Sun 13th Sep 2026, 12:20 pm

এআই যুগে টিকে থাকার কৌশল: এক কম্পিউটার বিজ্ঞানীর দূরদর্শী পরামর্শ

এআই যুগে টিকে থাকার কৌশল: এক কম্পিউটার বিজ্ঞানীর দূরদর্শী পরামর্শ
২০২৬ সালের নবীন গ্র্যাজুয়েটবৃন্দ, তোমাদের অভিনন্দন এবং একই সাথে আমার সহানুভূতি। তোমরা এক যুগসন্ধিক্ষণে বেড়ে উঠছ, যেখানে পরিবর্তনের গতি দ্রুততর। এই সময়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা যেমন দুরূহ, তেমনি সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণও বেশ কঠিন।

এক স্বনামধন্য পরিসংখ্যানবিদের একটি গল্প প্রচলিত আছে। জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে তিনি দ্বিধায় পড়েছিলেন – পূর্ব উপকূলে থাকবেন, নাকি পশ্চিম উপকূলে পাড়ি জমাবেন! তাঁর এক সহকর্মী তখন পরামর্শ দিলেন, ‘তুমি তো একজন পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞ! তুমি তো জানোই যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোত্তম পন্থা হলো সম্ভাব্য সব পরিণতি বিবেচনা করে সর্বোচ্চ উপযোগিতাসম্পন্ন পথটি বেছে নেওয়া।’

পরিসংখ্যানবিদ প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘তুমি বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছ না। এটি বাস্তব জীবন।’

বহু বছর আগে, আমার নিজের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে, যা কালের গভীরে হারিয়ে গেছে। সমাবর্তনের বিশেষ টুপি আর গাউন পরিহিত অবস্থায় বসে ছিলাম। হঠাৎ পাশে এমন একজনকে আবিষ্কার করলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরেও যাঁর সঙ্গে আমার কোনোদিন দেখা হয়নি। আমরা আলাপ শুরু করলাম। মুহূর্তের মধ্যেই মনে হলো, যেন কত দীর্ঘদিনের আমাদের এই বন্ধুত্ব! একদিকে সমাবর্তনের নিরস বক্তৃতা চলছিল, অন্যদিকে আমরা আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভয়, অভিজ্ঞতা আর পরিবার নিয়ে কথা বলছিলাম। এরপর আমরা যার যার পথে চলে গেলাম। সাধারণত বিচ্ছেদের সময় যে দুঃখবোধ থাকে, তার ছিটেফোঁটাও সেখানে ছিল না। পরিস্থিতি ও পরিবেশ যদি সঠিক হয়, তাহলে দুজন মানুষের মধ্যে সংযোগ অপ্রত্যাশিতভাবে কতটা গভীর হতে পারে, সেদিন আমি উপলব্ধি করেছিলাম।

আজ আমি এই গভীর সংযোগ নিয়েই তোমাদের সঙ্গে কথা বলব।

কেউ কেউ বলেন, এআই এমন এক নতুন যুগ আনবে যা আমাদের কঠিনতম সমস্যাগুলোর সমাধান করবে। আবার অন্য একটি পক্ষ দাবি করে, এটি মানবজাতিকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করবে। এসব শুনে বিভ্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এআই প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনার সাধারণ রীতি হলো – প্রথমে কল্পবিজ্ঞানের মতো চমকপ্রদ অগ্রগতির কথা তুলে ধরা, তারপর এর উদ্বেগের দিকগুলোতে আসা। তবে আজ আমি এই ক্রমটি উল্টে দিতে চাই।

প্রথমত, এটা স্পষ্ট যে আগামী দশকের মধ্যে বহু চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অথবা এমনভাবে পরিবর্তিত হবে যা আগে থেকে অনুমান করা অত্যন্ত কঠিন। এর মধ্যে কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের চাকরিও অন্তর্ভুক্ত, যা এক দশক আগেও সবচেয়ে নিরাপদ পেশা হিসেবে বিবেচিত হতো!

দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করা অপরিহার্য। সদ্য গ্র্যাজুয়েট হিসেবে এই বিষয়টি হয়তো তোমাদের জন্য বেশ উদ্বেগের। তবে আশা করি তোমরা এতদিনে বুঝে গেছ যে, শিক্ষা এমন কোনো বিষয় নয় যা একবার শেষ করলেই এর দায় চুকে যায়।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সময়ে বৈষম্য শুরুর দিকে আরও প্রকট হবে। আমরা বর্তমানে যে বৈষম্য দেখছি, তার চেয়ে সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য আরও বাড়বে।

চতুর্থত, এআই দ্বারা সৃষ্ট ভুয়া লেখা ও ছবির বিস্তার বর্তমানে আমাদের সমাজকে ব্যাহত করছে। ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

সবশেষে, এই সমস্যাগুলোর কারণে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র, এমনকি এর অস্তিত্বই এক গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। শ্রমবাজারের অস্থিরতা, বৈষম্য এবং ভুল তথ্যের ওপর ভর করেই গণতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনগুলো বিস্তার লাভ করবে।

বাস্তবতার এই অস্বস্তিকর তালিকা দেখে মনে হতেই পারে – এত প্রযুক্তির দরকারই বা কী? আমি ১৯৬০-এর দশকে বেড়ে উঠেছি, তাই এই ধরনের প্রতিক্রিয়া আমার মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই আসে। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বলব, প্রযুক্তির অগ্রগতি আদতে আমাদের জন্য অপরিহার্য।

একজন মানুষ যখন সত্যিকারের কোনো মেলবন্ধন বা সংযোগ স্থাপন করতে চায়, তখন এআইয়ের সরবরাহ করা সাবলীল পাঠ্যের বাইরেও আরও কিছুর প্রয়োজন হয়। আমাদের গভীরতম আবেগগুলোর জন্ম হয় আজীবন অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে – ছোট ছোট সাফল্য ও ব্যর্থতার পুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতা, অসাধারণ কোনো মুহূর্ত, অথবা তীব্র কষ্টের ভান্ডার থেকে।

জেনারেটিভ এআই সিস্টেমগুলো এখন গান লিখছে, উপন্যাস রচনা করছে। এই কাজগুলো কি শোনার বা পড়ার যোগ্য হবে? সম্ভবত হবে। কিন্তু আমাকে বলবেন না যে জেনারেটিভ এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এমন কোনো কাজ করবে যা আমার অন্তরের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যাবে। জেনারেটিভ এআইয়ের কোনো জীবন্ত অভিজ্ঞতা বা বাস্তব জীবন নেই। এটি একটি ভুয়া জীবনের অভিনয় করতে পারে, কিন্তু ভুয়া জীবনের কোনো ভুয়া সঙ্গী কে-ই বা চায়?

সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমি বিশ্বাস করি এমন কিছু পেশা বা চাকরি থেকেই যাবে, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীর সংযোগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ধরনের নতুন নতুন কাজের সুযোগ আরও তৈরি হবে। এগুলো হারিয়ে যাবে না, বরং ভবিষ্যতে এগুলোর সংখ্যা আরও বাড়বে। মানুষকে মানুষের প্রয়োজন।

অতএব গ্র্যাজুয়েটবৃন্দ, আমরা মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হব, ভীত হব – এটা হয়তো এড়ানো সম্ভব নয়। তবু কিছু বিষয় তোমাদের সাহায্য করতে পারে।

প্রথমত, একটি দীর্ঘ শ্বাস নাও। এমন নয় যে দ্রুতই তোমাকে সুযোগগুলো ছিনিয়ে নিতে হবে, নতুবা সেগুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে। সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জগুলো আজ থেকে এক বছর পর, পাঁচ বছর পর, এমনকি দশ বছর পরও বিদ্যমান থাকবে। এই যুগটিকে বরং শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সে সময় চিন্তাশীল মানুষ এমন সব উদ্ভাবন করেছিলেন, যা দুইশো বছর ধরে মানবজাতিকে সেবা দিয়ে আসছে এবং এখনো দিচ্ছে।

তুমি যদি ইতিমধ্যেই একজন চিন্তাশীল মানুষ না হয়ে থাকো, তাহলে কীভাবে চিন্তাশীল হবে? একটু সময় বের করে উপন্যাস পড়ো, ইতিহাস চর্চা করো, একটি নতুন ভাষা শেখো, বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্ত থেকে ঘুরে আসো। কোনো একটি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখো।

দ্বিতীয়ত, মনে রেখো মানুষ যখন এক হয়, তখনই আশ্চর্যজনক ঘটনাগুলো ঘটে। আমরা তথাকথিত ‘জিনিয়াসদের’ অর্জনকে একটু বেশিই প্রাধান্য দিই। বাস্তবে একটি সমগ্র সমাজই এর পেছনে কাজ করে, অথচ কৃতিত্বটা আমরা ‘জিনিয়াসকে’ দিয়ে দিই। যেমনটা উত্তর-আধুনিক দার্শনিক টেলর সুইফট একবার বলেছিলেন, ‘আমি কেবলই এক সাধারণ মেয়ে, যাকে সবাই জিনিয়াস বলে। কিন্তু সে যদি হয় একা, তবে জিনিয়াস হয়ে লাভ কী?’

সবাইকে ধন্যবাদ।