Tue 15th Sep 2026, 1:36 pm

ঢাকার মেয়র নির্বাচনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার পূর্বাভাস, ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়ে মাঠে তিন দলের প্রার্থীরা।

ঢাকার মেয়র নির্বাচনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার পূর্বাভাস, ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়ে মাঠে তিন দলের প্রার্থীরা।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রার্থীরা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। যদিও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখনো আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ঘোষণা করেনি, তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে যে দুই সিটিতে তাদের মনোনীত প্রার্থীরা প্রায় চূড়ান্ত। উভয় দলই সুকৌশলে তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

যেহেতু এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সরাসরি প্রার্থী ঘোষণা থেকে বিরত থাকবে। এর পরিবর্তে, তারা নির্দিষ্ট প্রার্থী নির্বাচন করে তাদের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করবে। এ কারণে ব্যালটে দলীয় প্রতীক অনুপস্থিত থাকলেও, ভোটের ময়দানে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিএনপির উচ্চপদস্থ সূত্রমতে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মো. আবদুস সালামের নাম প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাদের দুজনকেই সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

দলীয় সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের সময়ই তাদের নাগরিক সেবার পাশাপাশি আসন্ন সিটি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ফলস্বরূপ, বিএনপি আনুষ্ঠানিক সমর্থন ঘোষণা না করলেও, দুই সিটিতে তাদের প্রার্থী বাছাই নিয়ে কোনো বিশেষ জটিলতা বা টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম গতকাল সোমবার Desi Media Point-কে জানিয়েছেন, "আমার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে সেই অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। আমি নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি একই সাথে নির্বাচন ও নাগরিক সেবার উভয় দিকের জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবদুস সালাম বলেন, "জনগণ যা প্রত্যাশা করে, আমি সে অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করছি এবং এর মাধ্যমেই নির্বাচনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছি।"

তবে, বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা সতর্ক করে বলেছেন যে, আপাতদৃষ্টিতে এই দুজন প্রার্থী ঠিক থাকলেও, শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। নিঃসন্দেহে, এর মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য জনমত জরিপ পরিচালিত হবে।

প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য পছন্দের প্রার্থীরা প্রায় নিশ্চিত। তারা ঢাকা উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে এবং দক্ষিণে মো. আবু সাদিককে (সাদিক কায়েম) সমর্থন দেবে। মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, আর সাদিক কায়েম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি। গত জুলাই মাস পর্যন্ত তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে ছিলেন এবং বর্তমানে তিনি জামায়াতের একজন সহযোগী সদস্য।

পূর্বে, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসন থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, সাদিক কায়েমের নির্বাচনী পরিচিতি মূলত ডাকসু কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে গড়ে উঠেছে।

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বেশ কিছুদিন ধরে উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সেবামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। সাদিক কায়েমও জামায়াতের অভ্যন্তরীণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছেন এবং সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সক্রিয় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জামায়াতে ইসলামীর একজন দায়িত্বশীল নেতা Desi Media Point-কে জানিয়েছেন যে, যেহেতু সাদিক কায়েম এখনো ডাকসুর প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেহেতু জামায়াতের রাজনীতিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রকাশ্যভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে না।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার Desi Media Point-কে বলেছেন, "মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে যাচ্ছেন এবং তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। আমরা আশাবাদী যে, নগরবাসী তাকে বিজয়ী করে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবেন।"

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল ঢাকায় দলীয় একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ বিষয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্যও দলীয়ভাবে প্রার্থী মনোনীত করা হয়েছে, তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো বাকি। তিনি গণমাধ্যমের সূত্র উল্লেখ করে জানান যে, উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে সাদিক কায়েম প্রার্থী হচ্ছেন।

এনসিপি সরাসরি দুটি সিটি করপোরেশনেই তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। গত রোববার দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম উত্তর সিটিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং দক্ষিণ সিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম ঘোষণা করেন।

আসিফ মাহমুদের জন্য এটি হবে সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে তার প্রথম প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। সংসদীয় বা স্থানীয় সরকারের কোনো পর্যায়েই তিনি পূর্বে নির্বাচন করেননি। অন্যদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে; তিনি ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা আব্বাসের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে আসিফ মাহমুদ এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী উভয়েই তাদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। আসিফ উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে এবং পাটওয়ারী দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। এর পরই তাদের দুজনকেই সংশ্লিষ্ট সিটিতে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, বিএনপি সিটি প্রশাসনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুই ব্যক্তিকে তাদের প্রার্থী হিসেবে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। জামায়াতের উত্তর সিটির প্রার্থী নগর সংগঠনের একজন পরিচিত নেতা, আর দক্ষিণ সিটির প্রার্থী ছাত্ররাজনীতির অঙ্গনের একটি পরিচিত মুখ। যদিও বিএনপির দক্ষিণ সিটির প্রার্থী আবদুস সালাম নিজেও একজন দক্ষ সংগঠক; তিনি দীর্ঘকাল মহানগর দক্ষিণে দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য। অন্যদিকে, উত্তর সিটির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াতের আমির মো. শফিকুর রহমানের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এনসিপি বেছে নিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সম্মুখসারির দুই ব্যক্তিত্বকে।

অতএব, ঢাকার এই দুই সিটি নির্বাচন তিনটি রাজনৈতিক শক্তির জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সুসংগঠিত দলীয় কাঠামো, নাকি নতুন রাজনৈতিক পরিচিতি—কোনটি ভোটারদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় হবে, তা নির্বাচনের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল Desi Media Point-কে জানান যে, বিএনপি সরাসরি কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে না। তবে, তৃণমূলকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, স্থানীয় পর্যায়ে যিনি জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য, তাকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দিয়ে বিজয়ী করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে যে, নির্দলীয় এই নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত পরিচিতি এবং জন-গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একই সাথে, বিএনপি ও জামায়াতের পরোক্ষ সমর্থন ভোটের উপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা-ও একটি বড় প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।