Wed 22nd Jul 2026, 3:02 am

প্রবাসী আয়ের ৬২ শতাংশের মূল উৎস পাঁচটি দেশ, সৌদি আরব শীর্ষে

প্রবাসী আয়ের ৬২ শতাংশের মূল উৎস পাঁচটি দেশ, সৌদি আরব শীর্ষে
বিদায়ী অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর প্রথম এগারো মাসে (জুলাই-মে) দেশে আগত মোট রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রায় ৬২ শতাংশই এসেছে মাত্র পাঁচটি দেশ থেকে। এই দেশগুলো হলো: সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র। মূলত এই দেশগুলিতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী ও অভিবাসী বসবাস করার ফলেই প্রবাসী আয়ের একটি বিশাল অংশ এই উৎসগুলি থেকে প্রবাহমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরের প্রথম এগারো মাসে বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত প্রবাসীরা মোট ৩,২৭৭ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে শীর্ষোক্ত পাঁচটি দেশ থেকেই এসেছে ২,০২৫ কোটি ডলার, যা মোট আয়ের প্রায় ৬২ শতাংশ।

বিশ্লেষণকৃত উপাত্ত অনুযায়ী, উল্লিখিত সময়ে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ৫২৭.৯৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা মোট আয়ের ১৬ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৬৮.৫৮ কোটি ডলার এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে। এই তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ৪২৭.৮২ কোটি ডলার নিয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে; মালয়েশিয়া ৩২২ কোটি ডলার নিয়ে চতুর্থ এবং যুক্তরাষ্ট্র ২৭৮.৯৬ কোটি ডলার নিয়ে পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছে।

উল্লিখিত দেশগুলো ছাড়াও ওমান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর ও ইতালি থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবাসী আয় প্রাপ্ত হয়েছে। এই ছয়টি দেশ থেকে আলোচ্য এগারো মাসে প্রায় ৮৮৯ কোটি ডলার এসেছে, যা মোট প্রবাসী আয়ের ২৭ শতাংশের সমতুল্য। ফলস্বরূপ, মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে এই এগারোটি দেশ থেকে।

কেবল মে মাসের হিসাবেও রেমিট্যান্স-প্রবাহ ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ওই একক মাসে প্রবাসীরা মোট ৩৪৪.২৫ কোটি ডলার প্রেরণ করেছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৫.০৯ কোটি ডলার যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৪.৬৫ কোটি ডলার এসেছে সৌদি আরব থেকে এবং ৪৬.৮১ কোটি ডলার নিয়ে ইউএই তৃতীয় স্থানে ছিল।

গত অর্থবছরের প্রথম এগারো মাসের মধ্যে দশ মাসই প্রবাসী আয়ের একক শীর্ষ উৎস হিসেবে সৌদি আরব তার অবস্থান বজায় রেখেছিল। তবে মে মাসে যুক্তরাজ্য সৌদি আরবকে ছাড়িয়ে যায়। অর্থবছরের শুরুতে, অর্থাৎ গত বছরের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্য থেকে ২৮.২৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। পরবর্তীতে তা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে মে মাসে ১৩০ শতাংশ বেড়ে ৬৫ কোটি ডলারে উপনীত হয়। জুন মাসের রেমিট্যান্স সংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো প্রকাশ করেনি।

সরকার প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আয় প্রেরণে উৎসাহিত করছে। এই উদ্দেশ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠালে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হচ্ছে। এটি হুন্ডির মতো অবৈধ পথগুলিকে নিরুৎসাহিত করছে। একই সাথে, পূর্বের তুলনায় ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণের প্রক্রিয়াও সরলীকরণ করা হয়েছে। এর ফলস্বরূপ প্রবাসী আয়প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

তবে আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন যে, দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় তিন-পঞ্চমাংশ (৬০%) মাত্র পাঁচটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়া অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সংবেদনশীল। তাঁদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে অদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যাধিক্যের কারণে সেখানকার রেমিট্যান্স প্রবাহ সর্বদা স্থিতিশীল থাকে না। অপরদিকে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় সেখান থেকে আয়ের প্রবাহ অধিক স্থিতিশীল।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, এই প্রধান পাঁচটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অথবা শ্রমবাজারে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের ওপর পড়তে পারে, যা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে প্রভাবিত করবে। অতএব, নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর বিদ্যমান নির্ভরতা হ্রাস করে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের নতুন শ্রমবাজারগুলিতে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা অপরিহার্য।