Wed 22nd Jul 2026, 3:07 am

বিকাশের ১৫ বছর: ফিনটেক বিপ্লব ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন দিগন্ত

বিকাশের ১৫ বছর: ফিনটেক বিপ্লব ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন দিগন্ত
মাত্র পনেরো বছরের যাত্রায় প্রায় ৮ কোটি গ্রাহকের মাইলফলক অর্জন, প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ২৭৭টি লেনদেন ও প্রতি মিনিটে ২ কোটি টাকার অধিক অর্থের আদান-প্রদান এবং বিদায়ী আর্থিক বছরে ৬৬১ কোটি টাকার নিট মুনাফা—এই চিত্র যেন এক অবিশ্বাস্য ফিনটেক বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি। এটি কোনো অলীক গল্প নয়, বরং মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’-এর হাত ধরে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ঘটে যাওয়া এক বাস্তব ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের উপাখ্যান।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিকাশের এই বিশাল গ্রাহকভিত্তি দেশের কোনো একক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি। দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকটির গ্রাহক সংখ্যা যেখানে তিন কোটির কিছু বেশি, সেখানে বিকাশের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৮ কোটি। এমনকি গত জুন মাস পর্যন্ত দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের ৮ কোটি ৬৩ লাখ গ্রাহক থাকলেও, ইউনিক গ্রাহক হিসেবে বিকাশের অবস্থান সুসংহত। সাধারণত, মোবাইল ফোনে একজন ব্যবহারকারী একাধিক সিম ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু বিকাশের নীতি অনুযায়ী একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একটিই হিসাব খোলা যায়। এই অনন্য বৈশিষ্ট্য বিকাশের গ্রাহকভিত্তিকে আরও স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, যা ইউনিক গ্রাহক পরিসংখ্যানে গ্রামীণফোনকেও ছাড়িয়ে গেছে।

বিকাশ গ্রাহকদের জন্য একটি একক অ্যাপের মাধ্যমে শত শত আর্থিক লেনদেনের সুবিধা উন্মুক্ত করেছে। যেখানে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা নথিপত্রের প্রয়োজন হয়, সেখানে বিকাশে হিসাব খুলতে কোনো মাশুল বা জটিলতার সম্মুখীন হতে হয় না। একটি সাধারণ স্মার্টফোন অথবা এমনকি একটি বাটন ফোনই হিসাব খোলার জন্য যথেষ্ট। এর ফলস্বরূপ, শহর-গ্রাম, ধনী-গরিব, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষ বিকাশের গ্রাহক হতে পেরেছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নগদ অর্থের একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে মোবাইল ফোন ও বিকাশ এখন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

২০১১ সালে এই প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরুর সময় মোবাইল ফোনে টাকা পাঠানোর ধারণাটি ছিল অনেকটাই অচিন্তনীয়। সে সময় ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে টাকা প্রেরণের প্রধান মাধ্যম ছিল কুরিয়ার সেবা বা ডাকঘর, যার মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা পৌঁছাতে কয়েক দিন লেগে যেত। এছাড়াও, সরকারি বিভিন্ন সেবার বিল পরিশোধ করতে বা ব্যাংকে আমানত জমা দিতে মানুষকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হতো। বিকাশ এই পুরনো চিত্রকে সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দিয়েছে। বর্তমানে বিকাশের অ্যাপে ২০০টিরও বেশি সেবা পাওয়া যাচ্ছে, যা এটিকে দেশের প্রধান ‘সুপার অ্যাপ’-এ পরিণত করেছে। কেবল আর্থিক লেনদেনই নয়, এই অ্যাপের মাধ্যমে নির্বাচিত গ্রাহকরা তাৎক্ষণিকভাবে অতি ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করতে পারছেন। এই ঋণসেবা প্রবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ গ্রাহক প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করেছেন, এবং প্রতিদিন গড়ে এক লাখ মানুষ ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। পাশাপাশি, গ্রাহকরা বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমেই সঞ্চয় করতে পারছেন। সব মিলিয়ে, বিকাশ বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান, আনিস এ খান, Desi Media Point-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিকাশের এই প্রভাব প্রসঙ্গে বলেন, "একজন রিকশাচালক এখন সারাদিনের পরিশ্রমের পর সন্ধ্যায় অনায়াসে তাঁর পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে পারছেন। এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে। নগদ অর্থের চাহিদা পূরণ করে বিকাশ আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে, যা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি যুগান্তকারী ঘটনা।"

