Sat 26th Sep 2026, 10:56 am

১৯তম বিজেএস প্রিলিমিনারি: সুসংগঠিত প্রস্তুতি ও সাফল্যের কৌশল

১৯তম বিজেএস প্রিলিমিনারি: সুসংগঠিত প্রস্তুতি ও সাফল্যের কৌশল
১৯তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার আবেদন প্রক্রিয়া সম্প্রতি সমাপ্ত হয়েছে। সহকারী জজ (সিভিল জজ) পদে এবার ২৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে, যা একটি প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু সম্মানজনক সুযোগ। এই দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ হলো ১০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, যেখানে ১০০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন থাকবে। ৫০ নম্বর পেলেই পাস হিসেবে বিবেচিত হবেন, তবে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কাটা হবে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সুতরাং, যেসব প্রার্থী ১৯তম বিজেএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের হাতে থাকা মূল্যবান সময় পরিকল্পিত ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। বিজেএস প্রিলিমিনারিতে শুধু প্রচুর পড়লেই হবে না; বরং কী পড়তে হবে, কোন বিষয়ে কতটা মনোযোগ দিতে হবে এবং কীভাবে পড়া বিষয়গুলো মনে রাখা যাবে, তা সামগ্রিক প্রস্তুতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সিলেবাসকে প্রাধান্য দিন, বই নির্বাচন পরে—

প্রস্তুতির শুরুতেই সর্বশেষ প্রকাশিত সিলেবাসটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। অনেক পরীক্ষার্থী একসঙ্গে একাধিক গাইড, নোট, কোচিংয়ের হ্যান্ডনোট এবং বিভিন্ন অনলাইন উপকরণ সংগ্রহ করে থাকেন। এতে পড়ার পরিধি বাড়লেও অনেক সময় মূল প্রস্তুতিতে ফোকাস ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

একটি নির্দিষ্ট নির্ভরযোগ্য মূল বই বা উৎসকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী নোট ও প্রশ্নব্যাংক ব্যবহার করা অধিক ফলপ্রসূ। নিজের প্রস্তুতির একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে কোন বিষয় এখনো পড়া হয়নি, কোনটি একবার পড়া হয়েছে এবং কোনটি ভালোভাবে আয়ত্ত হয়েছে, তা চিহ্নিত করা থাকবে।

প্রস্তুতির প্রথম দিকেই একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে, প্রিলিমিনারি পাস করাই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। বিজেএসের লিখিত পরীক্ষা ১০০০ নম্বরের ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হয়। তাই প্রিলিমিনারির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কেবল এমসিকিউর উত্তর মুখস্থ না করে বিষয়গুলো বুঝে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

মূল আইনকে সামনে রেখে আইন অধ্যয়ন করুন—

বিজেএসের প্রস্তুতিতে আইন অংশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইন, সংবিধান, তামাদি আইন, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনসহ সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।

তবে আইন অধ্যয়নের সময় কেবল গাইড বা নোটের ওপর নির্ভর না করে বার অ্যাক্ট বা মূল আইন সামনে রেখে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

কোনো ধারা পড়ার সময় কেবল ধারার নম্বর মুখস্থ করলে চলবে না। জানতে হবে—ধারাটিতে কী বলা হয়েছে, কখন তা প্রযোজ্য, এর ব্যতিক্রম কী, সংশ্লিষ্ট অন্য ধারা কোনটি এবং বাস্তব ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ কীভাবে হয়।

কারণ, এমসিকিউতে প্রশ্ন সব সময় সরাসরি আসে না। প্রায়শই একটি ঘটনা বা পরিস্থিতি বর্ণনা করে জানতে চাওয়া হয়, সেখানে কোন বিধান প্রযোজ্য। তাই ধারার ভাষা এবং এর প্রায়োগিক দিক—উভয়ই গভীরভাবে বুঝতে হবে।

বিশেষ করে অপরাধসংক্রান্ত আইন অধ্যয়নের সময় অপরাধের সংজ্ঞা, উপাদান, শাস্তি, আমলযোগ্যতা, জামিনযোগ্যতা এবং বিচারিক এখতিয়ার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখা আবশ্যক। একইভাবে দেওয়ানি আইনের ক্ষেত্রে এখতিয়ার, তামাদি, ডিক্রি, আপিল, রিভিশন, প্রতিকার ও সংশ্লিষ্ট সময়সীমা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়তে হবে।

বিশেষ আইন অধ্যয়নের সহজ কৌশল—

বিশেষ আইনগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিটি আইন একই গভীরতায় পড়ার প্রয়োজন নেই। পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ ও বিষয়গুলো চিহ্নিত করা যেতে পারে।

