Tue 11th Aug 2026, 4:47 pm

১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: প্রাসঙ্গিক বিতর্ক ও স্থায়ী প্রভাব

১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: প্রাসঙ্গিক বিতর্ক ও স্থায়ী প্রভাব
প্রায় তিন দশক পর আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদিও জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিজয় প্রায় সুনিশ্চিত, তবুও বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। এই প্রার্থিতা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং এর পেছনে নিহিত রয়েছে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক বার্তা এবং কৌশলগত বিবেচনা।

বাংলাদেশে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। সেই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি-র প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস, যার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। যদিও আবদুর রহমান বিশ্বাস সেই নির্বাচনে জয়ী হন, তবে সেই নির্বাচন রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থান, রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য, পদাধিকারীর নিরপেক্ষতা এবং সরকার-বিরোধী দলের সম্পর্কের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল, তা অদ্যাবধি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সুদূরপ্র প্রসারী প্রভাব বিস্তার করে আছে।

পরবর্তীতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিস্থিতি দেখা যায়নি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একক প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় জাতীয় সংসদে ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি। নির্বাচন কমিশন প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একক প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৯১ সালের পর প্রথমবার সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটাভুটির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যদিও সাংখ্যিক হিসাবে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিজয় প্রায় নিশ্চিত, তবু বিরোধী দলের এই প্রার্থিতা ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময়কার অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় নির্বাচন পদ্ধতিতে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে সংসদের সদস্যদের দ্বারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি জনগনের ভোটের পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানই প্রথম সরাসরি জনগনের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে, ১৯৮১ এবং ১৯৮৬ সালেও সাধারণ ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বর্তমানে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শুধুমাত্র সংসদ সদস্যরা ভোটার হিসেবে গণ্য হন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন এবং ভোট গ্রহণ সংসদকক্ষেই অনুষ্ঠিত হয়। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর যাচাই-বাছাই করা হবে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ধার্য করা হয়েছে। যদি এরপরও একাধিক প্রার্থী থাকেন, তবে ২০ আগস্ট ভোট গ্রহণ করা হবে।

ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে এবং দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী হিসেবে প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে, যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। অন্যদিকে, জামায়াতের নেতৃত্বে গঠিত ১১-দলীয় জোট লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) আলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং তার পক্ষে মনোনয়নপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।

১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১ আসন থেকে ১১টি কম। আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসন লাভ করে। এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন না থাকায় বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে নির্বাচনের পর তারা যথাক্রমে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থানে ফিরে যায়, যার ফলে তাদের মধ্যকার সম্পর্কে এক সময় তিক্ততা দেখা দেয়।

ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে এবং রাষ্ট্রপতির সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধানও পুনরুদ্ধার হয়। ফলস্বরূপ, ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ভোটাভুটির আয়োজন করা হয়।

বিএনপি সেই সময়ে দলটির স্পিকার আবদুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। তিনি ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য ছিলেন এবং ১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বিচারপতি আবদুস সাত্তার সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিএনপির একজন দীর্ঘদিনের এবং পরীক্ষিত নেতা ছিলেন।

আবদুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করার বিএনপির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি বিরোধী দল। তাদের আপত্তির মূল কারণ ছিল দুটি: প্রথমত, তারা তার মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার অভিযোগ উত্থাপন করে; দ্বিতীয়ত, তারা রাষ্ট্রপতি পদে একজন দলীয় রাজনীতিকের পরিবর্তে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্বকে নির্বাচিত করার দাবি জানায়।

বিএনপি আবদুর রহমান বিশ্বাসের প্রার্থিতা থেকে সরে না আসায়, আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায়। আওয়ামী লীগ অবগত ছিল যে সংসদে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি বেশি, ফলে কেবল ভোটের সংখ্যা দিয়ে জয়ী হওয়া কঠিন। তবে বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছিল।

প্রথম বার্তাটি ছিল যে, তারা রাষ্ট্রপতি পদে একজন দলীয় নেতার পরিবর্তে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে দেখতে চেয়েছিল। দ্বিতীয়ত, আবদুর রহমান বিশ্বাসকে প্রার্থী করার কারণে বিএনপির অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধপন্থী বা অন্য যেসব সংসদ সদস্যের আপত্তি থাকতে পারে, তাদের ভোট আকৃষ্ট করার একটি সুযোগ তৈরি করা।

১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদকক্ষে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২টি ভোট লাভ করেন, যা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ১৬৬ ভোটের চেয়ে মাত্র ছয়টি বেশি। সেই সংসদে সংরক্ষিত আসনসহ বিএনপির মোট আসন ছিল ১৬৮টি। অন্যদিকে, বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী ৯২টি ভোট পান।

সংরক্ষিত নারী আসনসহ সংসদে মোট ৩৩০ জন সদস্যের ভোটাধিকার ছিল। সব মিলিয়ে ২৬৪টি ভোট পড়ে, অর্থাৎ ৬৬ জন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন। আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও এটি কোনো ব্যাপক রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়নি।

