Sun 6th Sep 2026, 5:03 pm

সালমান শাহর মৃত্যু: ৩০ বছরে মামলায় কী কী হলো

সালমান শাহর মৃত্যু: ৩০ বছরে মামলায় কী কী হলো
ঢালিউডের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলো আজ। এই দীর্ঘ সময়েও তাঁর মৃত্যুরহস্যের জট খোলেনি।

সালমান শাহর মৃত্যুর ২৯ বছর পর হত্যা মামলা হয়। মামলাটি এখন তদন্ত পর্যায়ে আছে। তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

এই হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এখন পর্যন্ত ৯ বার পিছিয়েছে। প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখ ধার্য রয়েছে।

সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী Desi Media Pointকে বলেন, ৩০ বছর ধরে বিচারের অপেক্ষায় আছেন। এই হত্যা মামলার দ্রুত বিচার চান তিনি।

আরও পড়ুনসালমান শাহ: ইস্কাটন রোডের ফ্ল্যাটে কী হয়েছিল সেই শুক্রবারে

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩২৫ বছর বয়সে মৃত্যু

সালমান শাহর পারিবারিক নাম শহীদ চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। তাঁর জন্ম ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। জন্মস্থান সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলা। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী, মা নীলা চৌধুরী। পরিবারের বড় ছেলে সালমান শাহ।

ঢাকার চলচ্চিত্রে সালমান শাহ মাত্র চার বছর অভিনয় করেছেন। এই অল্প সময়ের অভিনয়জীবনে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। স্থান করে নেন কোটি কোটি দর্শকের হৃদয়ে।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে সালমান শাহর মৃত্যু হয়। তিনি ‘আত্মহত্যা’ করেছিলেন, নাকি তাঁকে ‘হত্যা’ করা হয়েছিল—এই প্রশ্নের মীমাংসা গত তিন দশকে হয়নি।

আরও পড়ুনসালমান শাহর মৃত্যু: ২৯ বছর পর হত্যা মামলা, এত বছর যা হলো

২১ অক্টোবর ২০২৫দীর্ঘ আইনি লড়াই

সালমান শাহ থাকতেন রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার একটি ফ্ল্যাটে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এই বাসায় তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর নিথর দেহ হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।

মা–বাবার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, এটি আত্মহত্যা নয়। সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা হয়। এ বিষয়ে মা নীলা চৌধুরীর ভাষ্য, তাঁরা হত্যা মামলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ বলেছিল অপমৃত্যুর মামলা করতে। তদন্তে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি উঠে এলে তখন তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে।

১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই সালমান শাহর বাবা আদালতে একটি আবেদন করেন। আবেদনে অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নিতে আরজি জানান তিনি। কিন্তু আবেদনটি গ্রহণ করা হয়নি।

সিআইডি ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে বলে, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেছেন। এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সালমান শাহর বাবা আদালতে রিভিশন আবেদন করেন।

মামলাটি ২০০৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। ২০১৪ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এই প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর পরিবার। প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে আদালতে ‘রিভিশন’ আবেদন করেন মা নীলা চৌধুরী। ২০১৬ সালে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত।

আরও পড়ুনচিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবার পেছাল

৩০ আগস্ট ২০২৬২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পিবিআই। প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি। তিনি আত্মহত্যা করেছেন। এই আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণ ছিল। এর বিরুদ্ধে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে ‘রিভিশন’ আবেদন করা হয়।

২০২৫ সালের অক্টোবরে এই ‘রিভিশন’ আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত। একই সঙ্গে আদালত এই মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন।

এরপর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে গত বছরের অক্টোবরে রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন।

মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।

মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান।

আরও পড়ুনসালমান শাহ হত্যা মামলায় খলচরিত্রের অভিনেতা ডন গ্রেপ্তার

০৯ আগস্ট ২০২৬এক আসামি গ্রেপ্তার

এই মামলায় গত ৯ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেদিন তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। গত ১২ আগস্ট আসামি ডনের পক্ষে জামিন আবেদন করা হলে তা নামঞ্জুর হয়।

মামলার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। গত ২৭ আগস্ট ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

ডনের আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম Desi Media Pointকে বলেন, এখন পর্যন্ত যতগুলো প্রতিবেদন এসেছে, সব কটিতে বলা হয়েছে, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর মক্কেল ডন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাঁরা উচ্চ আদালতে তাঁর জামিনের আবেদন জানাবেন।

অন্যদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী আবিদ হাসান Desi Media Pointকে বলেন, আদালত সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হত্যা মামলার নির্দেশ দিয়েছেন। তা ছাড়া এই মামলার আসামি রেজভি ১৯৯৭ সালে অপহরণের এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তিনি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। জবানবন্দিতে তিনি সালমান শাহ হত্যার কথা বলেছিলেন। ঘটনায় জড়িত থাকার কথা বলেছিলেন। অপহরণ মামলায় তাঁর দুই বছরের কারাদণ্ড হয়। তিনি এখন পলাতক। ফলে এটা (সালমান শাহ) স্পষ্ট হত্যার ঘটনা। ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে এই জবানবন্দির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল।

আরও পড়ুনসালমান শাহ হত্যা মামলার আসামিদের দেশত্যাগ ঠেকাতে ইমিগ্রেশনে তথ্য দিয়েছে পুলিশ

২৫ অক্টোবর ২০২৫এদিকে সিআইডি এখনো ডনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি বলে জানা গেছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান Desi Media Pointকে বলেন, ‘এই মামলায় এখন পর্যন্ত এক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। আদালত আসামির রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। আমাদের নিরাপত্তার বিষয় আছে। ফোর্সের বিষয় আছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আমরা রিমান্ডে নেব।’

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী Desi Media Pointকে বলেন, এই মামলায় যে আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন তদন্ত কর্মকর্তা। এই জিজ্ঞাসাবাদের ওপর ভিত্তি করেই মামলার তদন্ত এগিয়ে যাবে। এই ঘটনার ন্যায়বিচার হোক, এটাই প্রত্যাশা।

আরও পড়ুনসালমান শাহ হত্যা মামলায় খলচরিত্রের অভিনেতা ডন পাঁচ দিনের রিমান্ডে

২৭ আগস্ট ২০২৬দ্রুত বিচার দাবি

সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী মুঠোফোনে Desi Media Pointকে বলেন, তাঁর ছেলের আত্মহত্যা করেনি। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যা। তাই তাঁর কাছে ৬ সেপ্টেম্বর হলো ‘সালমান শাহ হত্যা দিবস’।

এই হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত মাত্র একজন আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন নীলা চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রধান আসামিদের কেউ এখনো গ্রেপ্তার হননি। অবিলম্বে প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তার করার দাবি জানান তিনি।

নীলা চৌধুরী বলেন, তিনি ৩০ বছর ধরে ছেলে হত্যার বিচার পাওয়ায় অপেক্ষায় আছেন। তিনি দ্রুত এই হত্যা মামলার বিচার চান। আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দেখে যেতে চান।

আরও পড়ুনসালমান শাহর আত্মহত্যার পেছনে '৫ কারণ' পেয়েছে পিবিআই

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০