Sat 19th Sep 2026, 2:58 pm

মেটার স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার করে নারীদের গোপনে ভিডিও ধারণ: ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও আইনি প্রশ্ন

মেটার স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার করে নারীদের গোপনে ভিডিও ধারণ: ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও আইনি প্রশ্ন
মেটার ‘রে-ব্যান মেটা’ স্মার্ট চশমার অপব্যবহার করে জনসম্মুখে অপরিচিত নারীদের অজ্ঞাতসারে গোপনে ভিডিও ধারণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করার গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। এই ঘটনাগুলি জনপরিসরে নারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মতি ও সুরক্ষার বিষয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, ভারতে সংঘটিত একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মেটার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট-এর (বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনের এক সন্ধ্যায় ভারতের কলকাতার ৩৫ বছর বয়সী অধ্যাপক ইয়ামিনি বাড়ি ফেরার পথে একজন অপরিচিত ব্যক্তির মুখোমুখি হন। রাত আনুমানিক সোয়া আটটার দিকে অপেক্ষাকৃত নির্জন একটি এলাকায় সেই ব্যক্তি তাকে থামিয়ে জানান যে দূর থেকে তাকে 'কিউট' মনে হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত এড়াতে ইয়ামিনি বিনীতভাবে উত্তর দিয়ে চলে যান। সেই মুহূর্তে তিনি অবগত ছিলেন না যে, ওই ব্যক্তি মেটার স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে তাদের এই কথোপকথনটি গোপনে ভিডিও করছিলেন।

পরদিন এক শিক্ষার্থীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে, তাদের কথোপকথনের ভিডিওটি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত হয়েছে। ভিডিওটির নির্মাতা নিজেকে একজন 'পিক-আপ আর্টিস্ট' হিসেবে পরিচয় দিয়ে, রাস্তায় নারীদের সাথে যোগাযোগের কৌশল প্রদর্শনের উদাহরণস্বরূপ ইয়ামিনির সাথে তার আলাপচারিতাটি ব্যবহার করেছিলেন। ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে ২৩ লক্ষাধিক দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়।

ভিডিওটি পর্যালোচনা করার পর ইয়ামিনি আরও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ তিনি লক্ষ্য করেন যে, ব্যক্তিটি তাকে কিছুক্ষণ অনুসরণ করার পরেই কথোপকথন শুরু করার জন্য এগিয়ে এসেছিল। এই ভিডিওটি তাকে স্পষ্ট করে দেয় যে, ঘটনাটি কোনো আকস্মিক সাক্ষাৎ ছিল না।

এ ধরনের ঘটনা কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন স্থানে এর পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। চলতি বছর ২২ বছর বয়সী ব্রিটিশ শিক্ষার্থী ইসোবেল থম্পসনও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি জানান, একজন ব্যক্তি মেটার স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে তাকে ভিডিও ধারণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশের হুমকি দিয়েছিলেন, যা তাকে প্রচণ্ড আতঙ্কিত করে তোলে।

ইয়ামিনির প্রতিনিধিত্বে ভারতের ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (আইএফএফ) মেটার কাছে একটি আইনি নোটিশ প্রেরণ করেছে। এই নোটিশে ভিডিওটির সকল কপি মুছে ফেলা, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও ডিভাইসের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ, প্রমাণ সংরক্ষণ, প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা এবং প্রায় ২ কোটি ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণসহ একাধিক দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।

মেটা তাদের স্মার্ট চশমায় গোপনীয়তা সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকার দাবি করে। তাদের মতে, চশমায় ভিডিও রেকর্ডিং চলাকালীন একটি এলইডি বাতি জ্বলে ওঠে, যা বন্ধ করা অসম্ভব। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে যে, যদি কেউ সেই বাতিটি ঢেকে দেয়, তবে ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

তবে ইয়ামিনি দৃঢ়ভাবে বলেন যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চশমায় তিনি কোনো রেকর্ডিং লাইট দেখতে পাননি। একটি সাধারণ চশমার আড়ালে যে ক্যামেরা লুকানো থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনাও তার ধারণায় আসেনি।

গত জুলাই মাসে ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি ঘোষণা করেছিলেন যে, অপরিচিত ব্যক্তিদের হয়রানিমূলক ভিডিও, বিশেষত 'পিক-আপ লাইন' ধরনের গোপনে ধারণ করা ভিডিও সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মেটার নীতিমালায়ও হয়রানি এবং যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণ উপায়ে কাউকে উপস্থাপন করার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

পুলিশের কাছে অভিযোগ দাখিলের পর ইয়ামিনির ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে অন্যায় বাধা প্রদান ও স্টকিংসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। তবে এই ঘটনার সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে ইয়ামিনির মানুষের প্রতি আস্থায়। এখন রাস্তায় কোনো ব্যক্তি এগিয়ে এলেই তিনি সন্দেহ করেন যে, তাকে গোপনে ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে কিনা।

ইয়ামিনির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মোবাইল ফোন ব্যবহার করে কেউ প্রকাশ্যে ভিডিও ধারণ করলে অন্তত তার আপত্তি জানানোর একটি সুযোগ থাকে। কিন্তু স্মার্ট চশমার ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো সুযোগই থাকে না, যার ফলে একজন ব্যক্তি তার নিজস্ব চিত্র ও ব্যক্তিগত মুহূর্তের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর এক গভীর অনুভূতিতে ভোগেন।

মেটা নিশ্চিত করেছে যে, ইয়ামিনিকে কেন্দ্র করে নির্মিত ভিডিওটি পরবর্তীতে সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং তারা স্মার্ট চশমার গোপনীয়তা সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।