ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর ক্রমবর্ধমান নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে এক নজিরবিহীন অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা এই কর্মসূচি চলার পর পুলিশ তাদের বলপূর্বক সরিয়ে দেয় এবং বাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। এই ধস্তাধস্তির সময় রাহুল গান্ধীর নাক থেকে রক্তপাত হতে দেখা যায়। আটকের প্রায় দুই ঘণ্টা পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ব্যাপক দুর্নীতির প্রতিবাদে, সেই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দেশের ছাত্রসমাজ গত সোমবার সংসদ ভবন অভিমুখে যাত্রা করলে দিল্লি পুলিশ তাদের ওপর নির্বিচারে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও আলোচনার দাবিতে রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী দলের নেতারা গতকাল স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু কোনো সন্তোষজনক আশ্বাস না পাওয়ায় তারা বিকেলে আকস্মিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধরনায় বসার সিদ্ধান্ত নেন।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাহুল গান্ধী তার 'এক্স' হ্যান্ডেলে পরপর কয়েকটি বার্তা দেন। একটি বার্তায় তিনি বলেন, "আমরা পুলিশি অত্যাচারের জবাব চাইতে এসেছি। এই সরকার কোনো দায়বদ্ধতা নিতে অস্বীকার করছে এবং সংসদে আলোচনা এড়িয়ে যাচ্ছে। দেশের যুব সমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার অপরাধে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।"
অপর এক বার্তায় রাহুল দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন যে, শিক্ষার্থীদের ওপর এই ধরনের আক্রমণ কার্যত প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের ওপর আক্রমণের সমতুল্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে প্রধানমন্ত্রী মনে করছেন তিনি কোনো জবাবদিহি ছাড়াই পার পেয়ে যাবেন, কিন্তু এবার তা হবে না। দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক পরিবারকে এই ধরনা কর্মসূচিতে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাহুল বলেন, "ছাত্রদের কণ্ঠস্বর বৃথা যাবে না।"
গতকাল সংসদ ভবন থেকে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী প্রথমে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে যান, যেখানে পুলিশের হামলায় আহত ছাত্রছাত্রীরা চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকে ফিরে তারা মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে যান, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭ লোক কল্যাণ মার্গের বাসভবনের সামনে ধরনা কর্মসূচির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। সে অনুযায়ী, বেলা সাড়ে তিনটায় পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের বিস্মিত করে তারা অবস্থান শুরু করেন। কর্মসূচির কিছুক্ষণ পরই প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। জিতেন্দ্র সিংকে রাহুলের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতেও দেখা যায়, এরপর তারা চলে যান।
ইতোমধ্যে ধরনাস্থলে জনসমাগম বাড়তে থাকে। কেরল ও কর্ণাটকের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী যথাক্রমে ভি.ডি. সতীশন এবং ডি.কে. শিবকুমার, কে.সি. বেনুগোপাল, এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এবং আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদবসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি সমাবেশে যোগদান করেন। কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা এসময় সরকারবিরোধী স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন চারপাশ।
সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ জিতেন্দ্র সিং গণমাধ্যমকে জানান যে, রাহুল গান্ধীর প্রধান দাবি ছিল সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা। তিনি আরও যোগ করেন যে সরকার এই দাবি মেনে নিয়েছে এবং বুধবারেই আলোচনায় প্রস্তুত। তবে, এরপর রাহুল তার অবস্থান পরিবর্তন করে বলেন যে শুধু আলোচনা যথেষ্ট নয়, শিক্ষামন্ত্রীকেও পদত্যাগ করতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। এরপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আন্দোলনকারীদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হবে। দিল্লি পুলিশ সেই নির্দেশই কার্যকর করে। সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাহুল, প্রিয়াঙ্কাসহ সকল নেতাকে বলপূর্বক বাসে তুলে নেওয়া শুরু হয়। এই সময় রাহুলকে মাটিতে শুয়ে পড়তে দেখা যায় এবং প্রায় ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য তাকে জোরপূর্বক তুলে বাসে তোলেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে রাহুলের নাক থেকে রক্তপাত দেখা যায়। পরে রাহুল গান্ধীসহ আটক নেতাদের একটি দলকে দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে রাহুল গান্ধী চলে যান, অপরদিকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন নেতাকে দিল্লির মন্দির মার্গ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনার পর কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী দ্রুত ওই থানায় ছুটে যান। রাত ৯টা নাগাদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও মুক্তি পান।
ভারতে ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি-কাম-এনট্রান্স টেস্ট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) গত দুই মাস ধরে আন্দোলন পরিচালনা করছে। তারা প্রথমে দিল্লিতে এবং পরে দেশের বিভিন্ন শহরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। প্রায় এক মাস আগে তারা নতুন করে দিল্লিতে ধরনা কর্মসূচি শুরু করে। এই অবস্থান আন্দোলনের ২৪ দিন আগে লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী, ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনম ওয়াংচুক ছাত্রদের সমর্থনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন।
