Fri 31st Jul 2026, 2:26 am

বিকাশের প্রথমার্ধের মুনাফা ৪১২ কোটি টাকা: আর্থিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাইলফলক

বিকাশের প্রথমার্ধের মুনাফা ৪১২ কোটি টাকা: আর্থিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাইলফলক
চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান বিকাশ ৪১২ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। যা গত বছরের একই সময়ের ৩০৭ কোটি টাকার তুলনায় ১০৪ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৪ শতাংশ অধিক। এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বিকাশের আর্থিক সক্ষমতার ধারাবাহিক উন্নতির নির্দেশক।

বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকাশ পরিচালিত হয়। বিকাশের এই শক্তিশালী আর্থিক পারফরম্যান্স ব্র্যাক ব্যাংকের সামগ্রিক মুনাফাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্র্যাক ব্যাংকের হাতে বিকাশের ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা থাকায়, বিকাশের অর্জিত মুনাফার একটি বড় অংশ সরাসরি ব্যাংকটির আয়ে যুক্ত হয়, যা চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্র্যাক ব্যাংককে ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকার রেকর্ড মুনাফা অর্জনে সহায়তা করেছে।

বিকাশের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন মাস) প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২২৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। গত বছরের একই প্রান্তিকে এই মুনাফার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা, যা বর্তমান বছরের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা তুলে ধরে।

আর্থিক প্রতিবেদন গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিকাশের মোট রাজস্ব আয় ছিল ৪ হাজার ১৭২ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের ৩ হাজার ৬৩১ কোটি টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এই সময়ে বিভিন্ন সেবার বিপরীতে বিকাশের প্রত্যক্ষ খরচ হয়েছে ২ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। এই প্রত্যক্ষ খরচ বাদ দেওয়ার পর চলতি বছরের প্রথমার্ধে মোট মুনাফা ১ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা গত বছর ছিল ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। পরিচালন, প্রশাসনিক ও বিপণন ব্যয় সমন্বয়ের পর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৪৩৭ কোটি টাকা, যা গত বছরের ৩১৯ কোটি টাকার তুলনায় বেশি। পরিচালন মুনাফার পাশাপাশি, ব্যাংকে গচ্ছিত আমানত থেকে বিকাশ আরও ১৫৯ কোটি টাকা সুদ বাবদ আয় করেছে। এই সমস্ত আয় থেকে কর্মীদের তহবিল ও সরকারের প্রযোজ্য কর পরিশোধের পর বিকাশের চূড়ান্ত নিট মুনাফা প্রায় ৪১২ কোটি টাকায় স্থিত হয়েছে।

গত ৩০ জুন, ২০২৪ তারিখের হিসাব অনুযায়ী, বিকাশের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৭ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি, ই-মানি ইস্যু এবং গ্রাহক আমানতের ধারাবাহিক বৃদ্ধির ফলে বিকাশের ‘ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্টে’ জমা স্থিতির পরিমাণ বেড়ে ১২ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা হয়েছে, যা গ্রাহকদের আস্থা ও পরিষেবার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা প্রতিফলিত করে।

ব্র্যাক ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি ইন মোশনের যৌথ উদ্যোগে ২০১১ সালের ২১ জুলাই যাত্রা শুরু করে বিকাশ, প্রাথমিকভাবে মাত্র ৩৭ জন কর্মী ও ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট, সেন্ড মানি—এই তিনটি সেবার মাধ্যমে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ নিবন্ধিত গ্রাহক নিয়ে এটি দেশের বৃহত্তম মোবাইল আর্থিক পরিষেবা পরিবারে পরিণত হয়েছে। শুরুর বছরগুলোতে লোকসানের সম্মুখীন হলেও, বিকাশ এখন একটি বৃহৎ মুনাফাকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। গত বছর দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এটি শীর্ষ ১০ মুনাফাকারী প্রতিষ্ঠানের অন্যতম ছিল। দেশীয় জনবলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্বব্যাংকের আইএফসি, যুক্তরাষ্ট্রের গেটস ফাউন্ডেশন, চীনের আলিবাবা গ্রুপের অ্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল এবং জাপানের সফটব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিকাশে তাদের সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার।

২০১১ সালে যখন এই প্রযুক্তি-নির্ভর আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম শুরু করে, তখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদান করা ছিল এক অচিন্তনীয় ধারণা। ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে, অর্থ প্রেরণের প্রধান মাধ্যম ছিল কুরিয়ার সেবা বা ডাকঘর, যেখানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় লাগত। এছাড়া, সরকারি বিল পরিশোধ বা ব্যাংকে আমানত জমা দিতে মানুষকে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হতো। বিকাশ এই প্রথাগত চিত্র সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিয়েছে। বর্তমানে, বিকাশের অ্যাপে ২০০টিরও বেশি সেবা পাওয়া যায়, যা এটিকে দেশের একটি প্রধান 'সুপার অ্যাপ'-এ পরিণত করেছে। শুধু আর্থিক লেনদেন নয়, অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গ্রাহকরা তাৎক্ষণিক অতি ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। এই ঋণসেবা প্রবর্তনের পর থেকে ৩৫ লাখ গ্রাহক এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করেছেন, যেখানে গড়ে প্রতিদিন এক লাখ মানুষ ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। পাশাপাশি, বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে সঞ্চয় করার সুযোগও রয়েছে। সার্বিকভাবে, বিকাশ এখন দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিকাশের অন্যতম প্রধান সাফল্য হলো ব্যাংকিং সেবাকে সমাজের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলজুড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার এজেন্ট ‘হিউম্যান এটিএম’ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিকাশের মাধ্যমে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ এবং শহরাঞ্চলের অর্থ দ্রুত ও সহজে গ্রামে পৌঁছানোয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন গতি এসেছে। তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা, যাদের ৬০ শতাংশ নারী, এখন বিকাশের মাধ্যমে তাদের বেতন গ্রহণ করছেন। এছাড়াও, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতাধীন সরকারি ভাতাসমূহও বিকাশের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে, প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহক বিকাশের মাধ্যমে ডিপিএস এবং সঞ্চয় হিসাব খুলেছেন, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রমাণ করে।