Sun 27th Sep 2026, 4:27 am

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: পণ্য পরিবহন ভাড়ায় লাগামহীন উল্লম্ফন

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: পণ্য পরিবহন ভাড়ায় লাগামহীন উল্লম্ফন
লিটারপ্রতি ২০ টাকা ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পণ্য পরিবহন খাতে ব্যাপক ভাড়া বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্যবাহী ট্রাকের প্রতিটি ট্রিপের ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং কিছু নির্দিষ্ট রুটে এই বৃদ্ধি ১০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পরিবহন ব্যয়ের এই ক্রমবর্ধমান চাপ বর্তমানে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে বিস্তার লাভ করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজধানীর কাঁচাবাজারেও, যেখানে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশ কিছু সবজির দাম প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এটি জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রাথমিক ধাক্কার পর বাজারে একটি দ্বিতীয় দফার চাপ তৈরি করেছে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের খুচরা মূল্য লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৩৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে, কেরোসিনের মূল্য ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেনের ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোলের ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। জ্বালানি তেলের এই নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পরপরই পণ্য পরিবহন খাতে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ নিয়ে তীব্র দর কষাকষি শুরু হয়েছে।

বিস্তারিত তথ্যে দেখা যায়, বেনাপোল থেকে ১৫ টন পণ্য ঢাকায় পরিবহনের জন্য পূর্বের ট্রাকভাড়া ছিল ২১-২২ হাজার টাকা, যা বর্তমানে ২৫-২৬ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। চট্টগ্রাম রুটে এই ভাড়া ২৭-২৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩৪-৩৫ হাজার টাকা এবং নারায়ণগঞ্জ রুটে ২২-২৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৭-২৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ হলো, দূরত্ব এবং গন্তব্যের ভিন্নতা অনুযায়ী প্রতিটি ট্রিপে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা বহন করতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, কিছু নির্দিষ্ট রুটে এই ভাড়া বৃদ্ধি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

বেনাপোল প্রতিনিধি কাজী শাহজাহান সবুজ-এর তথ্য অনুযায়ী, ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে আমদানিকারক ও ট্রাকচালকদের মধ্যে কেবল দর কষাকষি নয়, ক্ষেত্রবিশেষে তীব্র বাদানুবাদও দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাক এই বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত থাকায় পরিবহন ব্যয়ের এই পরিবর্তন অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবহন মালিকদের মতে, একটি ট্রাক পরিচালনার প্রধান ব্যয় হলো জ্বালানি। এর পাশাপাশি টায়ার, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, টোল এবং ফেরি ভাড়াও যুক্ত হয়। উপরন্তু, অনেক ট্রাককে পণ্য সরবরাহ শেষে খালি অবস্থায় ফিরতে হয়, যা পরিচালন ব্যয় আরও বাড়ায়। ফলস্বরূপ, জ্বালানির বর্ধিত মূল্য এবং খালি ফেরার পরিচালন ব্যয়—উভয় দিক থেকেই পরিবহন খরচের উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর খান উল্লেখ করেন যে, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান পরিচালনার মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই ডিজেলের উপর নির্ভরশীল। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য আনুষঙ্গিক পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। তবে, সেই অনুপাতে ভাড়া সমন্বয় না হওয়ায় মালিকরা গুরুতর আর্থিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন। তিনি আরও জানান, পণ্য পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণে কিলোমিটার এবং পণ্যের ওজনের ভিত্তিতে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। এই নীতিমালায় জ্বালানির মূল্য পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া সমন্বয়ের একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।

পণ্য পরিবহনের এই বর্ধিত ভাড়ার চাপ ইতিমধ্যে রাজধানীর কাঁচাবাজারেও স্পষ্ট প্রতীয়মান। গতকাল কাওরান বাজারে পরিচালিত অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পটোল, ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, ঝিঙা, ধুন্দল এবং করলাসহ বেশ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির দাম প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানীতে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয়। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে এই অতিরিক্ত খরচ উৎপাদনকারী (খেত) থেকে আড়তদার, আড়তদার থেকে পাইকার এবং চূড়ান্তভাবে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত ধাপে ধাপে বন্টন হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার উপর আর্থিক বোঝা হিসেবে বর্তায়।

কেবল অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন নয়, আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রেও সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে সংযুক্ত ২৩টি বেসরকারি আইসিডি (অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপো) এবং অফডক প্রতিষ্ঠান পণ্য পরিবহন ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বেশ কিছু চার্জ ৯.৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে, বন্দর থেকে পণ্য খালাস হওয়ার আগেই ট্রাকভাড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত হ্যান্ডলিং এবং অন্যান্য লজিস্টিক ব্যয় যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমেদ উল্লেখ করেন যে, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং প্রাইম মুভার পরিচালনার ব্যয়ের সিংহভাগ জ্বালানি তেলের উপর নির্ভরশীল। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব উৎপাদন, সরবরাহ এবং বাজারজাতকরণ ব্যয়ের উপর পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ভোক্তার উপর স্থানান্তরিত হতে পারে।

তিনি আরও জানান, দেশের মোট রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং আমদানি কন্টেইনারের ২০-২৩ শতাংশ বেসরকারি অফডকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলস্বরূপ, ট্রাকভাড়ার ক্রমবর্ধমান চাপের সাথে এখন লজিস্টিক ব্যয়ের একটি নতুন মাত্রার চাপ যুক্ত হয়েছে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাকভাড়া প্রতিটি ট্রিপে ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। এবার ডিজেলের মূল্য নতুন করে ২০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায়, উল্লিখিত রুটসহ দেশের অন্যান্য পণ্য পরিবহন পথেও ভাড়া সমন্বয়ের জন্য ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।

পরিবহন মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি হলো, গণপরিবহনের ন্যায় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও একটি সুনির্দিষ্ট ভাড়া কাঠামো প্রণয়ন করা হোক। তারা মনে করেন যে, কিলোমিটার, পণ্যের ওজন এবং গাড়ির ধরন বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণ করা হলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর প্রতিবার নতুন করে দর কষাকষির প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে।

সুতরাং, ডিজেলের বর্ধিত মূল্য শুধু ট্রাক ভাড়ার হিসাবই পরিবর্তন করছে না, বরং পণ্য বাজারে পৌঁছানোর সামগ্রিক ব্যয়কেও প্রভাবিত করছে। বন্দর থেকে শুরু করে বাজার পর্যন্ত পণ্য সরবরাহের প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হওয়ায়, এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার উপর আরোপিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।