২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল। সিজেপি নেতারা আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে অধিবেশনের প্রথম দিনেই তারা সংসদ ভবন অভিমুখে অভিযান করবেন। এর ঠিক দু'দিন আগে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের অবস্থান মঞ্চ থেকে সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে।
পুলিশ ধারণা করেছিল যে এই পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের হতোদ্যম করবে। তবে, এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেল যখন সোমবার হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষ সংসদ ভবন অভিমুখে কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হন। পুলিশের অনুমান অন্তত ৫০ হাজার মানুষের এই বিপুল জনস্রোত সব বাধা পেরিয়ে সংসদের দিকে অগ্রসর হবে, তা অপ্রত্যাশিত ছিল। পুলিশ ও প্রশাসন তাদের এই ব্যর্থতা ঢাকতে ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এতে উভয় পক্ষে সংঘর্ষ শুরু হয়, যার ফলস্বরূপ শতাধিক পুলিশ সদস্য এবং শতাধিক ছাত্রছাত্রী আহত হন। রাহুল, প্রিয়াঙ্কা, অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ আম আদমি পার্টির নেতারা হাসপাতালে গিয়ে আহত ছাত্রছাত্রীদের দেখে আসেন। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডাও আহতদের দেখতে যান।
প্রায় এক মাস ধরে সরকার ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করেনি। সোমবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা অবশেষে দুই ছাত্রনেতার সঙ্গে দেখা করেন। সিজেপি নেতারা তাকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতাল থেকে মুক্তি এবং NEET প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আত্মহত্যা করা ২০ জন ছাত্রছাত্রীর পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিতে একটি স্মারকলিপি দেন। সিজেপি নেতারা গতকাল জানান যে সরকার তাদের একটি দাবিও মেনে নেয়নি।
তবে, গতকালই দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দেন যে সোনম ওয়াংচুকের তার পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর অধিকার রয়েছে। এই নির্দেশ অনুযায়ী, বিকেলে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি জানান যে সোনম তার অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করছেন না।
সোমবারের ঘটনার পর দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরের ধরনামঞ্চ ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু ছাত্রনেতারা গতকাল সকালে নতুন করে সেখানেই অবস্থান শুরু করেন। তবে, সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে জানান যে, তারা এখন আর সংসদ ভবন অভিমুখে যাত্রার ডাক দেবেন না। তিনি আরও বলেন যে, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
গত কয়েক দিন ধরে প্রায় সব বিরোধী দলই এই ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন জানাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কংগ্রেস এই আন্দোলনকে সরাসরি সমর্থন করেনি। তবে, পরবর্তীতে কংগ্রেস নেতারা সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন এবং রাহুল গান্ধীও আন্দোলনের সমর্থনে বিবৃতি দেন। গতকাল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে সাড়ে তিন ঘণ্টার জন্য ধরনায় বসেন। এই ধরনের কাজ এর আগে কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা করেননি; প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে এর আগে কেউ কখনও ধরনায় বসেনি।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ব্যাপক দুর্নীতির প্রতিবাদে, সেই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দেশের ছাত্রসমাজ গত সোমবার সংসদ ভবন অভিমুখে যাত্রা করলে দিল্লি পুলিশ তাদের ওপর নির্বিচারে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও আলোচনার দাবিতে রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী দলের নেতারা গতকাল স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু কোনো সন্তোষজনক আশ্বাস না পাওয়ায় তারা বিকেলে আকস্মিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধরনায় বসার সিদ্ধান্ত নেন।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাহুল গান্ধী তার 'এক্স' হ্যান্ডেলে পরপর কয়েকটি বার্তা দেন। একটি বার্তায় তিনি বলেন, "আমরা পুলিশি অত্যাচারের জবাব চাইতে এসেছি। এই সরকার কোনো দায়বদ্ধতা নিতে অস্বীকার করছে এবং সংসদে আলোচনা এড়িয়ে যাচ্ছে। দেশের যুব সমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার অপরাধে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।"
অপর এক বার্তায় রাহুল দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন যে, শিক্ষার্থীদের ওপর এই ধরনের আক্রমণ কার্যত প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের ওপর আক্রমণের সমতুল্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে প্রধানমন্ত্রী মনে করছেন তিনি কোনো জবাবদিহি ছাড়াই পার পেয়ে যাবেন, কিন্তু এবার তা হবে না। দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক পরিবারকে এই ধরনা কর্মসূচিতে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাহুল বলেন, "ছাত্রদের কণ্ঠস্বর বৃথা যাবে না।"
গতকাল সংসদ ভবন থেকে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী প্রথমে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে যান, যেখানে পুলিশের হামলায় আহত ছাত্রছাত্রীরা চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকে ফিরে তারা মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে যান, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭ লোক কল্যাণ মার্গের বাসভবনের সামনে ধরনা কর্মসূচির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। সে অনুযায়ী, বেলা সাড়ে তিনটায় পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের বিস্মিত করে তারা অবস্থান শুরু করেন। কর্মসূচির কিছুক্ষণ পরই প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। জিতেন্দ্র সিংকে রাহুলের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতেও দেখা যায়, এরপর তারা চলে যান।
