Mon 17th Aug 2026, 5:03 pm

নকশাগত ত্রুটি ও আইনি জটিলতা: যশোরের আট সেতুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

নকশাগত ত্রুটি ও আইনি জটিলতা: যশোরের আট সেতুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
যশোরের তিনটি উপজেলায় চারটি প্রধান নদ-নদীর ওপর নির্মাণাধীন আটটি সেতুর উচ্চতা নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় যথেষ্ট কম। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) গেজেট অনুসারে, নদীর সর্বোচ্চ জলস্তর থেকে সেতুর গার্ডারের (ভারবাহী কাঠামো) ন্যূনতম ১৫ ফুট ব্যবধান থাকা আবশ্যক। তবে, এই নির্মাণাধীন সেতুগুলোর ক্ষেত্রে গার্ডার ও জলস্তরের মধ্যে ব্যবধান কোনো স্থানে ৬ ফুট এবং কোনো স্থানে ৮ ফুট।

এই সমস্যার সূত্রপাত হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে, যখন স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যশোর সদর, মনিরামপুর এবং শার্শা উপজেলায় সেতুগুলির নির্মাণ কাজ শুরু করে। এই আটটি সেতুর জন্য মোট ৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকা নির্মাণ ব্যয় নির্ধারিত হয়েছিল।

নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর দ্রুতই প্রতিটি সেতুর নকশায় ত্রুটি ধরা পড়ে। বিআইডব্লিউটিএর বিধিমালা অনুযায়ী, নদীপথে যেকোনো সেতু নির্মাণের জন্য তাদের থেকে ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক। আশ্চর্যজনকভাবে, এলজিইডি এই আটটি সেতুর জন্য কোনো ছাড়পত্র গ্রহণ করেনি। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা নিয়ম অনুযায়ী সেতু নির্মাণের জন্য এলজিইডিকে বারবার চিঠি দিলেও, এলজিইডি নির্মাণ কাজ চালিয়ে যায়। ফলস্বরূপ, বিআইডব্লিউটিএ যশোরের কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।

এত কিছুর পরও কোনো সেতুর নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়নি। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ায়। ২০২৪ সালের জুন মাসে হাইকোর্ট যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেতুগুলো নির্মাণের নির্দেশ দেন। এরপর থেকে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সেতুগুলির নির্মাণকাজ স্থগিত রয়েছে। তবে, এর আগেই একটি সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং বাকি সাতটির মধ্যে পাঁচটির কাজ ৮০-৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিল। এলজিইডির তথ্যমতে, অবশিষ্ট দুটি সেতুর নির্মাণ অগ্রগতি যথাক্রমে ৬০ ও ৩২ শতাংশ।

আটটি সেতুর মধ্যে তিনটির দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৯৬ মিটার, ৫০ মিটার এবং ৪৫ মিটার। বাকি পাঁচটি সেতুর মধ্যে তিনটির দৈর্ঘ্য ৭২ মিটার করে এবং দুটি ৬০ মিটার করে। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্মাণ কাজ স্থগিত থাকায় আটটি সেতুর মধ্যে পাঁচটির প্রকল্প মেয়াদ ইতোমধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সেতুগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যদি সেতুগুলো ভেঙে ফেলতে হয়, তবে সরকারের ৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকা বিনিয়োগ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হবে। অন্যদিকে, বর্তমান ত্রুটিপূর্ণ নকশায় নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে তা দেশের নৌপথের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করবে।

গত জুন ও জুলাই মাসে Desi Media Point-এর প্রতিবেদক যশোরের আটটি সেতু এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। এর মধ্যে যশোর সদর উপজেলায় ভৈরব নদের ওপর তিনটি, শার্শা উপজেলায় বেতনা নদীর ওপর দুটি, মনিরামপুর উপজেলায় শ্রী নদের ওপর একটি এবং মুক্তেশ্বরী নদীর ওপর দুটি সেতু অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বর্তমানে এই নদ-নদীগুলির যে অংশে সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে কোনো নৌযান চলাচল করে না। তবে, ২৫ থেকে ৩০ বছর আগেও এই নদীগুলোতে ট্রলারের (ইঞ্জিনচালিত নৌকা) নিয়মিত চলাচল ছিল।

যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা এলাকায় ভৈরব নদের ওপর একটি সেতুর ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই সেতুর জন্য ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল।

ছাতিয়ানতলার মুদি দোকানি তোফায়েল আহমেদ জানান, ২০২৩ সাল থেকে ভৈরব নদ খননের পর পুনরায় জোয়ার-ভাটা শুরু হয়েছে। একসময় এই নৌপথ ব্যবহার করে খেজুরের গুড় ও পাটালি নৌকায় করে বরিশাল-খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো। তবে, ১৯৯০ সালের পর থেকে নৌপথটি ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে এবং বর্তমানে নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ।

ছাতিয়ানতলা সেতু থেকে ভাটির দিকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আফরা ঘাট থেকে এখনো নৌকা বা ট্রলারযোগে নোয়াপাড়া বন্দরে যাতায়াত করা যায়।

ছাতিয়ানতলা থেকে উজানে তিন কিলোমিটার দূরে দাইতলা এলাকায় ভৈরব নদের ওপর আরেকটি সেতুর নির্মাণ কাজ চলছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, নদের বুকে কচুরিপনা জমে আছে। এই সেতুর প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং এলজিইডি সূত্র জানিয়েছে যে এর নির্মাণ ব্যয় ৪ কোটি ১১ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

দাইতলায় নির্মাণাধীন সেতুর পাশ দিয়ে সাময়িক চলাচলের জন্য একটি বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হয়েছে, যা দিয়ে কেবল মোটরসাইকেল চলাচল করতে পারে। তবে ভ্যান-রিকশার মতো ভারী যানবাহন চলাচল সম্ভব নয়।

দাইতলা থেকে আরও চার কিলোমিটার উজানে রাজারহাট এলাকায় ভৈরব নদের ওপর আরেকটি সেতু নির্মাণাধীন রয়েছে। এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় ৫ কোটি ৪৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা এবং কাজ ৩২ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।

সেতুর নিচের নদের পানি নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। নদপারের গ্রাম আবাদ কচুয়ার বাসিন্দা শাহিন হোসেন খান অভিমত দেন যে, এই সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে পার্শ্ববর্তী ৩০ গ্রামের হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হবে।

যশোরের শার্শা উপজেলার নাভারন বাসস্ট্যান্ড থেকে গোড়পাড়া আঞ্চলিক সড়কে বেতনা নদীর ওপর পরপর দুটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি কাজীবেড়-ইসলামপুর এলাকায় এবং প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে একই উপজেলার গাতিপাড়া এলাকায় আরেকটি সেতু নির্মিত হচ্ছে।

কাজীবেড়-ইসলামপুর সেতুর পাটাতন ঢালাইয়ের কাজ অর্ধেক বাকি রয়েছে। দাপ্তরিক তথ্যানুযায়ী, এই সেতুর কাজ ৮৬ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং এর নির্মাণ ব্যয় ৬ কোটি ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

এলজিইডি যশোর সদর, মনিরামপুর ও শার্শার আটটি নির্মাণাধীন সেতুর নকশা করেছে। বিআইডব্লিউটিএ নদীর উপর সেতুর উচ্চতা কম হওয়ায় আপত্তি জানিয়েছে। এই সেতুর উত্তর পাশের ইসলামপুর গ্রামের কৃষক মিয়া রাজ বলেন, নদী পার হয়ে তাদের নাভারন বাজারে যেতে হয়। সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে এবং প্রতি মণ ধানে ১০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। ধান ছাড়াও অন্যান্য ফসল বিক্রির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা বিদ্যমান।

মিয়া রাজ আরও বলেন, তিনি শুনেছেন সেতুর নকশায় ত্রুটি রয়েছে। এই ত্রুটি সংশোধন করে দ্রুত নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে এলাকাবাসী উপকৃত হতেন। তিনি স্মরণ করে বলেন, ৩০ বছর আগে বেতনা নদীতে উত্তরবঙ্গ থেকে নৌকাভর্তি ধান ও পাট আসত, যা বর্তমানে সম্ভব নয়, কারণ এখন নদীতে জোয়ার-ভাটাও হয় না।

