Tue 4th Aug 2026, 3:05 am

জীবন বীমা করপোরেশনের রাইডার সুবিধা প্রাপ্তিতে কঠোরতা: গুরুতর অসুস্থতা ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় অপ্রযোজ্য

জীবন বীমা করপোরেশনের রাইডার সুবিধা প্রাপ্তিতে কঠোরতা: গুরুতর অসুস্থতা ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় অপ্রযোজ্য
রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি) কর্তৃক প্রদত্ত সহযোগী বিমা সুবিধা বা 'রাইডার' প্রাপ্তি থেকে গুরুতর রোগে পূর্ব-আক্রান্ত ব্যক্তি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিযুক্ত এবং স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য গোপনকারী ব্যক্তিগণকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই সুবিধা গ্রহণের জন্য জেবিসি-তে স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত তথ্য এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

গত ২৬ জুলাই, জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি) এই শর্তাবলীসহ মোট ১৪টি নির্দেশনা জারি করেছে। জেবিসির সকল আঞ্চলিক, করপোরেট, বিক্রয় এবং শাখা অফিসকে এই নতুন নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জেবিসি বিভিন্ন জীবন বীমা পলিসির সাথে স্বাস্থ্য বীমা, গুরুতর রোগ বীমা (Major Diseases) এবং প্রিমিয়াম মওকুফ (Waiver of Premium) সুবিধা প্রদান করে থাকে। এসব সহযোগী সুবিধা বা রাইডার বিতরণের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন নীতি অনুসরণ এবং দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সহযোগী বীমা সুবিধা, যা 'রাইডার' নামে পরিচিত, হলো মূল বীমা পলিসির সাথে অতিরিক্ত প্রিমিয়ামের বিনিময়ে সংযুক্ত একটি বাড়তি সুরক্ষা, যা মূল বীমার পরিধি বা কভারেজকে সম্প্রসারিত করে। এটি কোনো স্বতন্ত্র বীমা হিসেবে বিবেচিত নয়, বরং মূল বীমার অবিচ্ছেদ্য অংশ। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ব্যক্তির ২০ লাখ টাকার জীবন বীমা পলিসি থাকে এবং তিনি অতিরিক্ত ১০ লাখ টাকার দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু রাইডার যোগ করেন, তবে পলিসির শর্তাবলী অনুসারে দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হলে মনোনীত ব্যক্তি মোট ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করতে সক্ষম হবেন।

জেবিসির নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাইডার সুবিধা শুধুমাত্র সুস্থ, স্বাভাবিক এবং কর্মক্ষম ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য হবে। পূর্বে বিদ্যমান গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিগণ এই সুবিধার আওতাভুক্ত হবেন না। প্রয়োজন অনুসারে, লিপিড প্রোফাইল, সিরাম ক্রিয়েটিনিন সহ অন্যান্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদনও জমা দিতে হবে। জেবিসি প্রয়োজনে অতিরিক্ত ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা, চিকিৎসকের সনদপত্র অথবা অন্য কোনো স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য طلب করতে পারবে।

নির্দেশনাটিতে আরও বলা হয়েছে যে, স্থায়ী বা আংশিক শারীরিক অথবা মানসিক অক্ষমতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা, গুরুতর রোগ বীমা এবং প্রিমিয়াম মওকুফ সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। উপরন্তু, ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস, পক্ষাঘাত এবং অন্যান্য গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিগণ এই সুবিধা প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবেন না।

নির্দেশনায় জানানো হয়েছে, গত দুই বছরের মধ্যে কোনো গুরুতর রোগের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা চিকিৎসা গ্রহণের ইতিহাস থাকলেও, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা মূল্যায়ন ব্যতীত রাইডার সুবিধা প্রদান করা হবে না। এইচআইভি বা এইডস, জন্মগত গুরুতর অসুস্থতা, জীবনযাপন-সম্পর্কিত জটিল রোগ এবং দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিগণের ক্ষেত্রেও রাইডার সুবিধা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

জেবিসি ঘোষণা করেছে যে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, বিপজ্জনক ক্রীড়া বা ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমে নিযুক্ত ব্যক্তিগণকে রাইডার সুবিধা প্রদান করা হবে না। একইসাথে, রাইডার সুবিধা প্রাপ্তির জন্য নির্ধারিত বয়সসীমা, স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা এবং পেশাগত ঝুঁকির শর্তাবলী পূরণ করা আবশ্যক।

নির্দেশনা অনুসারে, বীমাগ্রহীতাকে তার পূর্ববর্তী রোগের ইতিহাস, চিকিৎসার বিস্তারিত বিবরণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ সঠিকভাবে প্রকাশ করতে হবে। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা হয় বা ভুল তথ্য প্রদান করা হয়, তবে সংশ্লিষ্ট বীমা দাবি প্রত্যাখ্যান করা হবে। এক্ষেত্রে প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নির্দেশনাটিতে আরও বলা হয়েছে যে, রাইডার সুবিধা মূল জীবন বীমা পলিসির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত থাকবে। যদি কোনো কারণে মূল পলিসি বাতিল, সমর্পণ (Surrender) অথবা ল্যাপস হয়ে যায়, তাহলে সহযোগী সুবিধাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, রাইডার সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন, দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা আনয়ন এবং তথ্য গোপনের ফলে উদ্ভূত বিরোধ হ্রাস করার উদ্দেশ্যেই এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

জেবিসির চেয়ারম্যান মো. মোখলেস উর রহমান গত সপ্তাহে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, যা বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে কোনো নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নেই। পদাধিকারবলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও প্রতিষ্ঠানটির পর্ষদ সদস্য সাঈদ কুতুব এমডির দায়িত্বভার পালন করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, গত শনিবার সাঈদ কুতুব Desi Media Point-কে জানান যে, সহযোগী বীমা সুবিধা বা রাইডার সংক্রান্ত কতিপয় অনিয়ম পরিলক্ষিত হচ্ছিল, যা নিরসনের উদ্দেশ্যেই এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

যদিও সাঈদ কুতুব সরাসরি উল্লেখ করেননি, তবে জেবিসির বিভিন্ন কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায় যে, পূর্ব থেকে গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিগণ নিজেদের সুস্থ দাবি করে রাইডার সুবিধা গ্রহণ করছিলেন। একশ্রেণীর পলিসি গ্রাহক স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত তথ্য, রোগের ইতিহাস অথবা চিকিৎসার বিবরণ ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করছিলেন।

অন্যদিকে, জেবিসির বিভিন্ন শাখা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই রাইডার অনুমোদন করে আসছিল। এছাড়াও, শাখাভেদে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বা বিপজ্জনক কার্যক্রমে নিয়োজিত ব্যক্তিগণকে কোনো ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়াই রাইডার সুবিধা প্রদান করা হচ্ছিল। ফলস্বরূপ, দাবি নিষ্পত্তির সময় স্বাস্থ্য-তথ্য গোপন করা বা যোগ্যতার অভাবে একাধিকবার বিরোধ ও দাবি প্রত্যাখ্যানের ঘটনা ঘটেছে।