ইতোমধ্যে ধরনাস্থলে জনসমাগম বাড়তে থাকে। কেরল ও কর্ণাটকের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী যথাক্রমে ভি.ডি. সতীশন এবং ডি.কে. শিবকুমার, কে.সি. বেনুগোপাল, এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এবং আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদবসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি সমাবেশে যোগদান করেন। কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা এসময় সরকারবিরোধী স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন চারপাশ।
সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ জিতেন্দ্র সিং গণমাধ্যমকে জানান যে, রাহুল গান্ধীর প্রধান দাবি ছিল সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা। তিনি আরও যোগ করেন যে সরকার এই দাবি মেনে নিয়েছে এবং বুধবারেই আলোচনায় প্রস্তুত। তবে, এরপর রাহুল তার অবস্থান পরিবর্তন করে বলেন যে শুধু আলোচনা যথেষ্ট নয়, শিক্ষামন্ত্রীকেও পদত্যাগ করতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। এরপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আন্দোলনকারীদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হবে। দিল্লি পুলিশ সেই নির্দেশই কার্যকর করে। সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাহুল, প্রিয়াঙ্কাসহ সকল নেতাকে বলপূর্বক বাসে তুলে নেওয়া শুরু হয়। এই সময় রাহুলকে মাটিতে শুয়ে পড়তে দেখা যায় এবং প্রায় ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য তাকে জোরপূর্বক তুলে বাসে তোলেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে রাহুলের নাক থেকে রক্তপাত দেখা যায়। পরে রাহুল গান্ধীসহ আটক নেতাদের একটি দলকে দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে রাহুল গান্ধী চলে যান, অপরদিকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন নেতাকে দিল্লির মন্দির মার্গ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনার পর কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী দ্রুত ওই থানায় ছুটে যান। রাত ৯টা নাগাদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও মুক্তি পান।
ভারতে ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি-কাম-এনট্রান্স টেস্ট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) গত দুই মাস ধরে আন্দোলন পরিচালনা করছে। তারা প্রথমে দিল্লিতে এবং পরে দেশের বিভিন্ন শহরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। প্রায় এক মাস আগে তারা নতুন করে দিল্লিতে ধরনা কর্মসূচি শুরু করে। এই অবস্থান আন্দোলনের ২৪ দিন আগে লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী, ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনম ওয়াংচুক ছাত্রদের সমর্থনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন।
২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল। সিজেপি নেতারা আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে অধিবেশনের প্রথম দিনেই তারা সংসদ ভবন অভিমুখে অভিযান করবেন। এর ঠিক দু'দিন আগে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের অবস্থান মঞ্চ থেকে সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে।
পুলিশ ধারণা করেছিল যে এই পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের হতোদ্যম করবে। তবে, এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেল যখন সোমবার হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষ সংসদ ভবন অভিমুখে কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হন। পুলিশের অনুমান অন্তত ৫০ হাজার মানুষের এই বিপুল জনস্রোত সব বাধা পেরিয়ে সংসদের দিকে অগ্রসর হবে, তা অপ্রত্যাশিত ছিল। পুলিশ ও প্রশাসন তাদের এই ব্যর্থতা ঢাকতে ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এতে উভয় পক্ষে সংঘর্ষ শুরু হয়, যার ফলস্বরূপ শতাধিক পুলিশ সদস্য এবং শতাধিক ছাত্রছাত্রী আহত হন। রাহুল, প্রিয়াঙ্কা, অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ আম আদমি পার্টির নেতারা হাসপাতালে গিয়ে আহত ছাত্রছাত্রীদের দেখে আসেন। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডাও আহতদের দেখতে যান।
প্রায় এক মাস ধরে সরকার ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করেনি। সোমবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা অবশেষে দুই ছাত্রনেতার সঙ্গে দেখা করেন। সিজেপি নেতারা তাকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতাল থেকে মুক্তি এবং NEET প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আত্মহত্যা করা ২০ জন ছাত্রছাত্রীর পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিতে একটি স্মারকলিপি দেন। সিজেপি নেতারা গতকাল জানান যে সরকার তাদের একটি দাবিও মেনে নেয়নি।
তবে, গতকালই দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দেন যে সোনম ওয়াংচুকের তার পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর অধিকার রয়েছে। এই নির্দেশ অনুযায়ী, বিকেলে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি জানান যে সোনম তার অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করছেন না।
সোমবারের ঘটনার পর দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরের ধরনামঞ্চ ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু ছাত্রনেতারা গতকাল সকালে নতুন করে সেখানেই অবস্থান শুরু করেন। তবে, সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে জানান যে, তারা এখন আর সংসদ ভবন অভিমুখে যাত্রার ডাক দেবেন না। তিনি আরও বলেন যে, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
গত কয়েক দিন ধরে প্রায় সব বিরোধী দলই এই ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন জানাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কংগ্রেস এই আন্দোলনকে সরাসরি সমর্থন করেনি। তবে, পরবর্তীতে কংগ্রেস নেতারা সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন এবং রাহুল গান্ধীও আন্দোলনের সমর্থনে বিবৃতি দেন। গতকাল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে সাড়ে তিন ঘণ্টার জন্য ধরনায় বসেন। এই ধরনের কাজ এর আগে কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা করেননি; প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে এর আগে কেউ কখনও ধরনায় বসেনি।