রাজনৈতিক সূত্রমতে, আবদুর রহমান বিশ্বাসের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার বিরোধিতা করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ জামায়াতের সমর্থন লাভে সচেষ্ট ছিল। এমনকি আওয়ামী লীগের প্রার্থী জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আযমের সাথে সাক্ষাৎ করে ভোট প্রার্থনা করেছিলেন, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। আবদুর রহমান বিশ্বাসও গোলাম আযমের সাথে দেখা করেছিলেন। এই ঘটনাটি নিয়ে দৈনিক সংবাদ ৮ অক্টোবর ‘নিন্দনীয়’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

অন্যদিকে, সরকার গঠনে জামায়াত বিএনপিকে সমর্থন করলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতের সকল সদস্য আবদুর রহমান বিশ্বাসকে ভোট দিয়েছিলেন কিনা তা নিয়ে সংশয় বিদ্যমান। কারণ, যদি জামায়াতের সকল ভোট তিনি পেতেন, তাহলে তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা আরও বেশি হতো।

ধারণা করা হয়, ওই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত, জাতীয় পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং ইসলামী ঐক্যজোটের অনেক সংসদ সদস্য ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, সেই সংসদে দুজন স্বতন্ত্র সদস্য ছিলেন—যাঁদের একজন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং অন্যজন সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তাঁরা দুজনেই বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সংসদ মাত্র ১১ দিন টিকে ছিল। ওই বছর জুনে অনুষ্ঠিত পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করা হয়। বিরোধী দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। রাজনৈতিক মহলে এই আলোচনা ছিল যে, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ওই সংসদেই বিরোধী দলের সর্বোচ্চ সংখ্যক সংসদ সদস্য ছিল এবং বিএনপি চাইলে প্রার্থী দিতে পারত। কিন্তু সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিএনপি সেই পদক্ষেপ নেয়নি। এরপর থেকে প্রতিটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন এবং বিরোধী দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। তিনি প্রায় আট মাস এই পদে বহাল ছিলেন। কিন্তু দ্রুতই বিএনপির সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

পরবর্তীতে বিএনপি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় তিনি নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে, এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং জিল্লুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করে। ২০১৩ সালে তার মৃত্যুর পর প্রথমে একজন ভারপ্রাপ্ত এবং পরবর্তীতে সংসদ সদস্যদের ভোটে মো. আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

প্রথম মেয়াদ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবদুল হামিদ দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি তার স্বাভাবিক মেয়াদ শেষে অবসরে যান। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতি পদে থাকতে পারেন না। আবদুল হামিদই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি।

এরপর ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করায় বর্তমানে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র তিনবার রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথমবার ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল এম এ জি ওসমানী, যিনি আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের সমর্থন পেয়েছিলেন, প্রায় ২২ শতাংশ ভোট লাভ করেন।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপির প্রার্থী বিচারপতি আবদুস সাত্তার ৬৫ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ড. কামাল হোসেন, যিনি ২৬ শতাংশ ভোট পান।

বিচারপতি সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এইচ এম এরশাদ সামরিক শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন এবং ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করেন। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, এরশাদ ৮৪ শতাংশ ভোট পান, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাওলানা মুহাম্মদ উল্লাহ (হাফেজ্জী হুজুর) প্রায় ৬ শতাংশ ভোট লাভ করেন।

সুতরাং, প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিরা নির্বাহী ক্ষমতাসহ পূর্ণ ক্ষমতা ভোগ করতেন। কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির পদ মূলত আলংকারিক হয়ে ওঠে। যদিও সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন। তবে একবার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতিকে তার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।

সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের আনুষ্ঠানিক প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তিনি দণ্ডিত ব্যক্তির দণ্ডাদেশ স্থগিত, হ্রাস অথবা সম্পূর্ণ ক্ষমা করার ক্ষমতা রাখেন।

প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনের পর এবং প্রতি বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশনের শুরুতে রাষ্ট্রপতি উদ্বোধনী ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণে সরকারের নীতিগত রূপরেখা তুলে ধরা হয়। সংসদে গৃহীত প্রতিটি বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পরই আইনে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রপতি তার কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছরের জন্য পদে বহাল থাকেন। তবে, মেয়াদ শেষ হলেও তার উত্তরসূরি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকতে পারেন।

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী এবং ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে পারবেন। তবে তার মনোনয়নপত্রে অবশ্যই দুজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক ও সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর থাকতে হবে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা নেই এমন কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

সংসদ সদস্যরা সংসদের অধিবেশনকক্ষে নির্বাচনী কর্মকর্তার সামনে নির্ধারিত ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর নাম লিখে এবং নিজের স্বাক্ষর দিয়ে তা জমা দেবেন। প্রতিটি সংসদ সদস্যের একটি মাত্র ভোট প্রদানের অধিকার থাকবে। নির্বাচনী কর্মকর্তা সংসদকক্ষে প্রার্থী, ভোটার এবং ভোট গ্রহণে সহায়ক কর্মকর্তা ব্যতীত অন্য কারো প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করবেন। স্পিকারও এই নির্বাচনে একজন ভোটার হিসেবে গণ্য হবেন।

নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে ভোট গণনা করবেন এবং যিনি সর্বাধিক সংখ্যক ভোট পাবেন, তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। যদি একাধিক প্রার্থী সমান সংখ্যক ভোট পান, তবে লটারির মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারণ করা হবে।