Tue 25th Aug 2026, 11:12 am

রংপুরে চারজনের নির্মম হত্যাকাণ্ড: ঘনীভূত রহস্য ও অব্যক্ত প্রশ্ন

রংপুরে চারজনের নির্মম হত্যাকাণ্ড: ঘনীভূত রহস্য ও অব্যক্ত প্রশ্ন
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এবং তাঁর পরিবারের তিন সদস্যের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে বিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা একযোগে মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ ও শোক মিছিলের আয়োজন করেছে। এই কর্মসূচিতে তারা রংপুর পুলিশ প্রশাসনকে তিন দিনের চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করে। আন্দোলনকারীরা হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের প্রদত্ত বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এত দ্রুত তদন্তের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে উপনীত হওয়া তাঁদের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে না। তাঁরা ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য অথবা অতিরিক্ত কোনো ব্যক্তির জড়িত থাকার সম্ভাবনা বিশদভাবে খতিয়ে দেখার জোর দাবি জানিয়েছেন।

জিলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নূর এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ কর্তৃক দুজনকে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি হত্যাকাণ্ডের স্থানটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া সহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক বিষয়কেও তদন্তের পরিধির মধ্যে নিয়ে আসার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কিনা, সে বিষয়ে নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত অত্যাবশ্যক।

গত শনিবার রাতে রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়াস্থ নিজ বাসভবন থেকে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫২), কন্যা আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং পুত্র প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)-এর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রবিবার ভোরে পুলিশ মাছুয়াপাড়া নিবাসী কানুদাসের পুত্র, সিটি বাজারের মাছের দোকান কর্মচারী মুগ্ধ দাস (২৩) এবং বিনয় চন্দ্র দাসের পুত্র, স্বর্ণের দোকানের কারিগর সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করে। একই দিনে বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

ওই দিনই এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন যে, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে মাদক সেবন করছিল। এতে বাধা দেওয়ায় প্রথমে শিক্ষককে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে একে একে পরিবারের অন্য তিন সদস্যকেও হত্যা করা হয়। অভিযুক্তরা হত্যাকাণ্ডের পরও দীর্ঘ সময় ধরে বাড়িতে অবস্থান করে গোসল, খেজুর ও শসা ভক্ষণ, পুনরায় মাদক সেবন, স্বর্ণালংকার অনুসন্ধান এবং মোবাইল ফোন পানিতে ডুবিয়ে রাখে। প্রাথমিকভাবে মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের ধারণা ছিল এটি একটি সুপরিকল্পিত ডাকাতির ঘটনা। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের এই বক্তব্য পরিবর্তিত হয়। তখন বলা হয় যে, ডাকাতির ঘটনাটি ছিল সাজানো। অথচ পুলিশের নিজস্ব দাবি অনুযায়ী, বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার অপহৃত হয়েছিল এবং গ্রেপ্তারকৃতদের প্রদর্শিত স্থান থেকে সেগুলো উদ্ধারও করা হয়েছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে, যদি স্বর্ণালংকার সত্যিই অপহৃত হয়ে থাকে, তাহলে ডাকাতির বিষয়টিকে কেন সম্পূর্ণ সাজানো বলা হচ্ছে?

গতকাল শিক্ষার্থীদের এক সমাবেশে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাফিয়ার রহমান মন্তব্য করেন, 'শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ঘিরে একটি নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। এই কৃত্রিম পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা অপরিহার্য। আমরা সত্য জানতে আগ্রহী। যদি খুনিকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়, তবে তার পরিণতি শুভ হবে না।' তিনি একইসাথে পুলিশ প্রশাসনকে হত্যাকারীকে আড়াল না করে সত্য উন্মোচন করে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিনীত আহ্বান জানান।

বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলার বলেন, 'এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে ব্যাপক সন্দেহ দানা বেঁধেছে। প্রশ্ন ওঠে, ওই বাড়ির সিসিটিভি ও বৈদ্যুতিক তার কে বিচ্ছিন্ন করল? চারজনকে হত্যা করা হলেও আশপাশের কেউ কেন টের পেল না? এরকম অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে, যা সঠিকভাবে তদন্ত না করেই দুজনকে গ্রেপ্তার করে বলা হচ্ছে যে, তারাই খুনের সঙ্গে জড়িত। আমরা এসব বিষয় বুঝি না। আমরা কেবল সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য জানতে চাই।'

পরিবারের সন্দেহ পুলিশের দাবি নিয়ে: নিহত প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশের দাবির বিষয়ে গভীর সন্দেহ পোষণ করছে। তিনি বলেন, 'আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ কী করছে, কী হচ্ছে – তা আমাদের বোধগম্য নয়। পুলিশ বলছে দুজন ইয়াবাসেবী নাকি একে একে চারজনকে হত্যা করেছে।'

গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিত্ রায় উল্লেখ করেন, 'পুলিশের বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলের পক্ষে চারজন মানুষকে হত্যা করা সম্ভব নয়। এছাড়া, ওই দুই যুবকের শারীরিক গঠনও এমন নয় যে তারা চারজনকে হত্যা করার সক্ষমতা রাখে।' তিনি আরও বলেন, 'এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।' হত্যাকাণ্ডের শিকার গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির আলমারি ও ড্রয়ার তছনছ করা হয়েছিল এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তাঁর পরিবার কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইছে না যে, এই দুই তরুণই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে।

এদিকে, গ্রেপ্তারকৃত সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস জানান, 'আমি বিভিন্ন এলাকায় কীর্তন করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমার ছেলে সহজ-সরল। পুলিশ রাতে আমার বাড়িতে এসে ছেলেকে ঘুম থেকে জাগাতে বলে। আমি ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে পুলিশের সামনে আনি। এরপর তারা আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। শুনেছি আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে, কিন্তু তাই বলে কাউকে খুন করবে, এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।' মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাসও একই সুরে বলেন, 'আমার ছেলে কিছু সঙ্গদোষে নেশা করে বটে, তবে মানুষ খুন করা এত সহজ কাজ নয়।'

বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ: চার খুনের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবিতে দুপুরে শিক্ষার্থীরা নগরীর কাচারীবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে। এর পূর্বে জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচী পালিত হয়। মানববন্ধন শেষে সেখান থেকে একটি শোক মিছিল বের হয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শোক মিছিল শেষে পুনরায় কাচারীবাজার জিলা স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে। সড়ক অবরোধ চলাকালীন সময়ে জিলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক সাফিয়ার রহমান, প্রাক্তন শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলার এবং অন্যান্য শিক্ষার্থীরা বক্তব্য রাখেন। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিস মোহাম্মদ জানায়, চারজনকে হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়িতে গোসল ও খাওয়াদাওয়া করেছে – পুলিশের এমন বক্তব্য তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না। সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে তারা এই আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন। মঙ্গলবার বিদ্যালয়ে নিহতদের স্মরণে প্রার্থনা শেষে সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে।

এছাড়াও বিকেলে নগরীর রংপুর প্রেসক্লাব চত্বরে মহানগর নাগরিক কমিটি মানববন্ধন ও সমাবেশের আয়োজন করে। এই মানববন্ধন থেকে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবি উত্থাপন করা হয়। এসময় বক্তব্য রাখেন মহানগর নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক এডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ, মহানগর দোকান ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তানবির হোসেন আশরাফীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর মহানগর আমির মাহবুবুর রহমান বেলাল মন্তব্য করেন যে, দেশকে অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য: রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন যে, চারটি মরদেহেরই ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, শ্বাসরোধ করে তাঁদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। মৃতদেহ থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সেগুলো সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে। উক্ত ল্যাব থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মতামত প্রদান করা হবে। নিহতদের মুখে রাসায়নিক পদার্থ বা অ্যাসিড ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উল্লেখ করেন যে, মুখমণ্ডল পচন ধরার কারণে এমন দেখাচ্ছে; অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

একইসাথে চারটি চিতায় উঠল চারজনের দেহ: গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী এবং দুই সন্তানের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। নিহতদের স্বজনরা জানান, রবিবার রাত ৮টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে চারটি মৃতদেহ তাঁদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরীর দখীগঞ্জ মহাশ্মশানে চারটি মৃতদেহ নিয়ে আসা হয়। সেখানে পরপর চারটি চিতায় চারজনের মরদেহ স্থাপন করা হয়। স্বজনরাই তাঁদের মুখাগ্নি করেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে দাহকার্য সম্পন্ন হয়। এই সময়ে স্বজনদের শোকার্ত কান্নায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি: রংপুর মেট্রোপলিটন কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জি জানান যে, এই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত দুই তরুণ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। তবে, তদন্তের স্বার্থে জবানবন্দিতে কী বলা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননি। রবিবার রাতে রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-২ এর বিচারক এস এম রফিকুল ইসলাম অভিযুক্ত দুই আসামির জবানবন্দি গ্রহণ করার পর তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

অন্যদিকে, রংপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি শাহ বায়েজিদ আহমেদ তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন যে, রংপুর মহানগরীতে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দাবি, মাদক সেবনের দৃশ্য দেখে ফেলায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত দুই তরুণ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যার যৌক্তিকতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে পূর্বে চুরি, ছিনতাই কিংবা অন্য কোনো স্থানীয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার রেকর্ড পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র মাদক সেবনের ঘটনা দেখে ফেলার কারণে একটি পরিবারের চারজন সদস্যকে হত্যা করার বিষয়টি নিহতদের স্বজন থেকে শুরু করে স্থানীয় কেউই মেনে নিতে পারছেন না।