Sun 13th Sep 2026, 12:20 pm

বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে নারীর মৃত্যুহার বেশি কেন? একটি গভীর বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে নারীর মৃত্যুহার বেশি কেন? একটি গভীর বিশ্লেষণ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও নীতি বিশ্লেষণ কার্যক্রমে নিযুক্ত 'ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম' তাদের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের খসড়া প্রস্তুত সম্পন্ন করেছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটি জনসমক্ষে প্রকাশিত হবে। প্রকাশিতব্য এই প্রতিবেদনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত পুরুষের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বেশি হলেও, মৃত্যুহারের দিক থেকে নারীরাই এগিয়ে।

২০২৪ সালের ডেঙ্গু পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন হাসপাতালমুখী রোগীর মধ্যে ৬৩.১০ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৬.৯০ শতাংশ নারী ছিলেন। একই সময়ে রেকর্ডকৃত ৫৭৫টি মৃত্যুর মধ্যে ৫১.১০ শতাংশ নারী এবং ৪৮.৯০ শতাংশ পুরুষ।

ওই বছর এই বিষয়টি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নজরে আনা হলে অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ মন্তব্য করেন, 'ডেঙ্গুতে নারীদের উচ্চ মৃত্যুহারের সুনির্দিষ্ট কোনো জৈবিক কারণ এখনো শনাক্ত হয়নি। সুতরাং, প্রাথমিকভাবে অবহেলাকে একটি প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। নারীরা প্রায়শই নিজেদের অসুস্থতাকে তেমন গুরুত্ব দেন না এবং পরিবার ও সন্তানের প্রতি তাদের অতিরিক্ত মনোযোগ থাকে। একই সাথে, অনেক স্বামীও স্ত্রীর অসুস্থতাকে অবহেলা করেন, যা পরিস্থিতিকে গুরুতর পর্যায়ে নিয়ে যায়।'

নারীদের ক্ষেত্রে এই উচ্চ মৃত্যুহারের প্রবণতা এখনও বিদ্যমান। বিগত বছর (২০২৫ সাল) মোট মৃত্যুতে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় কম দেখা গেলেও, আক্রান্তের আনুপাতিক হারের প্রেক্ষাপটে নারীদের মৃত্যুহার ছিল অধিক। চলতি বছর (২০২৬) জুলাই মাস পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত লিঙ্গভিত্তিক তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী, নারীদের মৃত্যুসংখ্যা পুরুষদের চেয়ে স্পষ্টতই বেশি; যেখানে পুরুষদের মৃত্যুর হার ৩৯.৫ শতাংশ, সেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার দাঁড়িয়েছে ৬০.৫ শতাংশ।

এই বিষয়ে যে কজন বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ করা হয়েছে, তাদের কেউই এ ধরনের কারণ অনুসন্ধানী কোনো গবেষণার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত নন। অনেক বিশেষজ্ঞের কাছেই এই প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হয়েছে। তাদের প্রচলিত ধারণা হলো, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের উচ্চ মৃত্যুহার স্বাভাবিক ঘটনা। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এত সরল নাও হতে পারে।

কয়েক দশক পূর্বে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় শৈত্যপ্রবাহে মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত থাকাকালে একটি পর্যবেক্ষণ দৃষ্টিগোচর হয়: শত শত নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশু জরাজীর্ণ হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছিল, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল ছেলেশিশু। তবে, মেয়েশিশুদের ভর্তির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও, মৃত্যুর হার তাদের মধ্যেই ছিল অধিক। এর পেছনের কারণ কী?

শৈত্যপ্রবাহের সময়ে কম্বল, খাদ্য, উষ্ণ বস্ত্র এবং ঔষধ বিতরণের মতো মানবিক কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার কারণে এই প্রশ্নগুলোর গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করা সম্ভব ছিল না। তবে জানার আগ্রহ প্রবল ছিল। অনেকেই 'পিতৃতান্ত্রিক সমাজ'কেই এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, যেখানে মেয়েশিশুদের প্রতি কম মনোযোগ দেওয়া হয়, ফলে এমন ঘটনাকে স্বাভাবিক মনে করা হয়। এই ধরনের সাধারণীকরণ আমরা সহজে মেনে নিই। এর ফলস্বরূপ, 'সচেতনতা' বৃদ্ধির মতো বহুল প্রচলিত (তবে জনপ্রিয় নয়) কর্মসূচিগুলোর প্রচলন ঘটে।