তিনি আরও যোগ করেন, "বিকাশ একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলস্বরূপ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট হচ্ছে এবং বাংলাদেশের মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। আমি আশা করি, আগামী দিনে বিকাশের মাধ্যমে আরও জনকল্যাণমূলক সুবিধা উন্মোচিত হবে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতিকে আরও উন্নত করবে।"

প্রতিষ্ঠানটির গত পনেরো বছরের অর্জন নিয়ে বিকাশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল কাদীর Desi Media Point-কে বলেন, "বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে মানুষ এখন তাদের প্রয়োজনীয় ডিজিটাল লেনদেন বিকাশের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারছেন। বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় এনে দৈনন্দিন লেনদেনে সক্ষম ও স্বাধীন করে তোলাই বিকাশের সবচেয়ে বড় সাফল্য।"

কামাল কাদীর আরও উল্লেখ করেন, "নগদবিহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বিকাশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্মিলিতভাবে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ইকোসিস্টেম নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর ফলস্বরূপ, সকল শ্রেণির গ্রাহকদের লেনদেন ব্যবস্থাপনায় বিকাশ এখন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।"

প্রতিষ্ঠানটির সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়, ব্র্যাক ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি ইন মোশনের যৌথ উদ্যোগে ২০১১ সালের ২১ জুলাই বিকাশ তার কার্যক্রম শুরু করে। সূচনা লগ্নে মাত্র ৩৭ জন কর্মী এবং ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট ও সেন্ড মানি—এই তিনটি সেবার মাধ্যমে এর পথচলা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এর কর্মী সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি এবং প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ নিবন্ধিত গ্রাহক নিয়ে এটি একটি বিশাল পরিবারে পরিণত হয়েছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। শুরুর দিকের কয়েক বছর লোকসানের মধ্যে থাকলেও, বিকাশ এখন একটি বৃহৎ মুনাফাকারী প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। গত বছর দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মুনাফা অর্জনকারী শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিকাশ অন্যতম।

আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকাশের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ব্যাংকিং সেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার এজেন্ট ‘হিউম্যান এটিএম’ হিসেবে কাজ করছেন, যা সেবাকে আরও সহজলভ্য করেছে। বিকাশের মাধ্যমে প্রবাসীদের রেমিটেন্স এবং শহুরে অর্থপ্রবাহ সহজে গ্রামীণ এলাকায় পৌঁছানোর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি এসেছে। তৈরি পোশাক শিল্পের ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা, যাঁদের ৬০ শতাংশই নারী, এখন বিকাশের মাধ্যমে তাঁদের বেতন পাচ্ছেন। এছাড়াও, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতাধীন সরকারি ভাতাও বিকাশের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহক বিকাশের মাধ্যমে ডিপিএস (ডিপোজিট পেনশন স্কিম) এবং সঞ্চয় হিসাব খুলেছেন।

দেশীয় জনবলের ওপর নির্ভরশীল এই প্রতিষ্ঠানটি এখন একটি আন্তর্জাতিক মানের সংস্থায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠান আইএফসি, যুক্তরাষ্ট্রের গেটস ফাউন্ডেশন, চীনের আলিবাবা গ্রুপের মালিকানাধীন অ্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল এবং জাপানের সফটব্যাংক—এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিকাশের মালিকানায় যুক্ত। বিকাশে তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার।

আর্থিক খাতে বিকাশের এই অন্তর্ভুক্তির প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর Desi Media Point-কে বলেন, "গত পনেরো বছরে মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) খাতে বিকাশ অত্যন্ত চমৎকার কাজ করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বিকাশ যতটা বিকশিত হয়েছে, পুরো খাতটি সেভাবে বিকশিত হয়নি। বিকাশের মতো একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি আরও ফলপ্রসূ হতো যদি আমরা বিকাশের মতো আরও চার-পাঁচটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান এই খাতে গড়ে তুলতে পারতাম। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে তা সম্ভব হয়নি। বিকাশের পনেরো বছরের সাফল্যের পাশাপাশি একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এখনও এই খাতের লেনদেনের সিংহভাগ এজেন্ট-নির্ভর ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট। বিকাশের এখন উচিত তাদের লেনদেন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে মার্চেন্ট অ্যাকুইজিশনে রূপান্তরিত করা, যাতে নগদ লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।"