকট নেই।