Sat 15th Aug 2026, 3:01 pm

ভ্রান্ত পরিচয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হিসেবে কারাভোগের পর অবশেষে মুক্তি পেলেন সোনা মিয়া

ভ্রান্ত পরিচয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হিসেবে কারাভোগের পর অবশেষে মুক্তি পেলেন সোনা মিয়া
কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাভোগরত সোনা মিয়া, যিনি ভ্রান্ত পরিচয়ের শিকার হয়েছিলেন, অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন। দীর্ঘ কারাবাসের পর আদালতের আরোপিত চারটি শর্তে তিনি জামিন লাভ করেন। গতকাল শুক্রবার কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তাঁকে কারামুক্তি দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান জানান, আদালতের নির্দেশনা প্রাপ্তির পর শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সোনা মিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

এর আগে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত সোনা মিয়াকে চারটি শর্তে জামিন দেন বলে আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নাজির) মো. বেদারুল আলম নিশ্চিত করেছেন।

আদালতের আরোপিত শর্তাবলী নিম্নরূপ: সোনা মিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট আদালতে জমা রাখা; আদালতের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে ঠিকানা পরিবর্তন না করা; নির্ধারিত তারিখে আদালতে নিয়মিত হাজিরা প্রদান; এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষকে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে অবহিত রাখা। এর পাশাপাশি, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাঁর বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানায় হাজির হয়ে তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এছাড়াও, প্রতি তিন মাস পর তাঁর উপস্থিতি ও অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে থানাকেও নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী উল্লেখ করেন যে, ২০২২ সালের ১৩ জুন সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে মূল অভিযুক্ত মো. রমজান ওই মামলায় জামিন নিয়ে আত্মগোপন করেছেন। তাঁকে শনাক্তকরণ ও গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

মামলার নথি ও আদালত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ মো. রমজানসহ পাঁচজন পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারকালীন রমজান নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে পরিচয় দেন এবং সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত মামলার পাঁচজন আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।

গত ২৪ জুন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে প্রকৃত অপরাধী রমজানের স্থলে গ্রেপ্তার হয়ে কারান্তরীণ হন সোনা মিয়া। এই ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর দৃঢ়ভাবে দাবি করেন যে, তিনি ইয়াবা মামলার সঙ্গে কোনো প্রকারেই জড়িত নন।

কারাগার কর্তৃপক্ষও পুরোনো মামলার নথিতে থাকা ছবি, পরিচয়, মায়ের নামসহ বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে সোনা মিয়ার তথ্যের অসংগতি লক্ষ্য করে। বিষয়টি আদালতের গোচরীভূত হলে জেলা ও দায়রা জজ পুলিশকে তদন্তের আদেশ দেন।

পুলিশের তদন্তে উদ্ঘাটিত হয় যে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃত সোনা মিয়া নন, তিনি রোহিঙ্গা নাগরিক মো. রমজান। সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে রমজান নিজ পরিচয় গোপন রেখে ইয়াবা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সেই ভ্রান্ত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করেই মামলা, অভিযোগপত্র এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী তদন্ত কার্য সম্পন্ন করে গত ৫ জুলাই একটি প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ২০২০ সালের ইয়াবা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নন। ওই মামলায় সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি বাস্তবে রোহিঙ্গা নাগরিক মো. রমজান।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং সোনা মিয়ার আইনজীবী আবদুল মান্নান অভিমত ব্যক্ত করেন যে, মামলার তদন্ত পর্যায়েই অভিযুক্তের প্রকৃত পরিচয় যাচাইয়ে গাফিলতি ছিল। ফলস্বরূপ, একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাবরণ করতে হয়েছে। বিষয়টি আদালতের গোচরীভূত হওয়ার পর জামিনের আবেদন পেশ করা হয়। নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রাসঙ্গিক তথ্যসমূহ পর্যালোচনা করে আদালত গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সোনা মিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন।

শুক্রবার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে পরিচয় বিভ্রাটের শিকার হয়ে কারাবরণকারী দিনমজুর সোনা মিয়া নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। কারাফটকে উপস্থিত স্বজনরা তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে সাদরে বরণ করে নেন।