Tue 8th Sep 2026, 4:55 pm

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের যুগান্তকারী সংশোধনী: প্রবীণ মা-বাবার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে বিশেষজ্ঞ অভিমত

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের যুগান্তকারী সংশোধনী: প্রবীণ মা-বাবার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে বিশেষজ্ঞ অভিমত
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বেদনাদায়ক ঘটনাটি ২০২২ সালে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। শাহজাহান মৃধা তার স্ত্রী হালিমা বেগমকে ৬৪ শতাংশ জমি দান করলেও, পরবর্তীতে ৮২ বছর বয়সী হালিমা বেগম তার বড় ছেলে মাহাবুব আলম মৃধাকে সেই জমি হস্তান্তর করার পর নিজ বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন। এই মর্মস্পর্শী ঘটনায় হালিমা বেগম স্বামীর দেওয়া সম্পত্তির উপর কোনো অধিকার দাবি করতে পারেননি, কারণ তিনি তা ছেলের নামে লিখে দিয়েছিলেন। এই ধরনের অসহায়ত্বের পুনরাবৃত্তি রোধে এবং প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষায় সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে একটি যুগোপযোগী সংশোধনী আনা হয়েছে, যা আইনবিদ ও অধিকারকর্মীদের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।

আইনজ্ঞ ও নাগরিক অধিকারকর্মীরা ঐকমত্য পোষণ করছেন যে, এই সংশোধিত আইন হালিমা বেগমের মতো অসংখ্য প্রবীণ ব্যক্তিকে বৃদ্ধ বয়সে চরম অনিশ্চয়তা থেকে সুরক্ষা দেবে। এই আইনের অধীনে, একজন দাতা (যেমন, বাবা-মা, দাদা-দাদি/নানা-নানি, সন্তান, নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রী) রক্তসম্পর্কের স্বজন বা জীবনসঙ্গীকে সম্পত্তি দান করার পরও আমৃত্যু সেই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার নিজের কাছে সংরক্ষণ করতে পারবেন।

নারীপক্ষর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক Desi Media Point-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই সংশোধনীকে অত্যন্ত ইতিবাচক আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “বাবা-মায়ের পেনশন আত্মসাৎ করা, সম্পত্তি হস্তান্তরের পর তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো—এমন অসংখ্য অনভিপ্রেত ঘটনা সমাজে ঘটে থাকে। এই আইন প্রবীণদের সুরক্ষা দেবে এবং সম্পত্তি প্রদানের ক্ষেত্রে দাতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।”

গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে ১৮৮২ সালের 'দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল' পাস হয়, যা উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, প্রচলিত আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান থাকলেও, দাতার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণের কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিল না। প্রস্তাবিত সংশোধনীটি "জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান" নামে একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি চালু করেছে, যা সকল ধর্মাবলম্বীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে। এর মাধ্যমে প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের 'হেবা' বা অন্যান্য স্বীকৃত হস্তান্তর পদ্ধতির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হবে না। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২২ ধারা অনুযায়ী, 'দান' বলতে স্বেচ্ছায় ও বিনিময়হীনভাবে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে বোঝায়।

সংশোধিত আইনে সংযোজিত নতুন ১২২(ক) ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, দাতা তার জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগাধিকার নিজের কাছে রেখেই অন্যকে তা দান করতে পারবেন। এই ধারার উপধারা অনুযায়ী, বাবা-মা সন্তানদের, দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে, সন্তান বা নাতি-নাতনি তাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে, এবং স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মধ্যে এ ধরনের দান সম্পন্ন করতে পারবেন। উল্লেখ্য, গ্রহীতার অকাল মৃত্যু ঘটলেও দাতার ভোগাধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে, এবং দানকৃত সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে। এটি বিদ্যমান দান, হেবা বা অন্য কোনো হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতাকে প্রভাবিত করবে না। অন্যদিকে, ১২২(খ) ধারায় বলা হয়েছে, একবার নিবন্ধিত দান সাধারণত বাতিলযোগ্য হবে না। তবে সুনির্দিষ্ট আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষাগত বা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে এটি বাতিল বা পরিবর্তিত হতে পারে।

সংসদে বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা এটিকে শরিয়তসম্মত নয় বলে আখ্যায়িত করেন এবং সাময়িকভাবে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামী 'কোরআন-সুন্নাহবিরোধী' আখ্যা দিয়ে আইনটি প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। হেফাজতে ইসলামও আইনটি পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছে যে, জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সুরক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ প্রশংসনীয় হলেও, এটি যেন ইসলামি মিরাস ও হেবার বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।

তবে আইনবিদরা এই সংশোধনীকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন Desi Media Point-কে বলেন, “এটি মুসলিম পারিবারিক আইনের নয়, বরং সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধন, এবং হেবার কোনো ধারা লঙ্ঘন করে না।” তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে বাবা-মা এবং নারীর জন্য এই আইন অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে, কেননা এটি দাতার ব্যক্তিগত সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুলও একই মত পোষণ করে বলেন, “মুসলিম আইনে দানের বিধান অক্ষুণ্ণ আছে, এবং এই সংশোধনী বাবা-মাকে অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই প্রণীত।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এই আইন সকল ধর্মাবলম্বীর জন্য প্রযোজ্য হবে এবং প্রতারণার মাধ্যমে দানপত্র তৈরির মতো দেওয়ানি মামলার সংখ্যা হ্রাস করবে, যার ফলে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ই উপকৃত হবেন।

'জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২' অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯.২৮ শতাংশ বা ১ কোটি ৫৩ লাখেরও বেশি মানুষ ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে। এই বিশাল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় আইনটির গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম এই বিল পাসে সরকারের সাহসী পদক্ষেপের প্রশংসা করে Desi Media Point-কে বলেন, "বিতর্কের মধ্যেও আইনটি পাস হওয়া একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি বৃদ্ধ বয়সে সুরক্ষা দেবে, বিশেষত নারীরা এর দ্বারা অধিক উপকৃত হবেন।" তবে তিনি দীর্ঘমেয়াদে আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং নারীর অধিকার নিশ্চিতে একটি অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।