Fri 31st Jul 2026, 2:25 am

পিতা-মাতার অত্যধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার: উদ্বেগ, লক্ষণ ও কার্যকর পদক্ষেপ

পিতা-মাতার অত্যধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার: উদ্বেগ, লক্ষণ ও কার্যকর পদক্ষেপ
একসময় সন্তানদের মাত্রাতিরিক্ত মুঠোফোন ব্যবহার নিয়ে পিতা-মাতারা চিন্তিত থাকতেন। বর্তমানে পরিস্থিতি বিপরীত, বহু মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মভুক্ত সন্তানেরা অভিযোগ করছেন যে, তাদের পিতা-মাতারা প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অত্যধিক সময় ব্যয় করছেন।

যদিও ফেসবুকের ব্যবহার স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমস্যার কারণ নয়। বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা, তথ্য আহরণ অথবা বিনোদনের জন্য এটি একটি উপকারী মাধ্যম হতে পারে। তবে যখন এর ব্যবহার বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, প্রাত্যহিক দায়িত্বাবলী অথবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তখন এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল দীর্ঘক্ষণ ফেসবুক ব্যবহার করাই সমস্যার একমাত্র সূচক নয়; বরং কিছু নির্দিষ্ট আচরণগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রকাশ সতর্কতার ইঙ্গিত দেয়। যেমন—

* ব্যবহার কমানোর বারবার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ব্যর্থতা।
* ফেসবুক ব্যবহার করতে না পারলে মানসিক অস্থিরতা বা বিরক্তি অনুভব।
* পারিবারিক সান্নিধ্যের পরিবর্তে মুঠোফোনে অধিক ব্যস্ততা।
* খাদ্যগ্রহণ, সামাজিক মেলামেশা অথবা বিশ্রামের সময়েও বারবার ফেসবুক নিরীক্ষণ।
* বাস্তব জগতের যোগাযোগের চেয়ে অনলাইন সংযোগের প্রতি অধিক প্রবণতা।
* সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অসচেতনতা।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই ছাদের নিচে বসবাস করেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আলাপচারিতা হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে দাদা-দাদি অথবা নানা-নানিদের সাথে নাতি-নাতনিদের যে গুণগত সময় অতিবাহিত হওয়ার কথা, তার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

এমনকি পরিবারের সাথে বাইরে ভ্রমণে গেলেও যদি অধিকাংশ সময় মুঠোফোনে অতিবাহিত হয়, তবে বাস্তব জীবনের আনন্দময় মুহূর্তগুলি উপভোগ করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি প্রধান সমস্যা হলো ভুল তথ্যের বিস্তার। অনেক সময় আবেগপ্রবণ বা চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী পোস্ট, পুরাতন ছবি, বিকৃত ভিডিও অথবা ভিত্তিহীন তথ্য যাচাই না করেই শেয়ার করা হয়, যার ফলে ভুল ধারণা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, কোনো তথ্য বিশ্বাস বা শেয়ার করার পূর্বে অন্তত একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম অথবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সূত্র থেকে এর সত্যতা যাচাই করা আবশ্যক।

বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে প্রতারকদের বিভিন্ন কৌশল নিয়মিতভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

যেমন—

* ভুয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব।
* লটারিতে জেতার মিথ্যা দাবি।
* মেসেঞ্জারে পরিচিত ব্যক্তি সেজে আর্থিক সহায়তা চাওয়া।
* ভুয়া অনলাইন বিপণন কেন্দ্র।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা তাই অপরিচিত ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান, মোবাইল ব্যাংকিং অথবা ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করা এবং যাচাই না করে অর্থ প্রেরণ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিচ্ছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়শই এমন দাবি দেখা যায় যেমন—সাত দিনে ডায়াবেটিস নিরাময়; হাঁটুর ব্যথা সম্পূর্ণ আরোগ্য; ক্যান্সারের ঘরোয়া প্রতিকার; এবং হার্টের ব্লক দূর করার আশ্বাস।

এই ধরনের পোস্ট দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ঔষধ অথবা ভেষজ পণ্য ব্যবহার শুরু করা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। যেকোনো স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করা উচিত।

মনোবিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেন যে, নতুন নোটিফিকেশন, লাইক, মন্তব্য অথবা ভিডিও দেখার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক একটি রাসায়নিক নির্গত হয়। এটি এক ধরনের আনন্দদায়ক অনুভূতি সৃষ্টি করে। এই অনুভূতি পুনরায় পাওয়ার আশায় অনেকেই অজান্তেই বারবার ফোন হাতে তুলে নেন।

এছাড়াও, ফেসবুকের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী একই ধরনের বিষয়বস্তু প্রদর্শন করে। ফলস্বরূপ, মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিলেও কখন যে আধা ঘণ্টা অথবা এক ঘণ্টা কেটে যায়, তা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেন না।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে রাগারাগি অথবা অভিযোগ সাধারণত বিপরীত ফল বয়ে আসে। "আপনি সারাক্ষণ ফেসবুকে ব্যস্ত থাকেন" এমনভাবে তিরস্কার না করে, বরং ইতিবাচকভাবে সময় কাটানোর বিকল্প সুযোগ তৈরি করুন। যেমন—

* একসাথে হাঁটার প্রস্তাব দিন।
* নাতি-নাতনিদের সাথে খেলায় উৎসাহিত করুন।
* পরিবারের সকলে মিলে গল্প অথবা বোর্ড গেম খেলতে পারেন।
* পুরাতন ছবি দেখে স্মৃতিচারণায় অংশ নিতে পারেন।

প্রায়শই, বিকল্প বিনোদনের সুযোগ তৈরি হলে মুঠোফোন ব্যবহারের প্রবণতা হ্রাস পায়।

* খাবারের টেবিলে মুঠোফোন পরিহার করুন।
* পারিবারিক আলাপচারিতার সময় ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
* ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা পূর্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রাখুন।
* সপ্তাহে অন্তত একদিন কয়েক ঘন্টার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ বিরতি নিন।
* মুঠোফোনের স্ক্রিন টাইম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন এবং প্রয়োজনে ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করুন।

যদি অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারের কারণে পারিবারিক সম্পর্ক, ঘুমের চক্র, কর্মক্ষমতা অথবা মানসিক স্বাস্থ্যে সুস্পষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয় এবং স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এর ব্যবহার হ্রাস করা সম্ভব না হয়, তবে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অথবা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে।

ফেসবুক নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই উদ্ভূত হয় যখন এটি বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করার একটি মাধ্যম, এটিকে আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।

সূত্র: স্ট্যাটিসটা ও হেলথলাইন