যেসব ধারায় অপরাধ, শাস্তি, আদালত, এখতিয়ার, আমলযোগ্যতা, জামিন, সময়সীমা বা নির্দিষ্ট দিনের কথা বলা আছে, সেগুলো আলাদা করে নোট করে রাখলে পরে দ্রুত পুনরালোচনা করা সহজ হবে।

একই ধরনের দুটি আইনের বিধানের মধ্যে পার্থক্যও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অনেক সময় পরীক্ষায় কাছাকাছি দুটি বিধান দিয়ে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তাই শুধু ‘কোন আইনে কী আছে’ তা জানলেই হবে না; ‘কোন আইনে কী নেই’ সে সম্পর্কেও অবগত থাকা দরকার।

সংবিধান: কেবল অনুচ্ছেদ মুখস্থ নয়—

সংবিধানের প্রস্তুতিতে অনেকেই অনুচ্ছেদের নম্বর মুখস্থ করার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। অনুচ্ছেদের নম্বর জানা প্রয়োজন; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সংশ্লিষ্ট বিধানটি গভীরভাবে অনুধাবন করা।

সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস, রাষ্ট্রের মূলনীতি, মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা, জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

বিভিন্ন সংশোধনী সম্পর্কেও ধারণা রাখা আবশ্যক। কোন সংশোধনীর মাধ্যমে কী পরিবর্তন এসেছে—এ ধরনের তথ্য এমসিকিউর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ রায় পর্যালোচনা করুন—

সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক রায়গুলোও প্রস্তুতির অংশ হওয়া উচিত। সব রায়ের বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোতে কী প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল, আদালত কী নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সেই নীতির গুরুত্ব কী—এগুলো সংক্ষেপে জানা দরকার।

এই অংশের জন্য একটি ছোট নোট তৈরি করা যেতে পারে। মামলার নাম, মূল আইনগত প্রশ্ন এবং আদালতের সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বিষয় লিখে রাখলে পরবর্তীতে দ্রুত রিভিশন দেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলা ও ইংরেজিকে অবহেলা করবেন না—

আইন বিষয়কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বাংলা ও ইংরেজির প্রস্তুতি শেষ মুহূর্তের জন্য ফেলে রাখা ঠিক হবে না। প্রতিদিন অল্প সময় করে হলেও এই দুটি বিষয়ে নিয়মিত চর্চা করা উচিত।

বাংলায় ব্যাকরণের প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, সমাস, কারক, সন্ধি, বানান, সমার্থক ও বিপরীতার্থক শব্দ, বাগধারা ইত্যাদি নিয়মিত অনুশীলন করা দরকার। সাহিত্য অংশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কবি-সাহিত্যিক, তাঁদের প্রধান রচনা, ছদ্মনাম, উপাধি ও উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।

ইংরেজির ক্ষেত্রে Vocabulary, Preposition, Correction, Idioms and Phrases, Subject-Verb Agreement এবং গুরুত্বপূর্ণ grammatical rules চর্চা করতে হবে। প্রতিদিন নতুন শব্দ শেখার পাশাপাশি পূর্বের শেখা শব্দগুলোও নিয়মিত পুনরালোচনা করা জরুরি।

সাধারণ জ্ঞান, গণিত ও বুদ্ধিমত্তা: নিয়মিত অনুশীলন

বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির জন্য শুধু সাম্প্রতিক ঘটনা পড়লেই হবে না। বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিচার বিভাগের ইতিহাস সম্পর্কে মৌলিক ও গভীর ধারণা থাকা আবশ্যক।

গণিতের ক্ষেত্রে পাটিগণিতের মৌলিক হিসাব, শতকরা, অনুপাত, লাভ-ক্ষতি, গড়, সুদ, সময়-দূরত্ব ও প্রয়োজনীয় বীজগণিতের সূত্রাবলি নিয়মিত অনুশীলন করা যেতে পারে।

বুদ্ধিমত্তার প্রশ্নের জন্য নিয়মিত মডেল প্রশ্ন সমাধান করা অপরিহার্য। প্রথম দিকে যে প্রশ্নে বেশি সময় লাগে, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সেটিই পরবর্তীতে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হয়।

সবশেষে প্রস্তুতির সময় মনে রাখতে হবে—বিজেএস প্রিলিমিনারি কেবল বেশি পড়ার পরীক্ষা নয়। এটি সঠিক বিষয়বস্তু নির্বাচন করে পড়া, পড়া বিষয় বারবার মনে করা এবং প্রয়োজনের সময় তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করার পরীক্ষা। তাই এখন থেকে যতটা সম্ভব পরিকল্পিত ও কৌশলী প্রস্তুতি নেওয়াই সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সোপান।