Wed 5th Aug 2026, 2:54 am

তীব্র গ্যাস সংকট: শিল্প উৎপাদন কমেছে, ছুটি বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে কারখানাগুলো

তীব্র গ্যাস সংকট: শিল্প উৎপাদন কমেছে, ছুটি বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে কারখানাগুলো
গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে অবস্থিত মিতালি ফ্যাশন কারখানার ডাইং বিভাগ আট দিন ধরে গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে। এর ফলস্বরূপ, প্রতিষ্ঠানটির ৩০টি সেলাই লাইনের মধ্যে ১৮টিই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে, কারণ কাপড় রং করা যাচ্ছে না। মিতালি ফ্যাশনের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ Desi Media Point-কে জানান, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণে ব্যর্থতার কারণে তাদের ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে হতে পারে।

মিতালি ফ্যাশনের মতো দেশের অসংখ্য শিল্পকারখানা গত দুই সপ্তাহ ধরে ভয়াবহ গ্যাস সংকটের সম্মুখীন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং, যা অনেক শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতাকে অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। ফলস্বরূপ, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং রপ্তানি কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

Desi Media Point-এর অনুসন্ধানে ১৫টি কারখানার মালিকপক্ষ এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক কারখানা ৫ আগস্টের সরকারি ছুটির সাথে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হচ্ছে।

বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে কাঁচ, ইস্পাত, বস্ত্র, তৈরি পোশাক, সিরামিক, বিস্কুট-কেক এবং ভোগ্যপণ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন হ্রাসের ফলে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার পরিণামে লোকসান গুণতে হচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি না হলে কিছু প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

দেশের শিল্প খাতে গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের হলেও গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলে দৈনিক ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, দেশের নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে দেশের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সার্বিকভাবে ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনালটি চালু হলে সরবরাহ ২৭০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত কোহিনূর কেমিক্যালের কারখানা সাধারণত সকাল ৬টা থেকে দুই শিফটে ১৬ ঘণ্টা উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে দিনের বেলায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। রাতের বেলায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বৃদ্ধি পেলে সীমিত আকারে উৎপাদন করা হয়। এর ফলে সাবান, ডিটারজেন্ট এবং প্রসাধনীর উৎপাদন ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কোহিনূর কেমিক্যালের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (ব্র্যান্ড) গোলাম কিবরিয়া সরকার Desi Media Point-কে বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় ইতোমধ্যেই বেড়েছে। এর উপর গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানকে লোকসান গুণতে হচ্ছে।"

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে তাদের শিল্পপার্কে উৎপাদন ৪০-৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে। গ্যাস সংকটের কারণে ক্যাপটিভ জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ। পল্লী বিদ্যুতের সাহায্যে কারখানা কোনোমতে সচল রাখা হয়েছে। একইভাবে নরসিংদীসহ অন্যান্য স্থানে অবস্থিত এই শিল্পগোষ্ঠীর উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সংকটের কারণে প্লাস্টিকের আসবাবপত্র, বিস্কুট-কেক, বেকারি পণ্যসহ বিভিন্ন সামগ্রীর উৎপাদন ও সরবরাহ কমাতে বাধ্য হয়েছে তারা। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল Desi Media Point-কে জানান, গ্যাস সংকটের কারণে সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে। এর ফলে অনেক পণ্যের, এমনকি রপ্তানি পণ্যেরও, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তিনি দ্রুত এই সংকটের সমাধানের আশা ব্যক্ত করেন।

সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলস-এর দৈনিক ২৪ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে গতকাল উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১০ হাজার পাউন্ডে। এর আগের কয়েক দিনও সক্ষমতার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ উৎপাদন হয়েছে। লিটল স্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম Desi Media Point-কে জানান, যদি কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায় চলতে থাকে, তাহলে প্রতি মাসে ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে।