এই পরিস্থিতি কি শুধু দেশের উত্তরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ? ঢাকায় ফিরে শিশু হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সেখানেও ছেলেশিশুদের ভর্তির সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশের শিশু চিকিৎসার পথিকৃৎ ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রফি খান (এম আর খান) তখন জীবিত ছিলেন। তিনি চিত্রসহ ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছিলেন যে, ছেলেশিশুদের ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের বিকাশ একই গর্ভকালীন সময়ে মেয়েদের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ধীর গতিতে সম্পন্ন হয়। ফলস্বরূপ, ছেলেশিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি।

শিশুদের শ্বাসনালি প্রাকৃতিকভাবেই ছোট হয়। এম আর খান উল্লেখ করেন, গবেষণায় এটি প্রমাণিত হয়েছে যে জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলেশিশুদের প্রান্তীয় শ্বাসনালীগুলো তুলনামূলকভাবে সরু থাকে। এর ফলে সামান্য ফোলা, কফ বা প্রদাহের কারণে শ্বাসনালি দ্রুত সংকুচিত হয়ে শ্বাসকষ্ট এবং নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

এম আর খান আরও জানান, জৈবিক লিঙ্গের ভিন্নতার কারণে রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়ায় তারতম্য থাকতে পারে। সাধারণভাবে, মেয়েদের রোগপ্রতিরোধী ক্ষমতা (ইমিউন রেসপন্স) অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে, যদিও এই সক্ষমতা সব ধরনের সংক্রমণের বিরুদ্ধে একই মাত্রায় কার্যকর নাও হতে পারে।

পরবর্তীতে এই বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা পরিচালিত হয়। 'বাংলাদেশের হাসপাতালে ভর্তি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছেলে ও মেয়েশিশুদের চিকিৎসা নিতে আসার আচরণ এবং চিকিৎসার ফলাফলে বৈষম্য' শীর্ষক এই গবেষণার ফলাফল ২০১৯ সালে স্বনামধন্য জার্নাল পিএলওএস ওয়ান-এ প্রকাশিত হয়। এই গবেষণায় ড. আলিয়া নাহিদ (প্রধান গবেষক), রবার্ট ব্রেমান, সামিউল ইসলাম, রুচিরা তাবাসসুম নাভেদ এবং অধ্যাপক সমীর সাহা অংশগ্রহণ করেন।

গবেষণাটিতে ২-৫৯ মাস বয়সী ৬,৮৫৬ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতেও প্রমাণিত হয় যে, হাসপাতালে নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে আসা শিশুদের মধ্যে ছেলেশিশুর সংখ্যাই অধিক। অর্থাৎ, জৈবিক কারণেই ছেলেশিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।

তবে গবেষণায় এই বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছে যে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর যে শিশুরা মৃত্যুবরণ করে, তাদের মধ্যে মেয়েশিশুর সংখ্যা বেশি। এর অর্থ হলো, জৈবিক কারণে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ফুসফুসের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও, পারিবারিক অবহেলার কারণে মেয়েশিশুদের প্রায়শই অত্যন্ত সংকটজনক মুহূর্তে হাসপাতালে আনা হয়। ফলে তাদের জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

গবেষণার বহুচলক বিশ্লেষণে (multivariate analysis) প্রতীয়মান হয় যে, মেয়েশিশু হওয়ার কারণে কম আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের মৃত্যুঝুঁকি অধিক।

বাস্তবিকভাবে, এই প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো অজানা। হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা দিয়ে ডেঙ্গুর প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তবে পুরুষরা তুলনামূলকভাবে বেশি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন—এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নারী-পুরুষের মৃত্যুর আনুপাতিক হিসাবও হাসপাতাল-কেন্দ্রিক। সম্ভবত অনেক নারী আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাড়িতেই অবস্থান করেন অথবা মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে হাসপাতালে পৌঁছান।

তবে নারীদের এই উচ্চ মৃত্যুহারের মূল কারণ স্পষ্টভাবে উদ্ঘাটন করতে না পারলে, এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্য ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দুরূহ হবে। বাংলাদেশের এই চিত্র, অর্থাৎ ডেঙ্গুতে নারীদের উচ্চ মৃত্যুহার, বিশ্বের অন্যান্য স্থানে বিরল। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি সাধারণ প্রবণতা নয়, বরং তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী ঘটনা।

ডেঙ্গুপ্রবণ ব্রাজিলে পরিচালিত একটি বৃহৎ জাতীয় কোহর্ট গবেষণায় (২০০৭-২০১৮) দেখা গেছে যে, সেখানে নারীদের মৃত্যুহার পুরুষদের তুলনায় কম (নারী: সিএফআর ০.০৫ শতাংশ; পুরুষ: সিএফআর ০.০৭ শতাংশ)।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ভারতেও জাতীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুতে নারীদের উচ্চ মৃত্যুহারের মতো কোনো স্থায়ী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয় না। বরং, কেরালার একটি বৃহৎ হাসপাতালে ১,৩০৮ জন নিশ্চিত ডেঙ্গু রোগীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, পুরুষদের মৃত্যুর ঝুঁকি নারীদের তুলনায় অধিক। এছাড়াও, ভারতের বিভিন্ন গবেষণায় পুরুষদের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণের হারও বেশি পাওয়া গেছে।

ডেঙ্গুতে নারীদের উচ্চ মৃত্যুহারের কারণ অনুসন্ধান যেমন অপরিহার্য, তেমনি এই মৃত্যুস্রোত প্রতিরোধের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও অত্যাবশ্যক। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো প্রতিটি ডেঙ্গু মৃত্যুর 'জেন্ডার-সেনসেটিভ ডেথ রিভিউ' পরিচালনা করা। এর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে কেন নারীরা তুলনামূলকভাবে অধিক হারে মৃত্যুবরণ করছেন এবং কোন কোন মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য ছিল।

প্রতিটি জেলায় চিকিৎসক, এপিডেমিওলজিস্ট, নার্স এবং জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ডেঙ্গু 'ডেথ রিভিউ কমিটি' গঠন করা আবশ্যক। এই কমিটি প্রতিটি সংশ্লিষ্ট মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য ছিল কিনা, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবে।

যেহেতু ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি মৌসুমি ব্যাধি নয়, তাই এর নিয়ন্ত্রণ নীতি ও কৌশলে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। জেলাভিত্তিক নারী ও পুরুষের সিএফআর (কেস ফ্যাটালিটি রেট) প্রতি সপ্তাহে আলাদাভাবে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। নারীদের সিএফআর বেশি পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে 'জেন্ডার ডেঙ্গু অ্যালার্ট' জারি করতে হবে।

এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে ডেঙ্গু মৃত্যুর লিঙ্গসংবেদনশীল নজরদারি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে। নারী রোগীদের অগ্রাধিকারমূলক স্ক্রিনিং ও পরিবহন নিশ্চিত করা, গর্ভবতী ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ প্রোটোকল প্রবর্তন, জেলা পর্যায়ে লিঙ্গভিত্তিক ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ড তৈরি এবং মৃত্যুর সংখ্যা গণনা না করে মৃত্যুর কারণ বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা—এই সমস্ত কাজ অনতিবিলম্বে শুরু করা বাঞ্ছনীয়।

অবিলম্বে ডেঙ্গু বিষয়ক ধারাবাহিক গবেষণার ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য। চলতি ২০২৬ সালের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে 'কেন বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে নারীরা তুলনামূলকভাবে অধিক হারে মৃত্যুবরণ করছেন?'—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে জরুরি গবেষণা পরিচালনা করা প্রয়োজন। এই গবেষণায় চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব, গর্ভাবস্থা, রক্তস্বল্পতা, পূর্ববর্তী রোগসমূহ, ডেঙ্গুর দ্বিতীয়বার সংক্রমণ এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর সময়—এই সমস্ত বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের আওতায় আনতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, এই সমস্যাটি কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একইসাথে একটি গভীর সামাজিক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট।

● গওহার নঈম ওয়ারা, গবেষক এবং 'স্বাধীনতার ৫০ বছর: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অর্জন' বইয়ের রচয়িতা। [email protected]