বাংলাদেশের বন্য প্রাণীর বাসস্থান সংরক্ষণ, সুরক্ষা এবং এই বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সম্প্রতি একটি ১০ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় বন্য প্রাণী কমিশন গঠন করেছে, যা ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে নিশ্চিত হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব এই কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক সদস্যসচিবের ভূমিকা পালন করবেন। লেখকের নামও এর আটজন সদস্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে হাতিসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও সুরক্ষা; বন বিভাগের অবৈধভাবে দখলকৃত জমি পুনরুদ্ধার; সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ; বন্য প্রাণীর খাদ্যের যোগান নিশ্চিতকরণ; মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত হ্রাস; এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ে সরকারকে কৌশলগত পরামর্শ প্রদান।
কমিশনের প্রাথমিক সভায় অংশগ্রহণের পর লেখকের উপলব্ধি, এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে, এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে কমিশনের উদ্দেশ্য, ক্ষমতা ও স্বাতন্ত্র্য আরও সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি, যাতে এটি নিছক একটি সাধারণ পরামর্শক কমিটিতে পর্যবসিত না হয়। এটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমালোচনা নয়, বরং প্রশ্নটি হলো: বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণে এই কমিশন বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এককভাবে যা করা সম্ভব নয়, তার বাইরে কী ধরনের অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন করবে? প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত বহু কার্যক্রম বন অধিদপ্তর, বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সমন্বয়ে সহজেই সম্পন্ন করা সম্ভব। সুতরাং, কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হওয়া নয়; বরং জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ, অগ্রাধিকার স্থাপন, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় সাধন, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
অর্থাৎ কমিশনের মূল জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত: বাংলাদেশের বন্য প্রাণীর সার্বিক অবস্থা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছে? এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনায় তিনটি স্বতন্ত্র বিষয়কে স্পষ্টভাবে পৃথক করা প্রয়োজন—নীতি, বিজ্ঞান এবং বাস্তবায়ন।
১. বন্য প্রাণী কমিশন: নীতি, সমন্বয় ও তদারকি: কমিশনকে একটি জাতীয় পর্যায়ের নীতি ও তদারকি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে হবে। এর দায়িত্ব হতে পারে সরকারকে জাতীয় বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণে পরামর্শ প্রদান; গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি ও আবাসস্থলের অগ্রাধিকার চিহ্নিতকরণ; জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ; এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন। কমিশনকে একটি কার্যকর ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে এর সদস্য গঠনে বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার সমন্বয় থাকা আবশ্যক। বন অধিদপ্তরের সাথে নিবিড় সমন্বয় নিশ্চিত করার জন্য সদস্যসচিব হিসেবে সংশ্লিষ্ট বন্য প্রাণী কর্মকর্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে, কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে বিচার, বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, পরিবেশ, গবেষণা, অর্থনীতি ও জনসম্পৃক্ততার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে এর স্বাধীন ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও শক্তিশালী হবে। কমিশনের প্রধান হিসেবে একজন সম্মানিত অবসরপ্রাপ্ত বিচারক দায়িত্ব পালন করতে পারেন, যা এর নিরপেক্ষতা বাড়াবে। বিকল্পভাবে, প্রাণিবিদ্যা, জীববিজ্ঞান বা পরিবেশবিজ্ঞানে জাতীয় পর্যায়ের খ্যাতিসম্পন্ন কোনো অবসরপ্রাপ্ত উপাচার্য বা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদও এই গুরু দায়িত্বের জন্য বিবেচিত হতে পারেন। এটি কমিশনের নীতিগত নিরপেক্ষতা, পেশাগত মর্যাদা ও জন–আস্থা আরও বৃদ্ধি করবে। কমিশনের কার্যকর দায়িত্ব পালনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সচিবালয় বা স্থায়ী কার্যালয় অপরিহার্য। পর্যাপ্ত