Wed 5th Aug 2026, 2:54 am

বর্ষায় চলনবিল: পরিবেশবান্ধব পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা

বর্ষায় চলনবিল: পরিবেশবান্ধব পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা
‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া / একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু...’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কালজয়ী পঙ্‌ক্তিমালা জীবনের যে চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে আছে, শ্রাবণের এক ঝলমলে বিকেলে তা নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ হলো। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় আমার জন্মভূমি হওয়া সত্ত্বেও বর্ষার ভরা মৌসুমে জলমগ্ন চলনবিলের অপূর্ব রূপ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। অথচ এই বিশাল জলরাজ্য আমার পৈতৃক নিবাস থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ঘরের কাছেই লুকিয়ে থাকা এমন অপরূপ প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে দূরদূরান্তে সৌন্দর্য অন্বেষণের প্রবণতা আমাদের অনেকের মধ্যেই বিদ্যমান। তবে এবার সেই প্রচলিত ভুল ভাঙলো।

খুলনায় কর্মস্থল হওয়ায় আমার গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত কিছুটা সীমিত। তবে এলাকার বেশ কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী নিয়মিত আমার খোঁজখবর রাখেন, যাদের মধ্যে উজ্জ্বল মাহাতো অন্যতম। গত সপ্তাহে আমার বাড়িতে পৌঁছানোর পূর্বেই তাঁর উচ্ছ্বসিত ফোন পেলাম: ‘স্যার, শুনলাম আপনি বাড়িতে আসছেন? চলনবিল দেখতে যেতে হবে, এক অসাধারণ জায়গা!’ তাঁর সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হলেন দৈনিক Desi Media Point-এর রায়গঞ্জ-তাড়াশ প্রতিনিধি সাজেদুল আলম এবং Desi Media Point ও মাই টিভির তাড়াশ প্রতিনিধি সনাতনদা। মূলত তাঁদের ঐকান্তিক উদ্যোগ ও নিপুণ ব্যবস্থাপনায় শুক্রবার ঠিক বেলা তিনটায় রায়গঞ্জের নিমগাছি বাজার থেকে একটি রিজার্ভ সিএনজি নিয়ে আমাদের বহু প্রতীক্ষিত যাত্রা শুরু হলো।

তাড়াশ বাজার থেকে সাংবাদিক সনাতনদাকে সাথে নিয়ে আমরা সরাসরি কামারশোন গ্রামে পৌঁছলাম। কামারশোন ঘাট থেকে কুন্দইলের উদ্দেশ্যে নৌকা চলাচল করে। ততক্ষণে প্রায় বিকেল চারটা। পথের দুই পাশে বিস্তৃত জলরাশি থইথই করছে। পিচঢালা সুপ্রশস্ত সড়কটি প্রায় এক ফুট পানির নিচে নিমজ্জিত হয়ে এক অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা করেছে; মনে হচ্ছিল যেন আমরা কোনো বিশাল জলরাশির মধ্য দিয়ে চলমান এক কাল্পনিক মহাসড়ক ধরে এগিয়ে চলেছি। এই জলমগ্ন সড়কে স্থানীয় তরুণদের মোটরসাইকেল চালানোর দৃশ্য এক দারুণ রোমাঞ্চকর ও উদ্দীপনাময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।

কামারশোন থেকে আমরাও অন্যদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশীয় ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকায় চড়ে কুন্দইল ব্রিজের দিকে যাত্রা করলাম। যাত্রাপথে দেখা গেল অসংখ্য নৌকায় ভরপুর পর্যটকদের সমাগম, যারা বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছেন। অনেক নৌকায় ভারী বাদ্যযন্ত্রের উপস্থিতি উৎসবের আমেজকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। কুন্দইল ব্রিজে পৌঁছে আমরা হাজারো দর্শনার্থীর এক প্রাণবন্ত মিলনমেলার সাক্ষী হলাম। ঘাটজুড়ে সারিবদ্ধ নৌকা, মাঝিদের অবিরাম ব্যস্ততা ও কোলাহল, এবং ব্রিজের উঁচু রেলিং থেকে টলমলে জলে তরুণদের ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্য সমগ্র এলাকাকে এক বর্ণিল ও প্রাণচঞ্চল উৎসবের আমেজ প্রদান করেছিল। কেউ মুঠোফোনে নিজেদের প্রিয় মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করছেন, কেউ রঙিন শাড়ি পরিধান করে বিলের জলে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, আবার কেউ নিছকই শান্ত জলরাশি এবং দূর দিগন্তে সবুজের সঙ্গে তার মিতালি দেখে বিমোহিত হচ্ছেন।

চলনবিলের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও এর রয়েছে সুগভীর ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তাৎপর্য। পাবনা, নাটোর এবং সিরাজগঞ্জ—এই তিনটি জেলার আটটি উপজেলার প্রায় বাষট্টিটি ইউনিয়নজুড়ে বিস্তৃত চলনবিল বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমি হিসেবে পরিচিত। বর্ষাকালে এর আয়তন প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে উপনীত হয়। লোকশ্রুতি আছে যে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুর কুঠিবাড়ি থেকে নওগাঁর পতিসর কুঠিবাড়িতে যাতায়াতের সময় চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আত্রাই নদী ব্যবহার করতেন। এই অপরূপ চলনবিলের বুকে নৌকায় ভেসে বেড়াতে বেড়াতেই নাকি তাঁর অসংখ্য কালজয়ী কবিতা ও ছোটগল্পের জন্ম হয়েছিল।

ভরা বর্ষায় চলনবিলের এই অনবদ্য রূপান্তর কেবল নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক শোভার প্রদর্শন নয়, বরং এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক উজ্জ্বল নতুন সম্ভাবনা। সম্প্রতি তাড়াশ সদর থেকে কুন্দইল পর্যন্ত সড়ক অবকাঠামোর অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটায় পর্যটকদের আগমন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিলের পাড় ধরে গড়ে উঠেছে শত শত অস্থায়ী ভাজাপোড়া, চা-বিস্কুট, স্থানীয় চাটনি এবং মিষ্টি ও ফলমূলের দোকান। আষাঢ় থেকে আশ্বিন—এই চার মাস চলনবিলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাঝি, চালক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবনযাত্রায় এক নতুন গতিশীলতা আসে।

বর্ষার পানি নেমে গেলে চলনবিল তার চিরচেনা রূপ পরিত্যাগ করে এক সুবিশাল জলসাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হয়। ব্যস্ত নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ও যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তির অন্বেষণে মানুষের প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে প্রত্যাবর্তনের এই ব্যাকুল আকুতি প্রমাণ করে যে, সুপরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে চলনবিল সমগ্র উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। ঘরের কাছেই লুকিয়ে থাকা এই অপরূপ সৌন্দর্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে, আনন্দ ও সৌন্দর্যের অন্বেষণে দূর দিগন্তে ধাবিত হওয়াই একমাত্র পথ নয়; বরং অনেক সময় নিজের দৃষ্টিসীমার মধ্যেই নিহিত থাকে হৃদয়ের অনাবিল প্রশান্তি।