অপরদিকে, গাতিপাড়া সেতুর কাজ ৯২ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এর নির্মাণ ব্যয় ৬ কোটি ৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা নির্ধারিত হয়েছিল। এই সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়কের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় স্থানীয় জনগণ নিজেদের উদ্যোগে তা নির্মাণ করে সেতুটিকে চলাচলের উপযোগী করে তুলেছেন।

এছাড়া, মনিরামপুর উপজেলা সদরের মোহনপুর বটতলা থেকে অভয়নগরের নওয়াপাড়া নৌবন্দর সড়কে মুক্তেশ্বরী নদীর ওপর ৯৬ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। ৭ কোটি ৫৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুর ৮৪ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

সেতুর এই অংশে বর্তমানে নৌ চলাচল না থাকলেও, নদীতে এখনো জোয়ার-ভাটা হয়।

মনিরামপুরের হাজরাইল-নলঘোনা সড়কে মুক্তেশ্বরী নদীর ওপর আরেকটি সেতুর শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে, তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি এখনো এলজিইডির কাছে সেতুটি হস্তান্তর করেনি।

এলজিইডি সূত্রমতে, এই সেতু নির্মাণে ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। মনিরামপুর উপজেলার নেহালপুরে শ্রী নদের ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতুর কাজ ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে, যার নির্মাণ ব্যয় ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। এই সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করে চলাচলের উপযোগী করেছেন।

কম উচ্চতার আটটি সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে Desi Media Point এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেছে। তিনি জানান, নকশা তৈরির সময় নৌপথ, নৌযান চলাচলের প্রকৃতি, প্রকল্পের ব্যয় এবং সময়—এই সব বিষয় বিবেচনা করা হয়। এলজিইডির নকশা বিভাগই সেতুগুলির ডিজাইন প্রণয়ন করে।

তবে, বিআইডব্লিউটিএর গেজেট অনুসরণ না করে নকশা প্রণয়নের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পরও কেন নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে আহমেদ মাহবুবুর রহমান বলেন, "সেটি অবশ্যই করা যেত। কিন্তু আমি তখন যশোরের দায়িত্বে ছিলাম না।"

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে এই আটটি সেতুর নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে, যার মোট নির্মাণ ব্যয় ৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত শরিফুল ইসলাম যশোরের এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, বর্তমানে তিনি এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। তাঁর কার্যকালে যশোরের ভৈরব নদের ওপর রাজারহাট সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল।

৮ আগস্ট Desi Media Point-এর এক প্রশ্নের জবাবে শরিফুল ইসলাম মুঠোফোনে জানান যে, বিআইডব্লিউটিএর গেজেট অনুযায়ী ভৈরব নদের নোয়াপাড়া থেকে উজানের দিকে নৌপথ সচল দেখানো হয়নি এবং এই অংশে কোনো নৌযান চলাচল করে না। তিনি আরও বলেন, এই নদের ওপর ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৫৩টি সেতু রয়েছে, যার মধ্যে সাড়ে ছয় মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুও (কালভার্টের মতো) বিদ্যমান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "এই পথে কি নৌযান চলাচলের বাস্তবতা আছে?"

বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন ছাড়া কম উচ্চতায় সেতু নির্মাণের বিষয়ে শরিফুল ইসলাম স্বীকার করেন, "এটা সত্য যে, সেতুটি নির্মাণের সময় বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন নেওয়া হয়নি। কারণ অনুমোদন নিতে গেলে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ উভয়ই বৃদ্ধি পেত।"

২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত আনিসুজ্জামান এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, এবং বর্তমানে তিনিও এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। তিনি মুঠোফোনে Desi Media Point-কে বলেন, "আমার সময়ে ঠিক কোন সেতুর কাজ শুরু হয়েছিল, তা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।"

