Wed 5th Aug 2026, 2:54 am

ট্রাম্প প্রশাসনের ৬০ দেশের পণ্যে নতুন শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে মামলা: বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব

ট্রাম্প প্রশাসনের ৬০ দেশের পণ্যে নতুন শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে মামলা: বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব
সোমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি অঙ্গরাজ্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে, যা বাংলাদেশসহ মোট ৬০টি দেশের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করতে পারে। মামলার মূল বিষয়বস্তু হলো, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি তাদের ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে চ্যালেঞ্জ জানানো। এই শুল্ক প্রত্যাহার হলে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কের দায় থেকে মুক্তি মিলবে, যা দেশের রপ্তানি খাতকে সচল করতে সহায়ক হবে। দেশি মিডিয়া পয়েন্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাই মাস থেকে এই নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বহু দেশের পণ্যের ওপর এটি আরোপ করা হয়। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এই দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। মামলার নথিতে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যগুলোর জোট এই সিদ্ধান্তকে ‘খামখেয়ালি, অযৌক্তিক এবং আইনের পরিপন্থী’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই জানান যে, মার্কিন সরকার আইনসম্মত ক্ষমতা প্রয়োগ করেই এই ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ায় মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো চাপে রয়েছে বলে সরকার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে। কুশ দেশাই আরও ব্যাখ্যা করেন যে, যদি কোনো দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা ‘অযৌক্তিক’ এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা ব্যবহার করে জাপান, ব্রাজিল ও তাইওয়ানের মতো বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর এই নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। মূলত জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই আইনটি প্রণীত হয়েছিল। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের (ইউএসটিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই নতুন শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানিকৃত পণ্যের ৯৯.৪ শতাংশের ওপর প্রযোজ্য, যা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আহরিত হবে। মামলার নথিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ শুল্কনীতি চালিয়ে যাওয়ার জন্য জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না।’ নথিতে আরও দাবি করা হয় যে, ইউএসটিআর কর্তৃক আরোপিত শুল্কের পরিধি এতটাই ব্যাপক যে এটি সংস্থাটির নিজস্ব ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি, যে আইনের অধীনে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেটিও কার্যত তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকুল মন্তব্য করেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপিত এই অবৈধ শুল্ক আসলে খেটে খাওয়া পরিবারগুলোর ওপর চাপানো একটি নতুন কর ছাড়া আর কিছুই নয়।’ ওরেগনের অ্যাটর্নি জেনারেল ড্যান রেফিল্ড এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রতিটি আইনি ধাপে পরাজিত হওয়ার পরও ট্রাম্প আবারও কর্মজীবী পরিবার এবং ওরেগনের স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন করে জটিলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।’ ড্যান আরও যোগ করেন, ‘এই অবৈধ শুল্কের প্রকৃত মূল্য বিদেশি সরকার নয়, বরং আমাদেরকেই পরিশোধ করতে হচ্ছে।’ এই নতুন শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে তাদের অসন্তোষ ব্যক্ত করেছে। ব্রাজিল ও জাপান পৃথকভাবে এই পদক্ষেপকে ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং মন্তব্য করেছেন যে, এই শুল্ক ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের একটি অজুহাত’। উল্লেখ্য, বর্তমানে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি শুল্কযুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। কয়েকজন বিশ্লেষক এই প্রশ্ন তুলেছেন যে, জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ মোকাবিলায় কোনো দেশ যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়া কী হবে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্প প্রশাসন যে বাণিজ্যনীতি ঘোষণা করেছে, এই পদক্ষেপ তারই সর্বশেষ সংযোজন। গত বছরের এপ্রিলে ঘোষিত ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘লিবারেশন ডে’ বা ‘স্বাধীনতা দিবস’ শুল্কের অধীনে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর আরোপিত শুল্কের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বাতিল ঘোষিত হয়েছিল। ক্যাথি হোকুল আরও উল্লেখ করেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, আইনকে উপেক্ষা করে এই প্রশাসন এত বিপুল পরিমাণে শুল্ক আরোপ করতে পারে না।’ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর, যেসব প্রতিষ্ঠান পূর্বে এই শুল্ক পরিশোধ করেছিল, মার্কিন সরকারকে তাদের প্রচুর অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হতে হয়েছিল। ট্রাম্প দীর্ঘকাল ধরে এই দাবি করে আসছেন যে, শুল্ক আরোপের মাধ্যমে মার্কিন শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে এবং একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। সুপ্রিম কোর্ট যে শুল্কগুলো বাতিল করেছিল, তার পরিবর্তে বৈশ্বিক সকল আমদানির ওপর একটি সাময়িক ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, যার মেয়াদ গত জুলাই মাসে শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার অভিযোগে বর্তমানে ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র, যার ফলস্বরূপ ভবিষ্যতে আরও নতুন শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।