Sun 13th Sep 2026, 2:20 am

সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ: সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড অতিক্রম, উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ: সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড অতিক্রম, উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে এই প্রথম পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণ সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করলো। গত এক বছরে এই ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঋণ বিষয়ক এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, এর পূর্ববর্তী অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন আরও জানায় যে, বিগত অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সঞ্চয়পত্র খাত থেকে সরকার মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে। এই সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। তবে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা বেশি ঋণ গ্রহণের ফলে অর্থবছর শেষে সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

সরকারের ব্যয় কাঠামোর দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঋণ পরিশোধ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, "বর্তমানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, পূর্বের ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা দেশকে একটি বিপজ্জনক ঋণজালে আটকা পড়ার ঝুঁকিতে ফেলছে।" একই সময়ে, বৈদেশিক ঋণের স্থিতিও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চের শেষে সরকারের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৫ টাকা ধরে হিসাব করলে এর দেশীয় মূল্য ১১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। যদিও জুন মাস পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি, মার্চ মাসের তথ্য বিবেচনায় বলা যায়, সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বর্তমানে প্রায় সমান্তরাল। উভয় প্রকার ঋণ মিলিয়ে সরকারের কাঁধে এখন প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকার বিশাল ঋণের বোঝা। ক্রমবর্ধমান এই ঋণ পরিমাণের সাথে সাথে সুদের চাপও সমানতালে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় প্রকার ঋণের সুদ পরিশোধ বর্তমানে সরকারের অন্যতম প্রধান ব্যয় খাতে পরিণত হয়েছে। এই সুদ পরিশোধের জন্য সরকারকে প্রতি বাজেটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান পুনরায় উল্লেখ করেন, "আমাদের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় ঋণের বোঝা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলস্বরূপ সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে ঋণ পরিশোধ সরকারের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যয় খাতে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, পূর্বের ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন করে ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন হচ্ছে, যা দেশকে এক গুরুতর ঋণ ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি বিদেশি ঋণের সুদহারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।"

তিনি আরও যোগ করেন, "অনেক বড় ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হতে চলেছে, যা ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপকে আরও বৃদ্ধি করবে। এই চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে অবশ্যই ব্যয়ের অপচয় হ্রাস করতে হবে এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।"

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত অর্থবছরে সরকার শুধু ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেই ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের ৭৭ হাজার ১০৮ কোটি টাকার তুলনায় ৫৪ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা বেশি। অন্যদিকে, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাত থেকে সরকার গত অর্থবছরে মাত্র ১৯২ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছে, যেখানে পূর্ববর্তী অর্থবছরে এই খাত থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল ৪২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা।

দেশের অধিকাংশ ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) কয়েক বছর ধরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মারাত্মক খারাপ অবস্থায় রয়েছে। ফলস্বরূপ, এই প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়ন বা বন্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ এনবিএফআই-এর অত্যন্ত নাজুক অবস্থার কারণে সরকার এই খাত থেকে প্রত্যাশিত ঋণ নিতে পারেনি। এর ফলস্বরূপ, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ঋণ ব্যাংক খাত থেকে গ্রহণ করতে হয়েছে।

বিগত অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, আর ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল।

গত অর্থবছরে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের মোট স্থিতির মধ্যে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে সরকারের পুঞ্জীভূত ব্যাংকঋণ ২৪ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতে এই ঋণের স্থিতি প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার কর্তৃক গৃহীত ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যাংক খাত আবির্ভূত হয়েছে। পূর্বে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ সংগ্রহ করত, কিন্তু গত কয়েক বছরে এই প্রবণতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে সরকার সঞ্চয়পত্র খাত থেকে প্রত্যাশিত ঋণ সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছে।