Wed 5th Aug 2026, 3:35 am

একটি ফলে তিন ফলের সুবাস: টক আতার অনবদ্য অনুসন্ধান

একটি ফলে তিন ফলের সুবাস: টক আতার অনবদ্য অনুসন্ধান
জুন মাসের এক পড়ন্ত বিকেলে, সিলেটের খাদিমনগরে অবস্থিত শুকতারা রিসোর্টের এক কটেজের বারান্দায় আমি বসেছিলাম। বারান্দার অদূরেই একটি দীর্ঘ বনাকগাছ দাঁড়িয়ে ছিল, তার ঘন পাতার আড়ালে ফুলেরা যেন লুকোচুরি খেলছিল। ভোরে ঝরে পড়া ফুলগুলোর সৌন্দর্য হয়তো চোখ এড়িয়ে যেত, যদি না গাছটি এত কাছে থাকত। দুপুরের প্রাক্কালে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি নামল। টিলার উপর থেকে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, অবিরাম বর্ষণ, ঘোলাটে সবুজ প্রকৃতি আর দূরের আবছা পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। বৃষ্টির ধারায় দূরের পাহাড় ও জঙ্গল একাকার হয়ে এক ধোঁয়াশার মতো আবছা চিত্রপট তৈরি করেছিল। বারান্দা থেকে নিচের ঝোপঝাড় ও লনের প্রান্তে কিছু অচেনা গাছ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, কিন্তু বৃষ্টির কারণে তা ভালোভাবে দেখা সম্ভব হয়নি। বৃষ্টি থামতেই সেই অজ্ঞাত গাছটি দেখার আগ্রহ আমাকে অস্থির করে তুলল।বৃষ্টি থামার পর, জলসিক্ত লনের ঘাসে পা ডুবিয়ে আমি সেই গাছটির উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলাম। একটি কুলাঞ্জনের বৃহৎ ঝোপ পেরিয়ে যখন গাছটির সন্নিকটে পৌঁছলাম, আমার মন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল—এটি টক আতা! বেশ কয়েকটি বড় টক আতা ফল গাছে ঝুলছিল। পূর্বে কখনো এর স্বাদ গ্রহণের সুযোগ হয়নি। প্রবল বাতাসে একটি প্রায় পাকা ফল গাছতলা থেকে কুড়িয়ে পেলাম। ফলটি হাতে নিয়ে তার ছবিও তুললাম। পরদিন টিপে দেখলাম, ফলটি যথেষ্ট নরম হয়েছে। তৎক্ষণাৎ সেখানেই ফলটি আস্বাদন করলাম। এর সাদা শাঁস দেখতে আতার মতো হলেও, স্বাদ নোনতা-মিষ্টি না হয়ে ছিল টক-মিষ্টি। নরম শাঁসের গভীরে আতার মতোই কিছু চকলেট রঙের বীজ পাওয়া গেল। তবে স্বাদের চেয়েও এর ঘ্রাণ আমাকে বেশি মুগ্ধ করল। একই ফলের মধ্যে আমি আম, স্ট্রবেরি এবং আনারসের ত্রিবিধ সুগন্ধ অনুভব করলাম!আশ্চর্যজনকভাবে, ঢাকায় নিজ গৃহে ফিরে আসার পর খেয়াল করলাম যে আমার এক প্রতিবেশী তাদের ছাদে টক আতার গাছ লাগিয়েছেন, যা আগে আমার নজর এড়ায়নি। ড্রামের মধ্যে থাকা গাছটি বেশ বড় আকার ধারণ করলেও তাতে কোনো ফল ছিল না। কিছুদিন পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ আসে। সেখানকার কৃষি অনুষদের অধ্যাপক ড. মনিরুল আমাকে তাদের গবেষণা মাঠে ওটগাছ দেখাতে নিয়ে যান। সেখানেই আমি বেশ কয়েকটি টক আতার বৃক্ষ দেখতে পাই। গাছগুলো শুকতারা রিসোর্টের গাছের চেয়ে বয়স্ক ও আকারও বড়। অনেক ডালে কচি ফল ঝুলছিল। অধ্যাপক মনিরুল জানান, 'গবেষণা মাঠ হওয়ায় গাছগুলো রক্ষা পাচ্ছে। অন্যথায়, এর একটি পাতাও অবশিষ্ট থাকত না। ফেসবুকে এর পাতা ক্যান্সার নিরাময়ে সক্ষম এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর গাছটির কদর অনেক বেড়েছে। বেশিরভাগ মানুষ এটিকে টক আতা নয়, বরং করোসল গাছ নামেই চেনে।'এটি সত্যিই কৌতূহলোদ্দীপক যে, যখন বিজ্ঞানীরা ক্যান্সারের নিরাময় উদ্ভাবনে সংগ্রাম করছেন, তখন করোসল পাতা কীভাবে ক্যান্সার সারাতে পারে? এই বিষয়ে কৌতূহলী হয়ে আমি এর সম্পর্কিত গবেষণা ফলাফল খুঁজতে শুরু করি। কোন তথ্যের ভিত্তিতে মানুষ এত দৃঢ়তার সাথে এই কথাগুলো ছড়াচ্ছে? তবে কোথাও এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি যা নির্দেশ করে যে টক আতা, যা করোসল গাছ নামেও পরিচিত, ক্যান্সার প্রতিরোধ বা নিরাময় করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (FDA) এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য করোসলকে অনুমোদন করে না। যদিও টক আতার পুষ্টিগুণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অবশ্যই সহায়ক, কিন্তু পাতা নয়। এই বিদেশি ফলটির কথা আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। তবে এই বছর ১লা আগস্ট তারিখে, লেখক জায়েদ ফরিদকে সাথে নিয়ে ছাদের সেই গাছটিতে ফল ধরতে দেখি। ফলগুলো বেশ বড় হয়েছে, কিন্তু তখনও পাকেনি।টক আতা একটি সুপরিচিত ফল গাছ, যার ইংরেজি নাম সাওয়ারসপ (Soursop)। এর প্রজাতিগত নাম Annona muricata এবং এটি অ্যানোনেসি (Annonaceae) গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। আতা ও শরিফা একই গোত্রের হলেও, টক আতা একটি ভিন্ন প্রজাতি। এটি একটি ছোট আকারের বৃক্ষ যার কাণ্ড মসৃণ এবং কচি ডালগুলো রোমশ। পাতাগুলো মসৃণ, চকচকে সবুজ, কিনারা অখণ্ড ও অগ্রভাগ সুচালো, আকৃতি আয়তাকার থেকে ডিম্বাকার। পাতার নিচের দিক অনুজ্জ্বল ও সূক্ষ্ম রোমযুক্ত। ফল দেখতে আতার মতো গোলাকার নয়, বরং কিছুটা বাঁকানো হৃৎপিণ্ডের মতো এবং এর খোসা কাঁটাময়। কাঁচা অবস্থায় ফলের রঙ সবুজ থাকে, পাকার পর তা হলুদাভ সবুজে পরিণত হয়। মেক্সিকোর আদি এই ফল গাছটি বসতবাড়ির বাগানে রোপণ করা সম্ভব। পাকা ফলের শাঁস দিয়ে সুস্বাদু আইসক্রিম ও ডেজার্ট তৈরি করা যায়।