জনবল, গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা ছাড়া কমিশনের দীর্ঘমেয়াদি তদারকি এবং নীতিগত দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করা কঠিন হবে। মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত, বন্য প্রাণী অপরাধ, অবৈধ বাণিজ্য, আবাসস্থল ক্ষয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৌশলগত সুপারিশমালা এবং প্রয়োজনীয় আইন, বাজেট, জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়েও কমিশন সরকারকে মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করতে পারে। কমিশন নিজে প্রতিদিন মাঠে গিয়ে উদ্ধার বা ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে না; বরং এটি নিশ্চিত করবে যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ নীতি, পর্যাপ্ত সম্পদ ও সঠিক বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা নিয়ে কাজ করছে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত হচ্ছে।
২. বন্য প্রাণী পরামর্শক বোর্ড: বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা: বন্য প্রাণী পরামর্শক বোর্ডের ভূমিকা হওয়া উচিত কমিশন থেকে স্বতন্ত্র একটি বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা। এতে জীববিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, পরিবেশবিদ্যা, প্রাণিচিকিৎসা, জিনতত্ত্ব, প্রাণীর আচরণবিজ্ঞান ও ভূদৃশ্য ব্যবস্থাপনার বিশেষজ্ঞগণ অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই বোর্ড বিভিন্ন প্রজাতির অবস্থা ও জনসংখ্যার উপাত্ত, গবেষণার ফলাফল, বিপন্ন প্রজাতির পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা, বন্য প্রাণী স্থানান্তর বা পুনঃপ্রবর্তন, সংরক্ষিত এলাকার ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং রোগ ও প্রাণিচিকিৎসা–সংক্রান্ত বিষয়গুলো বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজন হলে এটি কমিশন ও সরকারকে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মতামত দেবে। অর্থাৎ, কমিশন নির্ধারণ করবে কী অর্জন করতে হবে; আর পরামর্শক বোর্ড নির্দেশ করবে বৈজ্ঞানিকভাবে তা কীভাবে সম্পন্ন করা উচিত।
৩. মাঠপর্যায়ের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা: বাস্তবায়নকারী সংস্থা: বাংলাদেশে বন অধিদপ্তর দীর্ঘকাল ধরে বন, বনভূমি, সংরক্ষিত এলাকা ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর রয়েছে মূল্যবান মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, সুসংগঠিত অবকাঠামো ও পর্যাপ্ত জনবল। ভবিষ্যতের যেকোনো সংস্কারকে তাই এই বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করেই অগ্রসর হতে হবে। তবে, আধুনিক বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ক্রমশ একটি বিশেষায়িত পেশাগত ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। প্রজাতির জনসংখ্যা পর্যবেক্ষণ, প্রাণিচিকিৎসা, রোগতত্ত্ব, প্রজাতি পুনরুদ্ধার, বন্য প্রাণী অপরাধ দমন, মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত ব্যবস্থাপনা, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং ভূদৃশ্যভিত্তিক সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত দক্ষতা অপরিহার্য। এ কারণে ভবিষ্যতে বন অধিদপ্তরের ভেতরে একটি আরও শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বন্য প্রাণী সেবা গড়ে তোলা হবে, নাকি একটি পৃথক বিশেষায়িত বন্য প্রাণী সেবা/অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হবে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যে কাঠামোই গ্রহণ করা হোক না কেন, মাঠপর্যায়ের দায়িত্বগুলোর মধ্যে থাকবে বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসন, প্রজাতি পুনরুদ্ধার, প্রাণিচিকিৎসা, বন্য প্রাণী অপরাধ মোকাবিলা, মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত ব্যবস্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির বিশেষ ব্যবস্থাপনা, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: বিশেষায়িত বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা বন অধিদপ্তরের ভূমিকা খর্ব করার প্রস্তাব নয়। বন ও বন্য প্রাণী পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। বনভূমি সুরক্ষা, বন ব্যবস্থাপনা ও আবাসস্থল রক্ষায় বন অধিদপ্তরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একই সাথে, বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনার কিছু ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞান ও জনবল অপরিহার্য। তাই ভবিষ্যতের কাঠামোর লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব 'কেড়ে নেওয়া' নয়; বরং কোন কাজটি কে সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে করবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরস্পরকে কার্যকরভাবে সহযোগিতা করবে, তা স্পষ্ট করা। যদি ভবিষ্যতে পৃথক বন্য প্রাণী সেবা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, সেটিও বন অধিদপ্তরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়; বরং বন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বিত একটি বিশেষায়িত সেবা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ বন্য প্রাণী কমিশনকে নিছক আরেকটি সভাভিত্তিক পরামর্শক সংস্থায় পরিণত না করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের কার্যকারিতা কতটি সভা হয়েছে বা কতটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং সংরক্ষণের বাস্তব ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। প্রতি দুই বা তিন বছর পর কমিশনের সামনে এই প্রশ্নগুলো থাকা উচিত—বাঘ, হাতি, ডলফিন, মেছো বিড়াল, শকুন, ধনেশ, ঘড়িয়াল ও অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতির অবস্থা কি উন্নত হয়েছে? তাদের আবাসস্থল ও চলাচলের পথ কি নিরাপদ হয়েছে? মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত কি কমেছে? গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলের গুণগত মান কি বেড়েছে? বন্য প্রাণী অপরাধ ও অবৈধ বাণিজ্য কি কমেছে? অর্থাৎ, সাফল্যের মূল সূচক হবে, বাংলাদেশের বন্য প্রাণী ও তাদের আবাসস্থলের সার্বিক অবস্থা পূর্বের চেয়ে উন্নত হয়েছে কি না।
এই কাঠামোর মূল দর্শন খুব সহজভাবে বলা যায়: বন্য প্রাণী কমিশন—নীতি নির্ধারণ, সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। বন্য প্রাণী পরামর্শক বোর্ড—বিজ্ঞানভিত্তিক ও পেশাগত মূল্যায়ন প্রদান করবে। এবং বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা সেবা মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন করবে। আর বন অধিদপ্তর থাকবে বন ও বনভূমি সুরক্ষা, ব্যবস্থাপনা এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় একটি অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বৃদ্ধি নয়। লক্ষ্য হলো এমন একটি পেশাদার, বিজ্ঞানভিত্তিক, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নীতি, বিজ্ঞান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সুস্থ ও সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্রে বন্য প্রাণীর টেকসই সংরক্ষণ, নিরাপদ আবাসস্থল ও স্বাভাবিক সংখ্যা নিশ্চিত করা এবং একটি পেশাদার, বিজ্ঞানভিত্তিক, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
রেজা খান, বন্য প্রাণী, চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক বিশেষজ্ঞ। (মতামত লেখকের নিজস্ব)
কমিশনের প্রাথমিক সভায় অংশগ্রহণের পর লেখকের উপলব্ধি, এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে, এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে কমিশনের উদ্দেশ্য, ক্ষমতা ও স্বাতন্ত্র্য আরও সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি, যাতে এটি নিছক একটি সাধারণ পরামর্শক কমিটিতে পর্যবসিত না হয়। এটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমালোচনা নয়, বরং প্রশ্নটি হলো: বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণে এই কমিশন বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এককভাবে যা করা সম্ভব নয়, তার বাইরে কী ধরনের অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন করবে? প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত বহু কার্যক্রম বন অধিদপ্তর, বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সমন্বয়ে সহজেই সম্পন্ন করা সম্ভব। সুতরাং, কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হওয়া নয়; বরং জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ, অগ্রাধিকার স্থাপন, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় সাধন, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
অর্থাৎ কমিশনের মূল জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত: বাংলাদেশের বন্য প্রাণীর সার্বিক অবস্থা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছে? এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনায় তিনটি স্বতন্ত্র বিষয়কে স্পষ্টভাবে পৃথক করা প্রয়োজন—নীতি, বিজ্ঞান এবং বাস্তবায়ন।