তৈরি পোশাক শিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ডিবিএল গ্রুপের গাজীপুর কারখানার ডাইং বিভাগ গ্যাস সংকটের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, সেলাই বিভাগের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে, তারা ৫ আগস্টের সরকারি ছুটির সাথে আরও তিন দিন অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করেছে। ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম Desi Media Point-কে বলেন, "গ্যাস ছাড়া ডাইং কারখানা চালানো সম্ভব নয়। আমরা ৫-৭ আগস্ট ছুটি দিয়েছিলাম, তবে শ্রমিকদের অনুরোধে আরও একদিন ছুটি বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি, ছুটি শেষ হওয়ার আগেই গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হবে।" ডিবিএল গ্রুপের মতো আরও বেশ কিছু তৈরি পোশাক কারখানা ৫ আগস্টের সরকারি ছুটির সাথে এক থেকে দুই দিন অতিরিক্ত ছুটি দিয়েছে, কারণ গ্যাস সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী কাপড় ডাইং করা যাচ্ছে না, যা পোশাক কারখানায় বস্ত্র সংকট তৈরি করছে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান Desi Media Point-কে জানান, "তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে পোশাক কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন কার্যক্রমের মাত্র ৬০-৭০ শতাংশ সচল রাখতে পারছে। অতীতে আমরা ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস নিতে পারতাম, যা এখন বন্ধ। তিতাসকে চিঠি দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগত গাড়িতে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ করে শিল্পকারখানায় গ্যাস দেওয়া জরুরি।"

কাঁচ উৎপাদনে চুল্লিতে কাঁচামাল গলাতে গ্যাস অপরিহার্য। একবার চালু হওয়ার পর একটি কাঁচের চুল্লি টানা ১২ থেকে ১৫ বছর সচল থাকে। গ্যাসের অভাবে এটি বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় চালু করা সম্ভব হয় না; এক্ষেত্রে পুরনো চুল্লি ভেঙে নতুন করে স্থাপন করতে হয়। এ কারণে চলমান গ্যাস সংকটে কাঁচশিল্পের উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। চট্টগ্রামের পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন Desi Media Point-কে জানান, গত কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কমে ৭৫ পিএসআইয়ে (মাপার একক) দাঁড়িয়েছে। চাপ এর নিচে নেমে গেলে চুল্লি ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়বে। একটি চুল্লি নষ্ট হলে নতুন করে স্থাপনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। তিনি আরও বলেন, তাদের চুল্লিটি ২০১৯ সালে চালু হয়েছিল। বিদ্যমান বিনিয়োগ রক্ষা করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোকে সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জাতীয় গ্রিড থেকে তারা মাত্র ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে, যেখানে চট্টগ্রামের দৈনিক চাহিদা কমপক্ষে ৩৫ কোটি ঘনফুট। এর ফলে শিল্পকারখানা, আবাসিক গ্রাহক, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনসহ সকল খাতে গ্যাসের চাপ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। গ্যাস সংকটে ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তাদের উদ্বেগও বেড়েছে। বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত Desi Media Point-কে বলেন, গ্যাসের সংকট অব্যাহত থাকলে একপর্যায়ে কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল ব্যবহার করে সাময়িকভাবে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব, তবে এতে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। বড়জোর এক-দুই দিনের জন্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা চালানো গেলেও দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ঘাটতিতে এই পদ্ধতি টেকসই নয়।

সিরামিক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিসিএমইএ গত সপ্তাহে তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে একটি চিঠিতে জানায় যে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী এবং ময়মনসিংহের ভালুকা ও ত্রিশাল এলাকার ২০টি সিরামিক কারখানায় তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কখনো ২-৩ পিএসআই থেকে শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে। সংগঠনটি শিল্প রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছে।

দেশীয় খনি থেকে গ্যাস উত্তোলনে জোর না দিয়ে আমদানিনির্ভরতার দিকে ঝুঁকেছিল পূর্ববর্তী সরকার। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশের অর্থনীতি সংকটের মুখে পড়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে। এরপর দফায় দফায় গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও সংকট কাটেনি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকার দেশে গ্যাস উত্তোলনে গুরুত্ব দিলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম Desi Media Point-কে জানান, স্বাধীনতার পর থেকে সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, শিল্পকারখানাসহ সকল খাত গ্যাসনির্ভর হয়ে উঠেছে। সংকট দেখা দিলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী আমদানিনির্ভর এলএনজির উপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। মূলত জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ না করার কারণেই এই সংকট তীব্র হয়েছে। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বর্তমানে এলএনজির ভাসমান টার্মিনাল দ্রুত সংস্কারে জোর দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এলএনজি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একইসাথে শিল্পকারখানাগুলোকে গ্যাসনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।