পরবর্তীতে Desi Media Point এলজিইডির সেতু ডিজাইন (নকশা) শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এম এ ছাত্তারের সঙ্গে কথা বলেছে। তিনি মন্তব্য করেন, "এখন সেতুগুলোর অবশিষ্ট কাজ করতে গেলে আদালত অবমাননার দায়ে জেলে যেতে হবে। যারা মামলা করেছে, তাদের মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মামলা প্রত্যাহার না করলে তো কিছু করার নেই।"

বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন ছাড়া এভাবে সেতু নির্মাণ করা কতটুকু সঠিক ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে এম এ ছাত্তার বলেন, "যারা তখন দায়িত্বে ছিলেন, তাদের দায় রয়েছে। তারা এখন অবসরে চলে গেছেন। যেহেতু সেতুগুলো প্রায় নির্মিত হয়ে গেছে, এখন কাজ শেষ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তা না হলে এই বিনিয়োগ সম্পূর্ণরূপে বিফলে যাবে।"

এই এলজিইডি কর্মকর্তা আরও জানান যে, মামলা প্রত্যাহার করা হলে অন্য চলমান প্রকল্পের মাধ্যমে যশোরের আটটি সেতুর অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলনের উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ কম উচ্চতার সেতু নির্মাণ নিয়ে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। তিনি Desi Media Point-কে জানান, ২০২৪ সালের ২৯ মে হাইকোর্ট এক আদেশে যশোরের সেতুগুলো যথাযথ নীতিমালা মেনে নির্মাণের নির্দেশ দেন। ওই আদেশে সাময়িকভাবে সমস্ত নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার কথাও বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে, ২০২৪ সালের ১১ জুন হাইকোর্ট এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি এবং যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে তাঁরা হাইকোর্টে উপস্থিত হয়ে ছয় মাসের মধ্যে নীতিমালা মেনে সেতু নির্মাণের লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন।

ইকবাল কবির অভিযোগ করেছেন যে, প্রধান প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলী তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। তিনি সরকারের কাছে আদালতের নির্দেশনা ও নীতিমালা মেনে দ্রুত সেতুগুলির কাজ শেষ করে জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবি জানিয়েছেন।

আদালতের নির্দেশনার পর এখনকার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে Desi Media Point এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে পুনরায় কথা বলেছে। তিনি Desi Media Point-কে জানান যে, আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেতুর নকশা সংশোধনের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই এলজিইডির ডিজাইন ইউনিটের প্রকৌশলীরা আটটি সেতু পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেন।

আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হলে সেতু ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ক্রেন ব্যবহার করে সেতুর গার্ডার উত্তোলন করে পিলারের উচ্চতা বাড়িয়ে পুনরায় পাটাতন স্থাপন করা হবে। এমন একটি নকশা প্রণয়নের কাজ বর্তমানে চলছে।

তবে, গত আড়াই বছরে সেতু নির্মাণের ছাড়পত্রের জন্য এলজিইডি থেকে কোনো আবেদন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ খুলনার উপপরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ।

নির্মাণাধীন আটটি সেতু নিয়ে সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা কী, তা জানতে Desi Media Point যশোর জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের চারজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সমস্যার সমাধানে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অপরিহার্য।

এই বিষয়ে যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম Desi Media Point-কে জানান যে, এটা সত্য যে কম উচ্চতায় সেতু নির্মিত হলে নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে। নৌযান চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা নিঃসন্দেহে একটি উত্তম ধারণা। তবে, এই উত্তম ধারণাটি কতটা বাস্তবসম্মত, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, যশোর অঞ্চলের নদীগুলোতে নৌযান চলাচলের বর্তমান বাস্তবতা আছে কিনা, তা যাচাই করে দেখার সুযোগ রয়েছে।

অনিন্দ্য ইসলাম আরও বলেন, একদিকে যেমন সম্পদের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে জনগণের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। সেতুগুলির নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য তিনি যশোরের জেলা প্রশাসক ও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। যে মামলার কারণে নির্মাণ কাজ স্থগিত রয়েছে, সেই মামলার বাদীর সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন এবং তাকে মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন। সকল পক্ষের সমন্বয়ে আইনি জটিলতা নিরসন করে দ্রুততম সময়ে সেতুগুলির নির্মাণ কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।