১. বন্য প্রাণী কমিশন: নীতি, সমন্বয় ও তদারকি: কমিশনকে একটি জাতীয় পর্যায়ের নীতি ও তদারকি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে হবে। এর দায়িত্ব হতে পারে সরকারকে জাতীয় বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণে পরামর্শ প্রদান; গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি ও আবাসস্থলের অগ্রাধিকার চিহ্নিতকরণ; জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ; এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন। কমিশনকে একটি কার্যকর ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে এর সদস্য গঠনে বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার সমন্বয় থাকা আবশ্যক। বন অধিদপ্তরের সাথে নিবিড় সমন্বয় নিশ্চিত করার জন্য সদস্যসচিব হিসেবে সংশ্লিষ্ট বন্য প্রাণী কর্মকর্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে, কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে বিচার, বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, পরিবেশ, গবেষণা, অর্থনীতি ও জনসম্পৃক্ততার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে এর স্বাধীন ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও শক্তিশালী হবে। কমিশনের প্রধান হিসেবে একজন সম্মানিত অবসরপ্রাপ্ত বিচারক দায়িত্ব পালন করতে পারেন, যা এর নিরপেক্ষতা বাড়াবে। বিকল্পভাবে, প্রাণিবিদ্যা, জীববিজ্ঞান বা পরিবেশবিজ্ঞানে জাতীয় পর্যায়ের খ্যাতিসম্পন্ন কোনো অবসরপ্রাপ্ত উপাচার্য বা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদও এই গুরু দায়িত্বের জন্য বিবেচিত হতে পারেন। এটি কমিশনের নীতিগত নিরপেক্ষতা, পেশাগত মর্যাদা ও জন–আস্থা আরও বৃদ্ধি করবে। কমিশনের কার্যকর দায়িত্ব পালনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সচিবালয় বা স্থায়ী কার্যালয় অপরিহার্য। পর্যাপ্ত জনবল, গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা ছাড়া কমিশনের দীর্ঘমেয়াদি তদারকি এবং নীতিগত দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করা কঠিন হবে। মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত, বন্য প্রাণী অপরাধ, অবৈধ বাণিজ্য, আবাসস্থল ক্ষয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৌশলগত সুপারিশমালা এবং প্রয়োজনীয় আইন, বাজেট, জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়েও কমিশন সরকারকে মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করতে পারে। কমিশন নিজে প্রতিদিন মাঠে গিয়ে উদ্ধার বা ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে না; বরং এটি নিশ্চিত করবে যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ নীতি, পর্যাপ্ত সম্পদ ও সঠিক বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা নিয়ে কাজ করছে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত হচ্ছে।
২. বন্য প্রাণী পরামর্শক বোর্ড: বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা: বন্য প্রাণী পরামর্শক বোর্ডের ভূমিকা হওয়া উচিত কমিশন থেকে স্বতন্ত্র একটি বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা। এতে জীববিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, পরিবেশবিদ্যা, প্রাণিচিকিৎসা, জিনতত্ত্ব, প্রাণীর আচরণবিজ্ঞান ও ভূদৃশ্য ব্যবস্থাপনার বিশেষজ্ঞগণ অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই বোর্ড বিভিন্ন প্রজাতির অবস্থা ও জনসংখ্যার উপাত্ত, গবেষণার ফলাফল, বিপন্ন প্রজাতির পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা, বন্য প্রাণী স্থানান্তর বা পুনঃপ্রবর্তন, সংরক্ষিত এলাকার ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং রোগ ও প্রাণিচিকিৎসা–সংক্রান্ত বিষয়গুলো বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজন হলে এটি কমিশন ও সরকারকে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মতামত দেবে। অর্থাৎ, কমিশন নির্ধারণ করবে কী অর্জন করতে হবে; আর পরামর্শক বোর্ড নির্দেশ করবে বৈজ্ঞানিকভাবে তা কীভাবে সম্পন্ন করা উচিত।
