Sun 23rd Aug 2026, 4:53 am

মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম: প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও আধুনিক চিকিৎসা

মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম: প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও আধুনিক চিকিৎসা
মানব মস্তিষ্কে অসংখ্য সূক্ষ্ম রক্তনালি জালের ন্যায় ছড়িয়ে থাকে, যা জীবনধারণের জন্য অত্যাবশ্যক রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে। মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম বলতে এসব রক্তনালির অস্বাভাবিক, বেলুনের মতো স্ফীতিকে বোঝায়। এই স্ফীত অংশটি অপ্রত্যাশিতভাবে ফেটে গেলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (হেমোরেজ) ঘটে, যা হেমোরেজিক স্ট্রোকের কারণ হয়। এই অবস্থাটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী; পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আক্রান্তদের ১০ থেকে ২০ শতাংশ হাসপাতালে পৌঁছানোর পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেন। তাই, অ্যানিউরিজম শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথেই দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা গ্রহণ অপরিহার্য।

মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজমের কারণসমূহ: অ্যানিউরিজম সৃষ্টির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ দায়ী। এর মধ্যে বংশগত প্রবণতা, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত এবং ধূমপান অন্যতম। কিছু ক্ষেত্রে, অ্যানিউরিজম জন্মগতভাবেও বিদ্যমান থাকতে পারে।

অ্যানিউরিজমের লক্ষণসমূহ: দুর্ভাগ্যবশত, মস্তিষ্কের অধিকাংশ অ্যানিউরিজম ফেটে না যাওয়া পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। ফলস্বরূপ, প্রাথমিক পর্যায়ে এর শনাক্তকরণ প্রায়শই কঠিন হয়। তবে, মস্তিষ্কের অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত পরীক্ষার সময় এটি আকস্মিকভাবে ধরা পড়তে পারে। যখন অ্যানিউরিজম ফেটে যায়, তখন কিছু গুরুতর লক্ষণ প্রকটভাবে দেখা দেয়। এর মধ্যে প্রধান হলো হঠাৎ করে তীব্র মাথাব্যথা (যাকে "বিদ্যুৎ চমকের মতো" ব্যথা হিসেবে বর্ণনা করা হয়), ঘাড়ের অনমনীয়তা, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, চোখ বা চোখের পেছনের অংশে তীব্র ব্যথা, দৃষ্টিশক্তির অস্পষ্টতা বা দ্বৈত দৃষ্টি এবং মুখমণ্ডলের একপাশে অবশতা বা অসাড়তা।

মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম ফেটে গেলে প্রায়শই সাব-অ্যারাকনয়েড হেমোরেজ নামক এক ধরণের রক্তক্ষরণ ঘটে। এই পরিস্থিতিতে আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় তিনজনেরই দুই সপ্তাহের মধ্যে জীবনহানির ঝুঁকি থাকে।

রোগ নির্ণয় পদ্ধতি: মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম শনাক্তকরণের জন্য এনজিওগ্রামকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই পদ্ধতিতে পায়ের রক্তনালির মাধ্যমে একটি ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে তা ঘাড়ের রক্তনালি হয়ে মস্তিষ্ক পর্যন্ত পরিচালিত করা হয়। এরপর মস্তিষ্কের রক্তনালিগুলোর বিস্তারিত চিত্র পাওয়ার জন্য কনট্রাস্ট ডাই ইনজেকশন করা হয়। এই পরীক্ষাটি অ্যানিউরিজমের সঠিক অবস্থান এবং আকার নির্ধারণে চিকিৎসকদের মূল্যবান তথ্য প্রদান করে। এনজিওগ্রাম ছাড়াও, এমআরআই (MRI), সিটি স্ক্যান (CT Scan) এবং সিএসএফ (CSF) পরীক্ষা অ্যানিউরিজম শনাক্তকরণে সহায়ক হতে পারে।

চিকিৎসা পদ্ধতি: মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম থেকে সৃষ্ট রক্তক্ষরণের ঝুঁকি কেবলমাত্র অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেই কার্যকরভাবে নিবারণ করা সম্ভব। এর দুটি প্রধান পদ্ধতি রয়েছে:
১. এন্ডোভাসকুলার কয়েলিং (Endovascular Coiling): এই পদ্ধতিতে রোগীর কুঁচকি অঞ্চল দিয়ে একটি ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে সাবধানে তা মস্তিষ্কের সংশ্লিষ্ট ধমনি পর্যন্ত পরিচালিত করা হয়। এরপর সেই ক্যাথেটারের মাধ্যমে অ্যানিউরিজমের স্ফীত অংশে অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্লাটিনামের প্যাঁচানো তার (কয়েল) প্রবেশ করানো হয়। এর ফলে অ্যানিউরিজমের অভ্যন্তরে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং এটিকে মস্তিষ্কের মূল রক্ত সংবহনতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এর ফলে অ্যানিউরিজমের ভেতরের রক্ত জমাট না বেঁধে তরল থাকে, যা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি হ্রাস করে।
২. সার্জিক্যাল ক্লিপিং (Surgical Clipping): এটি একটি সরাসরি মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার পদ্ধতি। এই প্রক্রিয়ায় অ্যানিউরিজমের সবচেয়ে কাছাকাছি স্থান দিয়ে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে টাইটানিয়ামের তৈরি একটি ছোট ক্লিপ অ্যানিউরিজমের গোড়ায় স্থাপন করা হয়। এই ক্লিপের মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে স্ফীত অংশে রক্ত প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়, ফলে ভবিষ্যতে ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা দূর হয়। উভয় পদ্ধতিতেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দ্বারা অত্যন্ত নিপুণতা ও সতর্কতার সাথে কাজটি সম্পন্ন করা হয়।

ডা. হারাধন দেবনাথ, নিউরোসার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা