Sun 13th Sep 2026, 11:38 am

আশির দশকের কবিদের সাজসজ্জা: এক ব্যতিক্রমী চিত্র

আশির দশকের কবিদের সাজসজ্জা: এক ব্যতিক্রমী চিত্র
কবিদের প্রচলিত জনমানসের চিত্র প্রায়শই এক অবিন্যস্ত, অগোছালো ও মলিন অবয়বের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে, যা কফি হাউসের আড্ডা বা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের পরিচিত ফ্রেমের সাথে মানানসই। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ‘কবি’ উপন্যাসে তরুণ কবি আতাহারের চরিত্র অঙ্কনে এই ধারণাকেই স্পষ্ট করেছেন। আতাহারের প্রধান পরিধেয় পাঞ্জাবি ছিল ইস্ত্রিবিহীন এবং অপরিচ্ছন্ন, যেখানে পেটের কাছে হলুদ দাগ এক অনাকাঙ্ক্ষিত অনাচারের ইঙ্গিত বহন করত। এটি যেন নতুন জামাইদের পরিপাটি পোশাকের বিপরীত, এক অস্থির জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি।

অন্যদিকে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘কবি’ উপন্যাসে নিতাইয়ের যে অবয়ব নির্মাণ করেছেন, তা অনিশ্চিত ও প্রতিকূল জীবনের প্রেক্ষাপটেও আত্মমর্যাদা ও সগৌরব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। ডাকাত বংশে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও, নিতাই তার কবিসত্তাকে সমাজের কাছে মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে সচেষ্ট ছিল। সে একটি চাদর পরিধান করত এবং নতুন জুতো কিনত, এই বিশ্বাসে যে ‘চাদর না হইলে কবিয়ালকে মানায় না’ এবং ‘নগ্নপদ জনের পদবি মানুষ সহজে স্বীকার করিতে চায় না’। সমাজের স্বীকৃতি অর্জনের জন্য নিতাইয়ের এই পোশাক-সচেতনতা তার যাযাবর কবিয়াল জীবনেও এক অবিচ্ছিন্ন ধারা হিসেবে বিদ্যমান ছিল।

হুমায়ুন আজাদের ‘কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কবি হাসান রশিদকে একজন আধুনিক, খাঁটি এবং শুদ্ধতায় বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তার দৈনন্দিন পরিধেয় সাদামাটা ও সাধারণ হলেও, তাতে কোনো কৃত্রিমতার লেশমাত্র ছিল না।

বাংলা সাহিত্যের এই তিনটি উপন্যাসে কবিদের নিয়ে প্রচলিত সমাজের ধারণা ও ব্যক্তিগত চিত্রায়ণ এক অনন্য সংযোজন। সাহিত্যিক কল্পনা এবং বাস্তবের মাঝে প্রায়শই এক নিবিড় যোগসূত্র বিদ্যমান থাকে, যা সমাজের নানা কাহিনি ও চরিত্রে প্রতিফলিত হয়। কবিদের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা ব্যতিক্রম নয়।

কবিদের প্রতি সমাজের প্রচলিত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা দীনতার উৎসমূল সমাজতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয় হলেও, ইতিহাসের পাতায় কবিদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান মোটেও অপ্রাপ্য নয়। মহাকবি ফেরদৌসীকে তাঁর ‘শাহনামা’ মহাকাব্যের জন্য গজনীর সুলতান মাহমুদ কর্তৃক প্রদত্ত স্বর্ণমুদ্রার প্রতিশ্রুতি (যদিও পরে রৌপ্যমুদ্রায় পরিবর্তিত) এর অন্যতম প্রমাণ। কেবল ইরান-তুরান নয়, প্রাচীন ও মধ্যযুগের মধ্যপ্রাচ্য, মধ্যএশিয়া, গ্রিক ও ইংরেজ সভ্যতাসহ প্রাচ্যের রাজা-মহারাজ ও মোগল-পাঠানদের রাজদরবারেও কবিদের সম্মান ও আদর সুবিদিত। আরাকান রাজসভাতেও কবিরা বিশেষ সমাদর লাভ করতেন। তাই, কবিদের মলিন মুখচ্ছবি বা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের যে চিত্র প্রচলিত, তা সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও চল্লিশের দশক থেকে শুরু করে পঞ্চাশের দশকের ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, ফজল শাহাবুদ্দীন এবং তৎপরবর্তী রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, ফরহাদ মজহার, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, রবিউল হুসাইন, আবদুল মান্নান সৈয়দ সহ অসংখ্য কবির ফ্যাশনসচেতনতা ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ছিল ঈর্ষণীয়। আশির দশকের সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, বিষ্ণু বিশ্বাস, কাজল শাহনেওয়াজ, রিফাত চৌধুরী, মাসুদ খান, তপন বড়ুয়া, সাজ্জাদ শরিফ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, ফরিদ কবির, গোলাম কিবরিয়া পিনু, রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, মজিদ মাহমুদ প্রমুখ কবিও এই ফ্যাশনসচেতনতার ধারা বহন করেছেন।

বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে আশির দশকের নায়ক-নায়িকাদের পোশাক-আশাকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে ভাইরাল হচ্ছে, তা এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়: বাংলা কবিতায় প্রেম, ভালোবাসা, রাজনীতি, দর্শন ও দেশপ্রেমের নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী আশির দশকের কবিরা, যাঁদের পঙ্ক্তিমালা চিরকুট হয়ে প্রেয়সীর হাতে পৌঁছাতো, তাঁদের ফ্যাশন ভাবনা কেমন ছিল? সময়ের ছাপ তাঁদের পরিধেয়তে কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছিল?

আশির দশকে সময় আজকের মতো তীব্র গতিতে ধাবিত হয়নি; জীবনযাত্রার গতি ছিল শ্লথ এবং পরিবর্তন ছিল ধীরলয়ে। সেই সময়ে হলিউড ছিল ফ্যাশনের প্রধান উৎস। বাঙালি পুরুষের সনাতনী ধুতি-পাঞ্জাবি, লুঙ্গি-পাঞ্জাবি-ফতুয়া বা ঢোলা পায়জামা-পাঞ্জাবির পাশাপাশি শার্ট, ট্রাউজার ও জ্যাকেটের প্রচলন বৃদ্ধি পায়। যদিও সিনেমা, টেলিভিশন ও পপতারকাদের ফ্যাশন অনুসরণ করা হতো, তবে সেই ধারা ছিল মন্থর। বেলবটম প্যান্ট, বড় কলারের শার্ট, ঢাকনাযুক্ত বা ঢাকনাবিহীন দুই পকেটযুক্ত শার্ট, বুকের বোতাম খোলা রাখা, নাভির উপরে চওড়া বেল্ট সহ ঢোলা প্যান্ট, প্যান্টের ভেতরে শার্ট গুঁজে পরার মতো বিভিন্ন স্টাইল তখন জনপ্রিয় ছিল। রোদচশমা ও ঘড়ি ছিল অপরিহার্য ফ্যাশন অনুষঙ্গ। রঙিন ঝলমলে পোশাক, বুশশার্ট, টাইট প্যান্ট ও বেল্টের ব্যবহার গ্রীষ্মে এবং শীতে ব্লেজার ও ডেনিম জ্যাকেটের বাহারি প্রয়োগ ছিল চোখে পড়ার মতো। ফ্যাশন সচেতনতার পাশাপাশি চুলের স্টাইলও ব্যক্তির সামগ্রিক অবয়বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, যা তৎকালীন কবিদের স্থিরচিত্রগুলিতেও স্পষ্ট।

বর্তমানে স্মার্টফোনের মাধ্যমে অনায়াসে ছবি তোলার সুবিধা বিদ্যমান থাকলেও, আশির দশকে একটি স্থিরচিত্র ধারণ করা ছিল এক শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। সেই সময়ের ঝক্কি-ঝামেলা সহ্য করে এখন কেউ ছবি তুলতে আগ্রহী হবে, তা অকল্পনীয় মনে হয়।

আশির দশকে ইয়াসিকা ক্যামেরার আধিপত্যকালে ফুজি ও কনিকা ফ্লিমের ব্যবহার ছিল একচ্ছত্র। এই দুই ব্র্যান্ডের সমন্বয় ছিল প্রায় অপরিহার্য। আর্থিক সামর্থ্য ও রুচির সমন্বয়েই ঘরে আসত ইয়াসিকা, যেখানে ফুজি বা কনিকা ফ্লিম ব্যবহার করে মাত্র ছত্রিশটি ছবি তোলা যেত। প্রতিটি ভুল ক্লিক ছিল এক আফসোসের কারণ। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে জেলা শহরগুলিতে সাদাদেয়ালের পটভূমিতে পাহাড়, নদী, ফুল ও পাখির কারুকার্যময় স্টুডিও গড়ে ওঠে। সাদাকালো ছবির যুগ পেরিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের ‘বকুল রঙিন স্টুডিও’র মতো রঙিন স্টুডিওগুলি পাড়ায় পাড়ায় উন্মোচিত হতে থাকে। সেই ইয়াসিকা এবং বকুল রঙিন স্টুডিওগুলির মাধ্যমেই আশির দশকের কবিদের মুখচ্ছবি সময়ের ছাপচিত্রে সংরক্ষিত হয়েছে। সমাজ তাদের দীন ও ধূসর আবরণে আচ্ছন্ন করতে চাইলেও, এই স্থিরচিত্রগুলো কালের সাক্ষী হিসেবে আমাদের সামনে এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। এর মধ্য দিয়ে, কবিদের সম্পর্কে প্রচলিত মলিন ও ম্রিয়মাণ ধারণা থেকে আমরা কল্পনার ডানা মেলে এক উজ্জ্বলতর এবং মর্যাদাপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ধাবিত হতে পারি।