৩. মাঠপর্যায়ের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা: বাস্তবায়নকারী সংস্থা: বাংলাদেশে বন অধিদপ্তর দীর্ঘকাল ধরে বন, বনভূমি, সংরক্ষিত এলাকা ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর রয়েছে মূল্যবান মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, সুসংগঠিত অবকাঠামো ও পর্যাপ্ত জনবল। ভবিষ্যতের যেকোনো সংস্কারকে তাই এই বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করেই অগ্রসর হতে হবে। তবে, আধুনিক বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ক্রমশ একটি বিশেষায়িত পেশাগত ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। প্রজাতির জনসংখ্যা পর্যবেক্ষণ, প্রাণিচিকিৎসা, রোগতত্ত্ব, প্রজাতি পুনরুদ্ধার, বন্য প্রাণী অপরাধ দমন, মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত ব্যবস্থাপনা, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং ভূদৃশ্যভিত্তিক সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত দক্ষতা অপরিহার্য। এ কারণে ভবিষ্যতে বন অধিদপ্তরের ভেতরে একটি আরও শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বন্য প্রাণী সেবা গড়ে তোলা হবে, নাকি একটি পৃথক বিশেষায়িত বন্য প্রাণী সেবা/অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হবে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যে কাঠামোই গ্রহণ করা হোক না কেন, মাঠপর্যায়ের দায়িত্বগুলোর মধ্যে থাকবে বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসন, প্রজাতি পুনরুদ্ধার, প্রাণিচিকিৎসা, বন্য প্রাণী অপরাধ মোকাবিলা, মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত ব্যবস্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির বিশেষ ব্যবস্থাপনা, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: বিশেষায়িত বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা বন অধিদপ্তরের ভূমিকা খর্ব করার প্রস্তাব নয়। বন ও বন্য প্রাণী পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। বনভূমি সুরক্ষা, বন ব্যবস্থাপনা ও আবাসস্থল রক্ষায় বন অধিদপ্তরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একই সাথে, বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনার কিছু ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞান ও জনবল অপরিহার্য। তাই ভবিষ্যতের কাঠামোর লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব 'কেড়ে নেওয়া' নয়; বরং কোন কাজটি কে সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে করবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরস্পরকে কার্যকরভাবে সহযোগিতা করবে, তা স্পষ্ট করা। যদি ভবিষ্যতে পৃথক বন্য প্রাণী সেবা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, সেটিও বন অধিদপ্তরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়; বরং বন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বিত একটি বিশেষায়িত সেবা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ বন্য প্রাণী কমিশনকে নিছক আরেকটি সভাভিত্তিক পরামর্শক সংস্থায় পরিণত না করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের কার্যকারিতা কতটি সভা হয়েছে বা কতটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং সংরক্ষণের বাস্তব ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। প্রতি দুই বা তিন বছর পর কমিশনের সামনে এই প্রশ্নগুলো থাকা উচিত—বাঘ, হাতি, ডলফিন, মেছো বিড়াল, শকুন, ধনেশ, ঘড়িয়াল ও অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতির অবস্থা কি উন্নত হয়েছে? তাদের আবাসস্থল ও চলাচলের পথ কি নিরাপদ হয়েছে? মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত কি কমেছে? গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলের গুণগত মান কি বেড়েছে? বন্য প্রাণী অপরাধ ও অবৈধ বাণিজ্য কি কমেছে? অর্থাৎ, সাফল্যের মূল সূচক হবে, বাংলাদেশের বন্য প্রাণী ও তাদের আবাসস্থলের সার্বিক অবস্থা পূর্বের চেয়ে উন্নত হয়েছে কি না।
এই কাঠামোর মূল দর্শন খুব সহজভাবে বলা যায়: বন্য প্রাণী কমিশন—নীতি নির্ধারণ, সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। বন্য প্রাণী পরামর্শক বোর্ড—বিজ্ঞানভিত্তিক ও পেশাগত মূল্যায়ন প্রদান করবে। এবং বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা সেবা মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন করবে। আর বন অধিদপ্তর থাকবে বন ও বনভূমি সুরক্ষা, ব্যবস্থাপনা এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় একটি অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বৃদ্ধি নয়। লক্ষ্য হলো এমন একটি পেশাদার, বিজ্ঞানভিত্তিক, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নীতি, বিজ্ঞান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সুস্থ ও সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্রে বন্য প্রাণীর টেকসই সংরক্ষণ, নিরাপদ আবাসস্থল ও স্বাভাবিক সংখ্যা নিশ্চিত করা এবং একটি পেশাদার, বিজ্ঞানভিত্তিক, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
রেজা খান, বন্য প্রাণী, চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক বিশেষজ্ঞ। (মতামত লেখকের নিজস্ব)