Thu 10th Sep 2026, 11:28 am

ব্যক্তিগত মুঠোফোন তথ্যের অবাধ বাণিজ্য: মন্ত্রীর গোপনীয়তাও অরক্ষিত

ব্যক্তিগত মুঠোফোন তথ্যের অবাধ বাণিজ্য: মন্ত্রীর গোপনীয়তাও অরক্ষিত
দেশের নাগরিকদের মুঠোফোনভিত্তিক যোগাযোগ, বার্তা আদান-প্রদান এবং ভৌগোলিক অবস্থান সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য অর্থের বিনিময়ে সহজে উপলব্ধ হচ্ছে। বিশেষায়িত ওয়েবসাইট খুলে নাম নিবন্ধনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এই তথ্যের অবৈধ বাণিজ্য চলছে।

এই তথ্যের বিক্রেতাদের কাছে গত ৬ সেপ্টেম্বর একজন মন্ত্রীর মুঠোফোন নম্বর সরবরাহ করা হয় এবং দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ করা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এই সিডিআর-এ বিগত তিন মাসে মন্ত্রীর কার সাথে কতক্ষণ এবং কখন কথা হয়েছে, এমনকি কথোপকথনের সময় তার ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কিত নানা গোপনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সিডিআর-এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রীর দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়। সিডিআর প্রদর্শনের পর মন্ত্রী তার ব্যক্তিগত মুঠোফোন বের করে তথ্যের সাথে মিলিয়ে দেখেন। বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি মন্তব্য করেন, 'এটা কীভাবে সম্ভব! তাহলে তো কেউই নিরাপদ নয়।'

Desi Media Point-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিগত তথ্যও চরমভাবে অরক্ষিত। এমনকি যাদের উপর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব, তাদের নিজেদের গোপনীয় তথ্যও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে আরও নিশ্চিত হওয়া যায় যে, দেশের যেকোনো মুঠোফোন ব্যবহারকারীর সিডিআর সংগ্রহ করা সম্ভব। Desi Media Point একজন মন্ত্রী ছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের এবং নিজস্ব দুজন কর্মীর মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করে যা পরবর্তীতে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়।

মুঠোফোন ব্যবহারকারীদের গোপন তথ্যের বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে অনলাইনে একটি সুসংগঠিত অবৈধ বাজার গড়ে উঠেছে। ফেসবুক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, ডেডিকেটেড ওয়েবসাইট খুলে এবং টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই তথ্য বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে একজন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র, সিডিআর, মুঠোফোনের রিয়েল-টাইম অবস্থান, খুদে বার্তা (এসএমএস), কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) সনদ, পাসপোর্টের তথ্য এবং মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের বিবরণী সহ যাবতীয় তথ্য সহজলভ্য হচ্ছে।

এই ঘটনার ধারাবাহিকতায়, Desi Media Point গত অক্টোবর মাসেও অনুরূপ কিছু তথ্য এবং বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সিডিআর সংগ্রহ করেছিল। একই প্রসঙ্গে, গত ৩১ আগস্ট তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকে ৬০০টিরও বেশি পোস্টের সন্ধান মিলেছে, যেগুলি ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত।

তথ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে কর্মরত প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী Desi Media Point-কে জানান, মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগ তার একান্ত গোপনীয়তার অংশ। যখন এই ধরনের তথ্য সহজেই অর্থের বিনিময়ে উপলব্ধ হয়, তখন নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, কোনো অপরাধী চক্র যদি কারো ক্ষতিসাধন করতে চায়, তবে মুঠোফোনের সিডিআর সংগ্রহ করে তার গতিবিধি সম্পর্কে সহজেই অবগত হতে পারে।

তিন মাসের সিডিআর সংগ্রহের জন্য ১ হাজার ৫০ টাকা এবং ছয় মাসের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। এই ওয়েবসাইটগুলির পরিচালনাকারীরা ক্রেতাদের সাথে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা আদান-প্রদান করে। সিডিআর বিক্রিকারী একটি ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি (সাধারণ ও স্মার্ট), জন্মনিবন্ধন তৈরি, স্বয়ংক্রিয় স্বাক্ষরের অনুলিপি, বায়োমেট্রিক তথ্য, অবস্থান ট্র্যাকিং, কললিস্ট, মোবাইল আর্থিক সেবা অ্যাপ সম্পর্কিত তথ্য এবং পাসপোর্টের এসবি কপি বিক্রিসহ বিভিন্ন পরিষেবার বিজ্ঞাপন বিদ্যমান। প্রতিটি পরিষেবার জন্য নির্দিষ্ট ফি এবং সময়সীমা উল্লেখ করা আছে।

নাগরিকদের মুঠোফোনভিত্তিক গোপনীয় তথ্য ফাঁসের বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম Desi Media Point-কে বলেন যে, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের এমন অবাধ বিক্রি ও ফাঁস মেনে নেওয়া যায় না। সরকার দ্রুত এই চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের একটি সরকারি সংস্থার মহাপরিচালকের মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর সংগ্রহের জন্য একটি ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল। এর ফলস্বরূপ, মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই সিডিআরটি পাওয়া যায়।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী ৮ সেপ্টেম্বর ওই সংস্থা প্রধানের কাছে গেলে তিনি সিডিআর-এর সঠিকতা নিশ্চিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সিডিআর ফাঁস হওয়ার বিষয়ে তার পূর্ব ধারণা থাকলেও, এত হালনাগাদ তথ্য যে এত সহজে পাওয়া যেতে পারে, তা তিনি কল্পনা করেননি।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

মঙ্গলবার Desi Media Point-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এমন অবাধে বিক্রি হওয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি আরও জানান, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিটিআরসি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের সম্মিলিত গ্রাহকসংখ্যা বর্তমানে ১৯ কোটিরও বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, দেশের পাঁচ বছরের বেশি বয়সী জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশই মুঠোফোন ব্যবহারকারী।

মোবাইল অপারেটরগুলি একজন ব্যক্তির কল আউটগোইং, ইনকামিং কল, এবং খুদে বার্তা বিনিময়ের সমস্ত তথ্য সংরক্ষণ করে, যা তাদের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। এই সিডিআর-এ উল্লিখিত তথ্যাদির পাশাপাশি মুঠোফোনের শনাক্তকরণ নম্বর (আইএমইআই) এবং কল বা এসএমএস আদান-প্রদানের সময় ব্যবহৃত মোবাইল টাওয়ারের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

অপারেটরদের এই বিশাল ডেটাবেইস বা তথ্যভান্ডার ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসহ মোট ১২টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের। তবে, সিডিআর-এ হোয়াটসঅ্যাপ, সিগনাল, টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড মুঠোফোন অ্যাপের যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য সাধারণত পাওয়া যায় না।

একটি মোবাইল অপারেটরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা Desi Media Point-কে জানান যে, কিছু সরকারি সংস্থার নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অপারেটরের অনুমোদিত প্রক্রিয়া bypass করে সরাসরি তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার পান। এক্ষেত্রে অপারেটরের কাছে পৃথকভাবে তথ্য চাওয়ারও প্রয়োজন হয় না। কীভাবে মানুষের তথ্য ফাঁস হচ্ছে, এ বিষয়ে গ্রামীণফোন ও রবির কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলে, উভয় অপারেটরই দাবি করে যে তারা তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং আইন অনুযায়ী কেবল অনুমোদিত ব্যক্তিরাই এই তথ্যে প্রবেশ করতে পারেন।

মোবাইল অপারেটর সূত্রগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, কে বা কারা কীভাবে তথ্য চুরি করছে তা চিহ্নিত করা সম্ভব, তবে এর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে শক্তিশালী ও দৃঢ় পদক্ষেপ অত্যাবশ্যক।

তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) গত মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি এবং ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত। এই ঘটনাগুলিতে মানুষের বহুমুখী ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তথ্যভান্ডার থেকে তথ্য ফাঁসের একটি বড় ঘটনা ঘটেছিল। এর আগে, ২০২৩ সালেও প্রায় ৫ কোটি মানুষের এনআইডি তথ্য ফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল। দুঃখজনকভাবে, এই সব ঘটনার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

২০২৩ সালের জুলাই মাসে, তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ তথ্য ফাঁসের এই ঘটনাগুলিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন। টিজিআই-এর প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যে সকল প্রতিষ্ঠানের উপর তথ্য সুরক্ষার দায়িত্ব ছিল, তারা ফাঁস হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে অবগতই ছিল না। এসব ঘটনার পর জবাবদিহিতা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন যে, নাগরিকদের মুঠোফোন-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্যের বাণিজ্যিকভাবে ফাঁস ও বিক্রি হওয়া পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অপব্যবহারের স্পষ্ট ইঙ্গিত। তিনি Desi Media Point-কে জানান, এ ধরনের তথ্যের বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ব্যবহার নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। তার মতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করা এবং জড়িতদের শনাক্ত করা অত্যাবশ্যক। একই সাথে, তথ্য ফাঁসের সুযোগ সৃষ্টিকারী ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলি চিহ্নিত করে প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত উপায়ে সেগুলির সমাধান করা প্রয়োজন।